এক নতুন শাহজাহানের দ্বিতীয় তাজমহল তৈরির গল্প

মুঘল সম্রাট শাহজাহান তার প্রিয়তমা মুমতাজের স্মৃতির উদ্দেশ্যে বানিয়েছিলেন তাজমহল।যা আজ পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের মধ্যে অন্যতম।আর প্রেমের এই স্মৃতিসৌধ দেখতে সারা বিশ্ব জুড়ে অসংখ্য ভ্রমনার্থী ও দেশীয় মানুষ আসেন আগ্রায়।সারা বছর জুড়েই এই ভিড় দেখা যায় তাজমহলকে ঘিরে।আর কেনই বা হবে না ,এই আকর্ষণ।পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কারিগর, এবং সারা বিশ্বের উল্লেখযোগ্য স্থান থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল এই স্মৃতিসৌধ বানানোর উপাদান।প্রায় ২০ বছরের চেষ্টায় তৈরি করা হয়েছিল এই অপরূপ ও অনাবিল ,বিস্ময় সৃষ্টিকারী এই ইমারত।

 

মানুষ তার ভালোবাসার জন্য নিজেকে উজাড় করে দিতে পারে।এই তাজমহল নির্মাণ যেন সেই প্রেমের কথা আজও আমাদের জানান দিচ্ছে।কিন্তু শুধু যে মুঘল যুগেই সুলতান তার বেগমের প্রতি ভালোবাসা বা প্রেম নিদর্শনের জন্য এইরকম স্মৃতিসৌধ বানিয়েছে তা কিন্তু নয়।এই একবিংশ শতাব্দীতেও এমন একদুজন মানুষের সন্ধান পাওয়া যায় যারাও তাদের প্রেমিকার প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনের জন্য এইরকম অসামান্য কিছু কাজ করেন।যা তাদের  ভালোবাসাকে ঐতিহাসিক পর্যায়ে উন্নীত করে।যা তাদের স্থান দেয় ইতিহাসে।এইরকমই একজন আধুনিক ভারতের  প্রেম ভালোবাসা সম্পন্ন মানুষ হলেন  ফয়জুল হাসান কাদেরী।বর্তমান বয়স ৭৭ বছর।তিনি তার স্ত্রী তাজমমূলী বেগমের স্মৃতির উদ্দেশ্যে সম্রাট শাহজাহানের মতোই বানাচ্ছেন এক স্মৃতিসৌধ যা হুবহু তাজমহলের আকারের।এই কর্মকান্ডটি তিনি করছেন তার গ্রামে যা উত্তরপ্রদেশের  বুলন্ড শহর জেলায় অবস্থিত।আর তার বানানো তাজমহলের প্রতিকৃতি দেখতে তাদের গ্রামে অনেকদূর দূর থেকে লোক আসছে।

কাদেরী সাহাবের কথায়,”আমার স্ত্রী ও আমার মধ্যে ভালোবাসা কখনোই কম ছিল না, আমরা একে অপরকে খুবই ভালোবাসতাম।কিন্তু আমাদের কোনো সন্তান না হওয়ার জন্য আমাদের কিছুটা খারাপ লাগতো।তাই আমার পত্নী আমাকে  বারবার  বলত যে, দেখবে আমাদের মৃত্যুর পর আমাদের কেউ মনে রাখবে না।আর তাই আমি তার কাছে কথা দিয়েছিলাম, যে যদি তুমি আমার আগে মারা যাও তাহলে তোমার স্মৃতির উদ্দেশ্য আমি এমন কিছু বানাবো যা আমাদের দুজনকে সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে অমর করে রাখবে।আর তাজমহলের চেয়ে এইরকম ভালো  স্মৃতিসৌধ  আর কী বা হতে পারে।আর তার স্ত্রীর কথা যেন তার জীবনে সত্যি হয়েই দেখা দিয়েছিল।তার স্ত্রী তাজামমূলী বেগম ২০১১ সালের ডিসেম্বর  ক্যান্সার রোগে মারা যান।তার স্ত্রীর কথা ভাবতে ভাবতে তিনি আরও বলেন ,আমাদের যখন বিবাহ হয়েছিল তখন ওর বয়স ছিল  ১৪ বছর।

 

আর আমার বয়স ছিল ১৭ বছর।বিয়ে করার পর যখন বউ তার বাড়িতে আসে তখন তার স্ত্রীর নম্রতা, মিষ্টি স্বভাব ও সকলের সঙ্গে মেলামেশা সবার মন জয় করে নিয়েছিল।বিয়ের সময় তার বেগম ছিল নিরক্ষর।কাদেরী সাহাব নিজেই  তাকে শিখিয়েছিলেন উর্দু বলতে কিন্তু তার দ্বারা আর লেখা সম্ভব হয়ে উঠেনি।আমরা প্রায় ৫৮ বছর ধরে একসাথে দাম্পত্য জীবনের সুখ, দুঃখ আনন্দ, ফূর্তি উপভোগ  করেছি।তাই তার মৃত্যুর পর তার স্ত্রীর প্রেম আজও তার হৃদয়ে সমান ভাবেই আছে।ভারতীয় ডাক বিভাগের এই প্রাক্তন কর্মী তাই ঠিক করে তার স্ত্রীর স্মৃতিতে তিনি তৈরি করবেন এক তাজমহলের মতো স্মৃতিসৌধ।কিন্তু যা মুখে বলা বা মনে ভাবা সহজ তা কাজের ক্ষেত্রে একদমই সহজ নয়।এই তাজমহল স্বরূপ স্মৃতিসৌধ বানানোর জন্য তার দরকার ছিল অনেক অনেক টাকার যা তার কাছে ছিল না।তাই তিনি এই মহৎ কাজ করার জন্য তার অবসর জীবনের জমানো প্রায় সব টাকা নিয়ে এগিয়ে পড়েছিলেন এই কাজে।

কিন্তু তার জমানো অবসরের টাকাও এক্ষেত্রে অনেক কম ছিল তাই তিনি তার অধীনে থাকা জমি টাকার জন্য বিক্রি করেন এবং বিক্রি করেন তার প্রিয়তমার মূল্যবান অলঙ্কার।আর এইভাবেই তিনি জোগাড় করেছিলেন  ৭৫ লক্ষ টাকার মতো।কিন্তু তার এই স্মৃতিসৌধ বানাতে এখনও প্রয়োজন আরও ৬০ থেকে ৬৫ লক্ষ টাকার মতো।কিন্তু তিনি অন্যের কাছ থেকে ধার হিসেবে বা অনুদান হিসেবে এক টাকাও সাহায্য নিতে রাজি নন।তিনি বলেন এই স্মৃতিসৌধ তার সম্পূর্নই একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার ,আর তাই  তার স্ত্রীর স্মৃতিসৌধ বানানোর জন্য অন্যের কাছে থেকে কোনরূপ অর্থ সাহায্য গ্রহন  করেন নি।তার মতে আমি আমার কথা রাখার চেষ্টা করেছি ,আর আমি এত সহজেই আমার আশা থেকে আশাহত হবো না,সময় যতদিনই লাগুক আমি এই কাজ করবোই ।

 

আসল তাজমহলের মতোই কাদেরী সাহাব তার মৃত্যুর পর নিজেকে কবরস্থ করার জন্য তার স্ত্রীর কবরের পাশে জায়গা খালি রেখে দিয়েছে।কিন্তু এই তাজমহলের প্রতিকৃতি বানানো সহজ ছিল না।তাই এই কাজ করার জন্য তিনি একজন বাস্তুকারের সাহায্য নিয়েছিলেন।কিন্তু বাস্তুকার যখন তাকে এক কম্পিউটারে তৈরি মডেল দেখিয়েছিল তখন তা তার মনে ধরে নি।যেহেতু তিনি অনেকবারই তাজমহল গিয়েছেন তাই তিনি প্রকৃত তাজমহলের  প্রতিকৃতি বানানোর জন্য হাতে তৈরি করা ছবিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী আমরা তাই অনেক বিষয়ে আপোস করেছি।আমার ধারনা ছিল আমি তাজমহলের মতো কিছু একটা বানাচ্ছি।তবে একদম তাজমহলের প্রতিকৃতি নয়।তাই আসল তাজমহলের মতো তার বানানো তাজমহলে বেশি কক্ষ নেই এ,আছে শুধু একটি ছোট কক্ষ ।আর তাছাড়া শাহজাহানের বানানো তাজমহলে যেমন বিভিন্ন রত্নের দ্বারা খচিত ছিল তাজমহলের দেওয়াল ,এক্ষেত্রে কিন্তু সেইরকম কিছু করেন নি কাদেরী সাহেব।

কিন্তু দূর থেকে দেখলে তার বানানো তাজমহল ও শাহজাহানের বানানো তাজমহলের মধ্যে পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যাবে না।কিন্তু তার এই স্মৃতিসৌধ বানানো সময় অনেকের কাছেই মনে হয়েছে টাকার অপচয় ছাড়া আর কিছু নয় ।কিন্তু আজ যখন অনেক জায়গা থেকে লোক এসে ঘুরে দেখে যায় তার বানানো  স্ত্রীর উদ্দেশ্যে এই স্মৃতিসৌধ তখন তার একবারের জন্যও মনে হয় না যে তার টাকার অপচয় হয়েছে। তাই অনেক গরিব ভারতীয় যারা আগ্রার তাজমহল দেখতে যেতে পারে নি, কিন্তু দেখেছে কাদেরী সাহাবের বানানো স্মৃতিসৌধ তাদের সকলের কাছে কাদেরী বাবু হয়ে উঠেছেন আধুনিক ভারতের শাহজাহান।