রিক্সাচালক থেকে বিশিষ্ট সাহিত্যিক হওয়ার গল্প, যা আপনাকে অনুপ্রানিত করবে

‘হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে’ তিনি ভয় পাননি। তাই তাঁর জীবনী হয়ে উঠেছে সাহিত্য। তাঁর আত্মকথনই ইতিহাস। তিনি মনোরঞ্জন ব্যাপারী। জীবন চালাতে হেন কাজ নেই করেননি। রিক্সা টেনেছেন, লোকের বাড়ি রান্না করেছেন এমনকি করেছেন মেথরের কাজও। আর লিখেছেন। নিজের কথা, সমাজের কথা। তাঁর আত্মজীবনী ‘ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন’ পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি কতৃক ২০১৪ সালে পেয়েছেন সুপ্রভা মজুমদার স্মৃতি পুরষ্কার। অথচ লেখাপড়ায় হাতেখড়ি হয়েছিল ২৪ বছর বয়সে জেলখানায়। মেঝেতে দাগ কেটে। সেই মনোরঞ্জন আমন্ত্রিত ছিলেন একাদশতম জয়পুর লিটারেরি ফেস্টিভ্যালে। কথা বলেছেন সমাজ, জীবন এবং আম্বেদকরকে নিয়ে। মনোরঞ্জনের কথায়, ‘সবটাই ছিল না-খাওয়ার বিরুদ্ধে একটা লড়াই।’

মহাশ্বেতা দেবীর সঙ্গে আলাপ

যাদাবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের রাস্তায় রিকশা চালাতেন মনোরঞ্জন ব্যাপারী। এক মহিলা সওয়ারি হঠাত তাঁকে জিজ্ঞেস করেন ‘জিগীবিষা’ শব্দের অর্থ। অনায়াসে বলে দেন মনোরঞ্জন ‘বেঁচে থাকার ইচ্ছা’। এক রিকশা চালকের মুখে এমন সংস্কৃত শব্দের অর্থ শুনে আশ্চর্য ভদ্রমহিলা জানতে চাইলেন তাঁর লেখাপড়ার কথা। মনোরঞ্জন জানান, স্কুলে যাননি। জেলখানায় লেখাপড়া শিখেছেন। তারপর থেকেই বই পড়ার নেশা। সেই ভদ্রমহিলা তাঁকে লেখার ব্যাপারে উৎসাহ দেন। বলেন, ‘লিখে ফেল এমন জীবনের গল্প।’ সেই শুরু। তাঁর লেখা বাংলার সিরিয়াস পাঠক সমাজে জায়গা করে নিল দ্রুত। হয়ে উঠলেন পুরোদস্তুর লেখক। আর যার কথায় প্রেরণা পেয়েছিলেন মনোরঞ্জন, তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং মহাশ্বেতাদেবী।


আজীবন পিছিয়ে পড়া সমাজ ও মানুষদের হয়ে কলম চালিয়েছেন মহাশ্বেতাদেবী। তাঁর সঙ্গে মনোরঞ্জনের আলাপ একেবারে মণিকাঞ্চন যোগ। জয়পুর সাহিত্য উৎসবে বলেন, ‘আমার রিক্সার সওয়ারি হয়েছেন মহাশ্বেতাদেবী, এটা জানতে পেরে আশ্চর্য হয়ে যাই। প্রায় চার দশক আগের এই ঘটনাই আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।’ তাঁর রিক্সার সীটের নীচে সবসময় রাখা থাকে মহাশ্বেতাদেবীর ছোটগল্প সংকলন ‘অগ্নিগর্ভ’। প্রিয় লেখিকা কি-না তাঁরই রিক্সার সওয়ারি!মহাশ্বেতাদেবী সম্পাদিত বর্তিকা পত্রিকায় প্রথম ২০ পাতার একটি গল্প লেখেন। ১৯৮১ সালে তাঁর লেখা প্রথম গল্প ‘আমি রিক্সা চালাই।’ উঠে এসেছে উপন্যাসের একের পর এক চরিত্র। কিন্তু পাঠক সমাদরে এই সব কিছুকে ছাপিয়ে গেল তাঁর আত্মজীবনী ‘ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন’ প্রকাশের পর।

পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক শিপ্রা মুখোপাধ্যায় গ্রন্থের অনুবাদ করেছেন ‘মাই চণ্ডাল লাইফঃ অটোবায়োগ্রাফি অফ এ দলিত’। ‘এটা কোনও সাহিত্য নয়’ বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে মনোরঞ্জন জয়পুরে বলেন, ‘এটা বাস্তব।’ নোবেল, বুকার, পুলিত্জার জয়ী লেখকদের পাশে হামিদ কারজাই, মহম্মদ ইউনুস, বীর সাংভি, জাকির হুসেন, অনুরাগ কাশ্যপের সঙ্গে আন্তর্জাতিক জয়পুর সাহিত্য উৎসবের অন্যতম বক্তা মনোরঞ্জন ব্যাপারী।

মনোরঞ্জনের পরিচয়

কথায় বলে জাত চন্ডাল। তিনি সত্যিই চন্ডালের সন্তান। এটাই তাঁর সামাজিক অপরাধ। তাই তিনি তথাকথিত ভদ্রসমাজ, পেশা ও বৃত্তি, সমাজের অন্য মানুষের সহমর্মিতা ও সংবেদনশীলতা থেকে চিরবঞ্চিত। শুধু দলিত কিংবা ছোট জাত নয়, মনোরঞ্জনকে সইতে হয়েছে দেশভাগের বেদনাও। নিজের মা’ও বলতে পারেননা ছেলের জন্মমাস।
শৈশবেই নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে উদ্বাস্তু জীবন। বসবাস কখনও শিয়ালদহ স্টেশন। কখনও বা শরনার্থী শিবির। দন্ডকারন্যের উপর পাথুরে প্রান্তরে অনাহারে মৃত্যু হয় বাবা-মা`র। কোনওরকমে কলকাতায় ফেরা। যুক্ত হন রাজনীতির বিশেষ মতাদর্শে। দুবছরের জন্য কারাদন্ড। বব্দি অবস্থাতেই জেলের মাটির মেঝের উপর কাঠি দিয়ে দাগ টেনে অক্ষর পরিচয়। আর এই অক্ষর পরিচয় তাঁকে টেনে নিল বাংলা সাহিত্যের দিকে। পড়তে থাকলেন একের পর এক গল্প। উপন্যাস। জেল মুক্তির পর মাল টানার কাজ করলেন। পেটের তাড়নায় রিক্সা চালিয়েছেন তিনি। কিন্তু বই থেকেছে সর্বক্ষণের সাক্ষী। তাঁর সামনে খুলে যায় জ্ঞানের ভুবন। কিন্তু দারিদ্র ঘোচে না। ঘোচে না আগামিকাল কী খাবেন সেই অনিশ্চয়তা।

এই ৫৯ বছর বয়সেও একটু অন্নের সংস্থানের জন্য দু`শো জনের রান্নার কাজ করেন তিনি। কিন্তু এখন সে সব যেন আর তাঁকে স্পর্শ করে না। করলেও সৃষ্টি করে না কোনও গভীর ক্ষত। যন্ত্রণা সহ্য করার শ্রেষ্ঠ উপায় যে তাকে উপেক্ষা করা, তা সে তার চন্ডালের জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছে। মহাশ্বেতাদেবীর উৎসাহ আর উপলব্ধিকে ভাষায় রূপ দিতে লিখতে শুরু করেন। তার লেখা ছাপা হয় বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে। ছাপা হয় তার জীবনবোধের গল্প। লিখে ফেললেন তাঁর জীবনবোধের প্রবন্ধও। ‘ইতিবৃত্তে চন্ডাল জীবন’।


এখন দক্ষিণ কলকাতার মুকুন্দপুরে হেলেন কেলার বধির বিদ্যালয়ে সপ্তাহে ছ’দিন দু’বেলা রান্নার কাজ করেন মনোরঞ্জন ব্যাপারী। এই ডিউটি সামলে লেখেন কখন? হেসে ফেললেন মনোরঞ্জন। বড় কষ্টের সে হাসি। ‘বুঝতেই পারছেন কী ভাবে লিখি। আগে, কম বয়সে অনেক পরিশ্রমের পরও লিখে যেতাম। কিন্তু এখন আর পারি না। হাঁটুর দোষ অনেক দিন ধরে। একটা হাঁটু অপারেশন হয়েছে। আরও একটা হবে। শরীরে আরও নানান রকমের সমস্যা। এই পরিশ্রম সইতে পারছি না। কিন্তু পেটের জন্য করে যেতে হচ্ছে।’

মনোরঞ্জন ব্যাপারী নিজেকে বলেন, ‘এ রাইটার ইন আঙ্গুয়িশ।’ তাঁর কথায় ‘আমি রেগে থাকি, তাই লিখি। চকা ঘুরছে, গন্তব্যের কাছাকাছি পৌছেছি। কিন্তু কার ভাগ্য ঘুরল? আমার না-কি আমার রিক্সার? কে সামনে এগোবে? আমি না আমার রিক্সা?
দর্শকদের মনোরঞ্জন জানিয়ে দেন, দক্ষিণ কলকাতার মুকুন্দপুরে হেলেন কেলার বধির বিদ্যালয়ে সপ্তাহে ছ’দিন দু’বেলা রান্নার কাজ করেন মনোরঞ্জন। শ-দেড়েক করে পাত পড়ে দু’বেলাই। এটাই তাঁর চাকরি। আবাসিক এই স্কুলটি রাজ্য সরকারের জনশিক্ষা দফতরের অধীনে। সকাল সাড়ে ৬টার মধ্যে স্কুলে যান। রান্না সেরে বেরোতে বেরোতে বেলা ১১টা-সাড়ে ১১টা। রবিবার অনেক সময় দুপুরও গড়িয়ে যায়। সন্ধেতে আবার সেই একই রকম সময়ের ডিউটি।
গলার গামছায় একটা পাক মেরে বলে ওঠেন ‘গামছাটাই আমার জন্য যথেষ্ট। খালি মেঝেতে শুয়ে ঘুমোতে পারি। গামছাটা মাথায় পাগড়ির মতো বেঁধে বেরিয়ে পড়তে পারি। কাছে থাকে গীতা। আর গুলতি আমার অস্ত্র। দোমিনেক ল্যাপিয়ের রচিত ‘সিটি অফ জয়’-এর রিক্সা চালক হাসারি পালের পর আর এক অন্ত্যজ চণ্ডাল রিক্সা চালকের বলিষ্ঠ কলমের কথা। গল্পটা এখনও চলছে।’