ভারতের ১০ ধনী মন্দির ও তাদের ধন সম্পদের পরিমান

ভারত বিশ্বাসের দেশ।ভারত মন্দিরের দেশ।হিন্দু ধর্মে মন্দিরের স্থান সর্বোচ্চ। আর হিন্দু প্রধান দেশ ভারতবর্ষের ইতিহাস থেকেই আমরা জানি বিভিন্ন বংশের হিন্দু রাজারা মন্দির নির্মাণ ও তার সাজসজ্জায় কোনো রূপ কার্পণ্য করেন নি।মন্দির যেন তাদের সৃষ্টিশীলতার প্রতীক। তাদের বৈভবের, ঐশ্বর্যের নিদর্শন। রাজারা অকাতরে দিয়েছেন জমি, ধন সম্পদ যা দিয়ে নির্মাণ হয়েছে অপরূপ সব মন্দির। যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে যেমন দান করেছেন তেমনি যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার আশীর্বাদ গ্রহণের উদ্দেশ্যে পূজিত দেবতাদের চরণে সমর্পন করেছেন অঢেল ধনসম্পদ। আর এই ভাবেই বেড়েছে মন্দিরের সম্পত্তির পরিমান। তাছাড়া দর্শনার্থীরা যেসব মন্দিরে পূজা দিয়ে তাদের মনের ইচ্ছা পূর্ন হয়েছে সেই সেই জাগ্রত মন্দিরে যুগ যুগ ধরে ধর্মপ্রাণ হিন্দুরা বারবার গিয়েছে মন্দিরে তাদের আরাধ্য দেবতার কাছে।দেবী বা দেবতার আশীর্বাদ লাভের আশায় এইসব মন্দিরে রোজ হাজার হাজার পুণ্যার্থী আসেন। তাই এইসব মন্দিরকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে প্রাচীন সব শহর। আসুন জেনে নিই ভারতের ১০টি সবচেয়ে ধনী মন্দিরের নাম ও তাদের ধন সম্পদের পরিমান

১০) বিশ্বনাথ মন্দির

দেবাদিদেব মহাদেবের এই মন্দির ভারতের ধনী মন্দিরগুলির মধ্যে অন্যতম। এটি মন্দিরের শহর কাশীতে অবস্থিত। গঙ্গা নদীর তীরেই এই মন্দির।অতীতে বারবার এই মন্দির বার বার লুট হয়েছিল বিভিন্ন ধর্মের রাজাদের দ্বারা লুট করা হয়েছিল। তবুও এই মন্দির বারবার তার মহিমা পুনরুদ্ধার করেছে।

এই প্রতিদিন এই মন্দিরে প্রতিদিন হাজার হাজার পুণ্যার্থী আসেন বাবা শিবের মাথায় জল ঢালতে ও পূজা নিবেদন করতে। আর সোমবার এই ভিড় সবচেয়ে বেশি হয়। শ্রাবন মাসের পুন্য সময়ে প্রতিদিন অগণিত ভক্ত আসেন । ২০১৬ সালের হিসাব অনুযায়ী ৩০ লক্ষ দেশীয় দর্শনার্থী ও ২ লক্ষ বিদেশী দর্শনার্থী এই মন্দির দর্শন করেছেন সেই বছর। এই মন্দিরের বাৎসরিক অনুদান ৫-৬কোটি।এই মন্দিরের তিনটি চূড়ার মধ্যে দুটি চূড়া সোনা দ্বারা আচ্ছাদিত।

৯) জগন্নাথ মন্দির

উড়িষ্যা রাজ্যের পুরী শহরে অবস্থিত এই মন্দির ওড়িয়াদের তথা হিন্দুদের কাছে অন্যতম পবিত্র মন্দির ও দর্শনীয় স্থান।বছরের প্রতিটি দিন এই মন্দিরে অসংখ্য পুণ্যার্থী আসেন ।এই মন্দিরের আরাধ্য দেবতা হল ভগবান জগন্নাথ, বলরাম ও তাদের একমাত্র বোন সুভদ্রা।এই মন্দিরের স্থাপত্য সত্যিই বিস্ময়কর।রথযাত্রার সময় এই মন্দির সংলগ্ন অংশে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীর আগমন হয় রথের দড়ি টানার জন্য।এই মন্দিরের বিগ্রহের বিশেষত্ব হল এই বিগ্রহ নিম কাঠের হয়।প্রতি বছর নতুন বিগ্রহ তৈরি করা হয়।এই মন্দিরে চারটি প্রমুখ দরজা আছে।এই মন্দিরের ভোগ সারা ভারতে বিখ্যাত।

উড়িষ্যা সরকারের এক হিসাব অনুযায়ী এই মন্দিরের সম্পত্তির পরিমান ৩০০ কোটির বেশি।আনুমানিক ৩০ হাজার দর্শনার্থী প্রতিদিন এবং রথের মাসে প্রতিদিন ৭০ হাজারের মত পুণ্যার্থী এই মন্দিরে পূজা দেন।প্রতিদিন অনুদান হিসেবে প্রাপ্ত অর্থের পরিমান প্রায় কোটি টাকা।একবার এক বিদেশী ভক্ত ১.৭২ কোটি টাকা অনুদান হিসেবে দান করেন।

৮) মীনাক্ষী মন্দির

তামিলনাড়ুর মাদুরায়ে অবস্থিত এই মন্দির পুণ্যার্থী সমাগম ও অনুদান সংগ্রহে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।এই মন্দিরের আরাধ্যা দেবী মীনাক্ষী(পার্বতী),তিনি উৎকর্ষের দেবী।যিনি ভগবান সুন্দরেশ্বর(শিব)এর স্ত্রী।প্রতিদিন এই মন্দিরের ভক্তদের থেকে প্রাপ্ত অনুদানের পরিমান পাঁচ থেকে ছয় লক্ষ টাকা।বছরে পাওয়া অনুদান প্রায় ১০থেকে ১২কোটি।এই মন্দিরের কারুকার্য দক্ষিন ভারতের সুন্দর স্থাপত্য দিয়ে গড়া।এই মন্দিরে ১৪টির মতো গোপুরম(স্তম্ভ) আছে যাদের প্রত্যেকটির উচ্চতা ৪০-৫০মিটার ।এই মন্দিরে দুটি সোনার তৈরি বিমান আছে, যা এই মন্দিরের সৌন্দর্য্য আরও বাড়িয়ে দেয়।

৭) সোমনাথ মন্দির

গুজরাটের সৌরাষ্ট্রে অবস্থিত সোমনাথ মন্দির প্রাচীনকাল থেকেই বারবার ইতিহাসের পাতায় উঠে এসেছে তার ধন সম্পদ ও বারবার তার বিদেশী আক্রমণকারীদের লুটের কারণে।কথিত আছে মহম্মদ ঘোরি এই মন্দির ১৭বার লুট করেছিলেন ও মন্দিরের প্রমুখ ক্ষতি করেছিলেন।তবুও বারবার এই মন্দির ভারতীয় রাজারা নির্মাণ করেছেন ।অতীতে এই মন্দির ভারতের সবচেয়ে ধন,সম্পদপূর্ন মন্দির ছিল।এটি মহাদেব শিবের বারো জ্যোতিলিঙ্গের মধ্যে একটি।সারা ভারত এবং বিদেশ থেকেও বহু পুণ্যার্থী আসেন এই মন্দির দর্শন ও পূজা নিবেদন করতে।এই মন্দিরের কারুকার্য সত্যিই অতুলনীয়।সমুদ্রের তীরবর্তী এই মন্দির সেসময়কার রাজাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নতি আমাদের আজও অবাক করে।

৬) স্বর্ণ মন্দির

পাঞ্জাবের অমৃতসরে অবস্থিত স্বর্ণ মন্দির বা শ্রী হরমিন্দার সাহিব আসলে এক গুরুদ্বারা।শিখ ধর্মালম্বীদের তথা সকল ধর্মের মানুষের কাছে এক অন্যতম দর্শনীয় স্থান।এই মন্দিরে কোনো মূর্তি বা বিগ্রহ নেই।এই মন্দির শিখদের সবচেয়ে পবিত্র স্থান।এই মন্দিরের লঙ্গরখানায় প্রতিদিন ১ লক্ষ লোকের খাবার তৈরি করা হয় যা সারা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।

এই মন্দির সম্পূর্নভাবে সোনা দ্বারা আচ্ছাদিত।এছাড়াও এখানে রুপার কাজের নিদর্শন দেখা যায়।ধর্ম, বর্ন নির্বিশেষে অগুনতি মানুষ আসেন এই গুরুদ্বারায়। মন্ত্রী থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ন আমলা,ফিল্মস্টার এখানে বিনা পারিশ্রমিকে শ্রমদান করেনও লঙ্গরখানায় ভোগ গ্রহণ করেন।

৫) সিদ্ধিবিনায়ক মন্দির

মহারাষ্ট্রের সবচাইতে জনপ্রিয় মন্দিরের মধ্যে অন্যতম এই মন্দির। এই মন্দিরের আরাধ্য দেবতা গনেশ। ভারতের অর্থনৈতিক রাজধানী মুম্বাইয়ে অবস্থিত হওয়ায় এবং ভক্তের সকল মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করার জন্য এই মন্দিরে পুণ্যার্থী ভক্তদের ভিড় খুব বেশি। প্রতিদিন এই মন্দিরে ভক্ত সংখ্যা ২৫ হাজারের আশেপাশে থাকে এবং গনেশ চতুর্থীর সময় তা ২লক্ষ পর্যন্ত পৌঁছায়।এই মন্দিরের বার্ষিক ভক্তদের অনুদান ৪৫ কোটি থেকে ১২৫কোটি বা তার বেশিও হয়।বিগ্রহের উপর ৩.৭কেজি ওজনের সোনার গম্বুজ আছে।১৯৯০ সালে এই মন্দির ৬ তল্লা আবাসনে পরিণত করা হয়।প্রতিদিন কোনো না কোনো বলিউড ফিল্মস্টার,রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এই মন্দিরে পূজা দিয়ে ভগবান গনেশের আশীর্বাদ গ্রহণ করেন।

৪) সিরডি সাইবাবা মন্দির

ভারতের মহারাষ্ট্রের মধ্যে অপর একটি ধনী মন্দির হল এই মন্দির। যেখানে সকল ধর্মের, জাতের,মানুষ আসে ও তাদের আরাধ্য দেবতা সাইবাবা। এই এক মন্দির যেখানে মানুষ দেবতা রূপে পুজিত হয়। যদিও কথিত আছে এই সাইবাবা সকল প্রকার মানুষের মনের ইচ্ছা পূরণ করেন অর্থাৎ তিনি ছিলেন ঐশ্বরিক ক্ষমতার অধিকারী।আর তাই জন্য পুণ্যার্থীরা এই মন্দিরে ভিড় জমায় সারা বছর ধরে তাদের মনের ইচ্ছা পূরণের জন্য। এই মন্দির ভারতের চতুর্থ ধনসম্পদশালী মন্দির। সারা বছরে এই মন্দিরে ৩০কোটির বেশি সোনার অলঙ্কার ও ১কোটির রুপার অলঙ্কার ভক্তরা দান করেন। এই মন্দিরে বাৎসরিক অনুদানের পরিমান ৩৬০ কোটি টাকা।

৩) বৈষ্ণদেবী মন্দির

ভারতের প্রাচীন ও ধনবান মন্দিরের মধ্যে তৃতীয় স্থানে আছে মাতা কি মন্দির। সারা ভারত ও বিশ্ব থেকে অসংখ্য পুণ্যার্থী জম্মু কাশ্মীরের কাটারায় অবস্থিত এই মন্দিরে আসেন মাতার দর্শনের জন্য।সারা বছরে ৮০লক্ষের মতো পুণ্যার্থী আসেন মন্দিরে তাদের মনস্কামনা পূরণ করার জন্য। মাতা সতীর একান্নটি পীঠের মধ্যে অন্যতম এই মন্দির।মাতা খুবই জাগ্রত এখানে।এই মন্দিরের পথ দুর্গম হওয়ার সত্ত্বেও ভক্তদের ভিড় কমেনি কোনো দিন।এই মন্দিরের বার্ষিক অনুদানের পরিমান ৫০০কোটি টাকার কাছাকছি।

২) তিরুমালা তিরুপতি ভেঙ্কটেশরা মন্দির

অন্ধ্রপ্রদেশের তিরুমালার অন্তর্গত তিরুপতি মন্দির ভারতের দ্বিতীয় ধনবান মন্দির।এই মন্দিরের আরাধ্য দেবতা ভেঙ্কটেশ(বিষ্ণু)।সারা বিশ্বের হিন্দুদের কাছে খুবই পবিত্র ও দর্শনীয় স্থান এই মন্দির।প্রতিদিন প্রায় ৬০হাজারের মতো পুণ্যার্থী আসে এই মন্দিরে পূজা নিবেদন করতে ।ভেঙ্কটেশ দেবতা প্রায়১০০কেজি সোনার তৈরি অলঙ্কার দ্বারা ভূষিত।এই মন্দিরের বিখ্যাত প্রসাদ লাড্ডু বিক্রি করে বছরে প্রায়১৩কোটি মার্কিন ডলার আয় হয়।।এই মন্দিরের বার্ষিক অনুদানের পরিমান প্রায় ৭০০কোটি টাকা।হাজার হাজার পুণ্যার্থী এই মন্দিরে তাদের চুল দান করে যান। পাহাড়ের উপরএই মন্দির ভাস্কর্য ও স্থাপত্য শিল্পের এক বিখ্যাত নিদর্শন।

১) পদ্মনাভস্বামী মন্দির

ধন সম্পদের দিক থেকে এই মন্দির ভারতের তথা বিশ্বের অন্যতম।কেরালার তিরুবান্তাপুরম এ অবস্থিত এই মন্দিরের আরাধ্য দেবতা হল ভগবান শ্রী বিষ্ণু।এই মন্দিরের গুপ্ত কক্ষে ৬টি ঘর থেকে ২০০০ কোটি ভারতীয় মূল্যের ধনসম্পদ পাওয়া গিয়েছে। ভগবান শ্রী বিষ্ণুর আনুমানিক ৫০০কোটি টাকা মূল্যের সোনার মূর্তি পাওয়া গিয়েছে।সোনা ছাড়াও হিরে, পান্না, ও অন্যান্য মূল্যবান রত্ন পাওয়া গিয়েছে।এখনও এই মন্দিরের সব গুপ্ত কক্ষ খোলা সম্ভব হয় নি।

১৮ ফুট লম্বা এবং ২.৫কেজি ওজনের সোনার গলার হার বিষ্ণু বিগ্রহের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দেয়।সারা বছর ধরে অসংখ্য পুণ্যার্থী আসেন এই মন্দির ও বিগ্রহ দর্শন ও পূজা করতে।