অভিনন্দনকে কি ফেরত দেবে পাকিস্তান? জেনেভা চুক্তি কি? জানুন খুঁটিনাটি

5086

বুধবার সকালে ভারতীয় আকাশসীমা লঙ্ঘন করে হামলার চেষ্টা করে পাক যুদ্ধবিমান। পালটা আঘাত করে ভারতীয় বায়ুসেনা। কিন্তু, ওই ঘটনায় নিখোঁজ হয় একটি ভারতীয় মিগ ২১ বাইসন বিমান ও তার পাইলট। পাক দাবি নিয়ে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় ‘খতিয়ে দেখার’ কথা জানানো হলেও, এবার মিগ ২১-এর পাইলট অভিনন্দনের কথা স্বীকার করেছে বিদেশ মন্ত্রক। প্রসঙ্গত, ধৃত ভারতীয় পাইলটকে মারধরের বিভিন্ন ছবি ও ভিডিয়ো সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ফাঁস করে পাক সেনা।

গতকাল পাক সেনা মুখপাত্র একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে, ভারতীয় বায়ুসেনার পোশাক পরা এক পাইলটের চোখ বেঁধে রাখা হয়েছে। হাত পিছনে মুড়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছে, “আমি উইং কম্যান্ডার অভিনন্দন এবং আমার সার্ভিস নম্বর হলো ২৭৯৮১। আমি একজন ফ্লাইট পাইলট এবং আমি হিন্দু।”

এরপর তাঁকে আরও কিছু জিজ্ঞাসা করা হলে তাঁকে বলতে শোনা যায়, “আমি দুঃখিত। এর থেকে বেশি আমি আর কিছু বলতে পারবো না।” এরপরেই তাঁকে প্রশ্ন করতে শোনা যায়, “আমি কি কিছু জানতে পারি স্যার? আমি কি পাকিস্তান সেনার কাছে আছি?”

যেখানে পাক প্রধানমন্ত্রী শান্তির বার্তা দিয়ে আলোচনার কথা বলে বিবৃতি দিচ্ছেন, সেখানে তার ঠিক উল্টো ছবি দেখা গেল ওই ভিডিয়োতে। আর সেখানেই প্রশ্ন তুলেছেন একাধিক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্তা, আদৌ শান্তির জন্য কতটা আন্তরিক পাকিস্তান?

রক্তাক্ত অবস্থায় যে ভাবে তাঁকে সামনে নিয়ে আসা হয়েছে তা নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছে ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রক। বিকেলে পাক উপরাষ্ট্রদূতকে ডেকে কড়া বার্তা দিয়ে অবিলম্বে গ্রেফতার হওয়া পাইলটকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। উইং কমান্ডারের সঙ্গে মানবিক ব্যবহার করা উচিত পাকিস্তানের। যুদ্ধবন্দির মর্যাদাও দেওয়া উচিত।

১৯৪৯-এর জেনিভা কনভেনশনে পরিষ্কার বলা আছে, দু’টি দেশের মধ্যে এ রকম সংঘর্ষের পরিস্থিতিতে কোনও পক্ষের কোনও বাহিনীর সদস্য যদি অন্য পক্ষের এলাকায় সেখানকার বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে, তবে তাঁকে যুদ্ধবন্দির মর্যাদা দিতে হবে। কিন্তু এই জেনেভা চুক্তি কী?

এই ১৯৪৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিতে সাক্ষরিত্‍ হওয়া যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধবন্দীদের অধিকার নির্ণয় এবং যুদ্ধ ক্ষেত্র ও সংলগ্ন এলাকার অসুস্থ ও অসামরিক ব্যক্তিদের সুরক্ষাও দেয় এই চুক্তি। এখনও অবধি বিশ্বের ১৯৬টি দেশ এই চুক্তি মেনে চলার বিষয়ে স্বাক্ষর করেছে।

এই চুক্তি এই আহত এবং অশক্ত সৈন্যদের রক্ষা করে। জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ, ধর্ম, বিশ্বাস, নাগরিকত্ব ও ধন-সম্পদ নির্বিশেষে মানবিক আচরণ পাওয়া নিশ্চিত করে। এছাড়া এটি নির্যাতন, আক্রমণ এবং বিচার ছাড়াই মৃত্যুদণ্ডের ঘটনাকেও নিষিদ্ধ করে। সেইসঙ্গে সঠিক চিকিৎসা এবং যত্ন পাওয়ার অধিকারও দেয়।

এতে বলা হয়েছে যুদ্ধবন্দীদের ক্ষেত্রেও প্রথম সম্মেলনের চুক্তির ধারা মানতে হবে। সেঈই সঙ্গে যুদ্ধবন্দীরা শুধু মাত্র তাদের নাম, পদ ও পরিচয় জানাতে বাধ্য থাকবে। অন্য কোনও রকম তথ্য আদায়ের জন্য তাদের নির্যাতন করা যাবে না। তাঁকে পর্যাপ্ত খাদ্য-পানীয় দিতে হবে। এ রকম একাধিক অধিকার সুনিশ্চিত করা হয়েছে জেনিভা কনভেনশনে। সে সবই এ দিন পাকিস্তান ভেঙেছে বলে অভিযোগ ভারতের।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৯৭১-এর যুদ্ধে হামলায় ভেঙে পড়ে একটি পাক ফাইটার। পাইলট প্যারাশুটে করে নামলে তাঁকে ঘিরে ধরেন ভারতীয় জওয়ানরা। ওই পাক পাইলটকে উদ্ধার করে জেনিভা কনভেনশনের নিয়ম মেনে তাঁকে নিয়ে যান বাহিনীর সদর দফতরে। যুদ্ধ শেষে পাকিস্তানের হাতে তুলে দেওয়া হয় সেই পাইলট পারভেজ কুরেশি মেহেদিকে। তিনিই পরবর্তীতে পাক বায়ুসেনার প্রধান হয়েছিলেন।

কার্গিল যুদ্ধের সময় একই ভাবে পাকিস্তানের মাটিতে ধরা পড়েন অন্য এক বায়ুসেনা পাইলট কমবমপতি নচিকেতা। তাঁকে আট দিন পরে রেড ক্রসের মাধ্যমে ভারতের হাতে ফেরত দেওয়া হলেও, অমানুষিক অত্যাচার করা হয়েছিল তাঁর উপর।

Read More : গ্রেপ্তার হয়ে ভারতীয় পাইলট যা বললেন শুনলে স্যালুট জানাবেন

ভারতের এই অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসতেই পাক সেনার মুখপাত্র আসিফ গফুর ফের একটি ভিডিয়ো প্রকাশ করে দাবি করেন, সামরিক রীতি মেনেই রাখা হয়েছে ভারতীয় পাইলটকে। ওই ভিডিয়োতে দেখা যাচ্ছে, উইং কমান্ডার অভিনন্দন চা খাচ্ছেন। তিনি বলছেন যে, তাঁর সঙ্গে পাক সেনা ভদ্র ব্যবহার করেছে।