মাস্টারহীন মাস্টার ব্লাস্টার, বছরের শুরুতেই দুঃসংবাদ ‘অনাথ’ হয়ে পড়লেন সচিন

180

সচিন তেন্ডুলকরের কোচ রমাকান্ত আচরেকার প্রয়াত। বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। বুধবার মুম্বইয়ে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৯৩২ সালে আচরেকর জন্ম। সচিনকে নিজের হাতে তৈরি করেছিলেন দ্রোণাচার্য কোচ। দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন তিনি। হারিয়েছিলেন বাক্শক্তি। নিয়মিত কোচের খোঁজ খবর নিতেন সচিন। আচরেকারকে নিয়ে তথ্যচিত্র তৈরির কাজে হাত দেন সচিন। রমাকান্ত আচরেকারের মৃত্যুর খবরে ক্রীড়া মহলে শোকের ছায়া ছড়িয়েছে।

গুরুর প্রয়াণে প্রিয় ছাত্র সচিন তেন্ডুলকরও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন। টুইটে যে বক্তব্য সচিন তুলে ধরেছেন, তা হল, “স্বর্গে ক্রিকেট আজ সমৃদ্ধ হল আচরেকর স্যারকে পেয়ে। তাঁর অনেক ছাত্রের মতোই আমিও ওঁর কাছে ক্রিকেটের এবিসিডি শিখেছি। আমার জীবনে ওঁর অবদান কোনও শব্দ দিয়ে বোধানো যাবে না। তিনি এই ভিতটা তৈরি করে দিয়েছিলেন, আজ আমি যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছি।”

শচীন তেণ্ডুলকরের সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল মানুষটির নাম। নিজের প্রথম কোচের নানা কাহিনি বহুবার ভক্তদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন মাস্টার ব্লাস্টার। সেরা শিষ্যকে একা করে পরলোকে পাড়ি দিলেন রমাকান্ত। ক্রিকেটার হিসেবে সেভাবে খ্যাতি না পেলেও কোচ হিসেবে তাঁর নাম ভারতীয় ক্রিকেটে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। মুম্বইয়ের দাদারের শিবাজি পার্কে বহু নক্ষত্র খুঁজে বের করেছেন তাঁর প্রবল দুরদর্শিতা এবং বিচক্ষণতা দিয়ে।

সচিন বারেবারেই বলতেন ‘গুরু’র জন্যই তাঁর ‘এতদূর’ আসা। ক্রিকেটের যাবতীয় অর্জন তাঁর সৌজন্যেই। সমস্ত কৃতিত্বই তিনি দিতেন কোচ রমাকান্ত আচরেকরকে। কার্যত অনাথ হয়ে পড়লেন সচিন।
মুম্বইতে থাকলে প্রায়ই সচিন প্রিয় কোচের বাড়ি যেতেন। গুরুর আশীর্বাদ নিতেন। কিছুদিন আগেই ক্রিকেটের ক্যাম্প চালু করার আগে শৈশবের বন্ধু বিনোদ কাম্বলিকে নিয়ে আচরেকরের বাসভবনে গিয়েছিলেন। আর শিক্ষক দিবসে সচিন তো মুম্বইতেই থাকতেন আচরেকরের সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য।

যখনই সময় পেয়েছেন ছুটে গিয়েছেন স্যারের কাছে। একবার পা ছুঁয়ে প্রনাম করে কিছুক্ষণ আড্ডা। তাতে অনেক সময় যোগ দিয়েছেন বিনোদ কাম্বলি। একই সঙ্গেই ভারতীয় ক্রিকেটে শুরু করেছিলেন দুই ছাত্র। একজনের অবস্থান‌ আজও শীর্ষে। আর একজন নিজের দোষে হারিয়ে গিয়েছেন অনেক আগেই। আজ এই দুই এবং আরও অনেকের সেই গুরু চলে গেলেন এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে।
সচিন ছিলেন সব থেকে প্রিয় ছাত্র। সেই ছাত্রও সাফল্যে শীর্ষে পৌঁছে কখনও ভুলে যাননি গুরুকে। আজকের দিনে তাই সেই মহান কোচকে শ্রদ্ধা জানাতে ভুলল না ক্রিকেট জগত।

মুম্বইয়ের ক্রিকেট মহলে গত কয়েক দশকে কয়েক হাজার ছাত্র তৈরি করেছিলেন আচরেকর। এ দিন গুরুর প্রয়াণের খবর পেয়েই শেষ শ্রদ্ধা জানাতে তাঁরা দলে দলে ভিড় জমান প্রয়াত এই কোচের বাসভবনে। আশির দশকে দাদারের শিবাজি পার্ক জিমখানায় গেলেই দেখা যেত হাফ হাতা সুতির শার্ট গায়ে মন দিয়ে ছাত্রদের ক্রিকেট শেখাচ্ছেন রমাকান্ত আচরেকর। তিরাশি সালে কপিলদেবের দলের বিশ্বকাপ ক্রিকেট জয়ের পরেই মুম্বইয়ে এ রকম অসংখ্য ক্রিকেট কোচিং শিবির তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আচরেকরের কোচিং ছিল সেই সব ক্রিকেট স্কুলের থেকে আলাদা। গুরু হিসেবে তিনি ছিলেন প্রকৃতই অন্য ঘরানার। দেশ তাঁকে সম্মান জানিয়েছিল পদ্মশ্রী দিয়ে।

আশির দশকে মুম্বই ক্রিকেট মহলের অনেকেই দেখেছেন স্কুটারের পিছনে সচিনকে বসিয়ে মুম্বইয়ের বিভিন্ন ক্রিকেট মাঠে ম্যাচ খেলতে নিয়ে যাচ্ছেন আচরেকর।

যা পরবর্তী জীবনে ভোলেননি সচিন। ২০১৩ সালে নিজের শেষ টেস্ট ম্যাচে বিদায়ী ভাষণে আচরেকরের অবদান স্মরণ করেছিলেন সচিন। জীবনের সেই ২০০তম টেস্টে সে দিন সচিন বলেছিলেন, ‘‘১১ বছর বয়স থেকে উনি আমার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন। স্যর কোনও দিন বলতেন না, ভাল খেলেছিস। কারণ উনি ভাবতেন এতে আমি আত্মতুষ্ট হয়ে পড়তে পারি। ভাল খেললে তাঁর হাসিখুশি মেজাজটাই বলে দিত আজ ঠিক খেলেছি। সঙ্গে কখনও কখনও মিলত ভেলপুরি, ফুচকাও। আজকের দিনের পরে আর খেলব না। নিশ্চয়ই উনি আমাকে আশীর্বাদ করছেন…।’’