কীভাবে ডিজাইন করা হয়েছিল ভারতের পতাকা?

প্রত্যেক স্বাধীন দেশেরই আছে নিজস্ব জাতীয় পতাকা। এই পতাকা সেই দেশের মর্যাদার প্রতীক। সেই দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। তেমনই আমাদের দেশের জাতীয় পতাকা আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের দেশের সংস্কৃতিকে সারা বিশ্বের দরবারে তুলে ধরে। বর্তমানে আমাদের দেশের জাতীয় পতাকা হল ত্রিবর্ণ রঞ্জিত পতাকা। এই ত্রিবর্ণ যে তিনটি রঙের সমাহার সেগুলি হল গেরুয়া, সাদা ও সবুজ। এছাড়াও  জাতীয় পতাকার কেন্দ্রে থাকে চব্বিশটি দন্ডযুক্ত নীল অশোক চক্র। তবে স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে ভারতের বর্তমান জাতীয় পতাকা প্রথম থেকেই ছিল না। বর্তমানের যে জাতীয় পতাকা আমাদের দেশ গ্রহণ করেছে তার পূর্বে আলাদা আলাদা পতাকা  বিবর্তনের মাধ্যমে আজকের এই পতাকাকে আমরা পেয়েছি।আজকের আলোচনায় সেইসব বিভিন্ন পতাকার নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করব।

বর্তমানের জাতীয় পতাকার নকশা করেছিলেন পিঙ্গলি ভেঙ্কাইয়া। বর্তমানের জাতীয় পতাকার এই রূপটি  ভারতের সরকারি পতাকা হিসাবে গৃহীত হয়েছে ১৯৪৭সালের ২২শে জুলাই গণপরিষদের এক অধিবেশনে।জাতীয় কংগ্রেসের স্বরাজ পতাকার ভিত্তিতে এই  পতাকাটির নকশা তৈরি করেছিলেন পিঙ্গলি ভেঙ্কাইয়া।

তবে জাতীয় পতাকার বিবর্তনের ইতিহাস জানতে গেলে আমাদের ইতিহাসের পাতার দিকে নজর দিতে হবে। ১৮৫৭ সালের  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে মহাবিদ্রোহ হওয়ার পর ভারত প্রত্যক্ষভাবে  ব্রিটিশ শাসনের আওতায় চলে আসে। তখন সেই সময়কার ব্রিটিশ শাসকরা অনুভব করেন ভারতের জন্য জাতীয় পতাকার ধারণাটি। তাই তারা সর্ব প্রথম “স্টার অফ ইন্ডিয়া”নামের এক পতাকা ভারতের জন্য গ্রহণ করেন।

পতাকাটি কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া ও অন্যান্য ব্রিটিশ উপনিবেশের মতো ছিল।লাল ও নীল রং যুক্ত পতাকাটির উপরের দিকের বাঁদিকে ছিল “ব্রিটিশ ইউনিয়ন পতাকা” এছাড়াও ডানদিকের মধ্যভাগে রাজমুকুটের মতো ঘেরা একটি “স্টার অফ ইন্ডিয়া” ছিল।

এরপর বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে যখন ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের আন্দোলন যখন জোরদার হতে শুরু করে তখন ভারতীয়রা দেশবাসীকে অনুপ্রাণিত করার উদ্দ্যেশ্যে একটি জাতীয় পতাকার প্রয়োজন অনুভব করেন।

১৯০৪ সালে স্বামী বিবেকানন্দের বিদেশি মহিলা শিষ্য ভগিনী নিবেদিতা ভারতের প্রথম দেশীয় জাতীয় পতাকার রূপদান করেন। পতাকাটি ছিল লাল চতুস্কোণ আকৃতির।এই পতাকার মাঝখানে ছিল বজ্রের ছবি এবং শ্বেত পদ্মের ছবি। এই দুই ছবি হলুদ রঙের উপরে ছিল। পতাকায়” বন্দে মাতরম”কথাটি বাংলায় লেখা ছিল।এই পতাকার লাল বর্ন  ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক ছিল,হলুদ রং ছিল বিজয়ের প্রতীক এবং শ্বেতপদ্ম  ছিল পবিত্রতার প্রতীক।

পরবর্তীতে ১৯০৬ সালে কলকাতার বঙ্গভঙ্গ বিরোধী এক জনসভায় পার্সীবাগান স্কোয়ারে ত্রিবর্ণ রঞ্জিত  এক পতাকা উত্তোলন করা হয়। এই পতাকা উত্তোলন করেন স্বাধীনতা সংগ্রামী শচীন্দ্রপ্রসাদ বসু। সেইসময় পতাকাটি “কলকাতা পতাকা” নামে পরিচিত হয়। এই পতাকার তিনটি বর্ন ছিল উপর থেকে নীচের দিকে যথাক্রমে কমলা, হলুদ এবং সবুজ। এছাড়াও কমলা রঙের উপর আটটি অর্ধ প্রস্ফুটিত পদ্মের ছবি এবং সবুজ রঙের মধ্যে সূর্য এবং আধখানা চাঁদের ছবি ছিল। এছাড়াও পতাকার মাঝখানে বন্দে মাতরম কথাটি ছিল দেবনাগরী হরফে লেখা ছিল।

এর পরবর্তী সময়ে  বিদেশে অর্থাৎ জার্মানিতে অন্য একটি ত্রিবর্ণ রঞ্জিত পতাকা উত্তোলন করেন বিপ্লবী ভিখাজি কামা। এই পতাকার রং গুলি ছিল উপর থেকে নীচের দিকে সবুজ, গেরুয়া এবং লাল রং। এই পতাকার নকশা অঙ্কন করেছিলেন ভিখাজি কামা, বীর সাভরকার এবং শ্যামজি কৃষ্ণ বর্মা। এটিকে “বার্লিন কমিটি পতাকা”নামে ডাকা হয়েছিল কারণ বার্লিন কমিটিতে ভারতীয় সশস্ত্র বিপ্লবীরা এই পতাকা  গ্রহণ করেছিলেন।এখানে সবুজ রঙটি ছিল  ইসলাম ধর্মের প্রতীক, গেরুয়া রংটি ছিল হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রতীক। এছাড়াও পতাকার গায়ে তৎকালীন ইংরেজ অধীনস্থ ভারতের আটটি প্রদেশকে সূচিত করার জন্য আটটি পদ্ম অঙ্কিত ছিল সবুজ রঙের উপর।এছাড়াও নীচের লাল রঙের বামদিকে অর্ধ চন্দ্রের ছবি এবং ডানদিকে উদীয়মান সূর্যের ছবিও আঁকা ছিল।

এরপর ভারতে চরমপন্থী নেতা বাল গঙ্গাধর তিলক এবং জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা আনি বেসন্ত  যখন হোমরুল আন্দোলন শুরু করেন তখন তারা একটি নতুন পতাকা উত্তোলন করেন। এই পতাকায় পাঁচটি লাল ও চারটি সবুজ অনুভূমিক ডোরা ছিল।এই পতাকা সাধারণের দৃষ্টি খুব বেশি আকর্ষণ করতে পারে নি।

যদিও ১৯১৬ সালে অন্ধ্রপ্রদেশের  বাসিন্দা বর্তমানের জাতীয় পাতাকার নকশাকার পিঙ্গলি ভেঙ্কাইয়া দেশের জন্য একটি সাধারণ পতাকা তৈরি করার কাজে হাত দেন। মহাত্মা গান্ধী তাকে এই পতাকায় চরকার ছবি দিতে উপদেশ দিলে তিনি তা গ্রহণ করেন। এই পতাকায় লাল ও সবুজ রঙের মধ্যে চরকার ছবি এঁকে দেন। যদিও পরবর্তীতে মহাত্মা গান্ধী এই পতাকাকে  ভারতের পূর্ন প্রতিফলিত পতাকা হিসাবে গ্রহণ করেন নি।

আরও পড়ুন :- ১৫ ই আগস্ট ভারত ছাড়া আর যে যে দেশের স্বাধীনতা দিবস

পরে ১৯৩১ সালে জাতীয় কংগ্রেসের করাচি অধিবেশনে পতাকা সংক্রান্ত সর্বশেষ প্রস্তাবটি পাস করা হয়। এই অধিবেশনে একটি ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা সবার সম্মতিতে গ্রহণ হয়। এই পতাকার নকশা বানান পিঙ্গলি ভেঙ্কাইয়া। তিনি এই পতাকায় উপরের থেকে নীচের দিকে  গেরুয়া, সাদা ও সবুজ রঙের তিনটি অনুভূমিক ডোরা দেন।এছাড়াও  মধ্যস্থলে দেন একটি চরকা। গেরুয়া রঙকে নেওয়া হয়েছিল  ত্যাগ বোঝানোর জন্য; সাদাকে  সত্য  ও শান্তি  বোঝাতে এবং সবুজকে বিশ্বাস ও প্রগতির প্রতীক  বোঝাতে নেওয়া হয়েছিল। তাছাড়া চরকা ভারতের অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন ও দেশবাসীর শ্রমশীলতার প্রতীক হিসেবে গৃহীত হয়।

আরও পড়ুন :- জাতীয় পতাকা ব্যবহারের বিধিমালা ও আইনকানুন

বাংলার বীর বিপ্লবী নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু যখন সিঙ্গাপুরে গিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন এবং তার সর্বাধিনায়ক হন তখন তিনি একটি জাতীয় পতাকা গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ওই পতাকায় চরকার পরিবর্তে একটি বাঘের ছবি যোগ করেন।এটি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অহিংস আন্দোলনের প্রতীক হিসাবে নেওয়া হয়েছিল।এইভাবেই  নানা বিবর্তনের মাধ্যমে বর্তমানের জাতীয় পতাকা ভারতের স্থায়ী জাতীয় পতাকার মর্যাদা লাভ করে।

বি:দ্রঃ উপরের দেওয়া তথ্য ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত, যদি কোন অসংগতি থাকে তা অবশ্যই উপযুক্ত প্রমান সহ জানালে পরিবর্তন করা হবে।