করোনার ছাড়াও এই ৪টি মহামারীতে প্রাণ হারিয়েছেন ভারতের লক্ষ লক্ষ মানুষ

সংক্রামক রোগ অধিক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়লে তা মহামারীর রূপ নেয়। বর্তমানে করোনাভাইরাস বা covid-১৯ কে বিশ্বব্যাপী মহামারি হিসেবে ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা “WHO”। বিগত ছ’মাস ধরে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছে গোটা বিশ্ব। বিজ্ঞানী, গবেষক, চিকিৎসক থেকে অসংখ্য সাধারণ মানুষ সকলেই এই রোগের টিকার অপেক্ষায় রয়েছে। ইতিমধ্যেই এই ভাইরাসের দাপটে বিশ্বব্যাপী প্রায় সাড়ে চার লক্ষের ও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। ভারতেও এ পর্যন্ত ১২ হাজার ২৩৭ জনের মৃত্যু ঘটেছে এই ভাইরাসে।

এমন সংক্রামক রোগের ইতিহাস বহু পুরনো। প্রাচীন যুগ থেকেই এই ধরনের সংক্রামক রোগের অস্তিত্ব দেখা যায়। মানুষ যখন কৃষিভিত্তিক ছিল, সেই সময় থেকেই বহু সংক্রামক রোগ মহামারিতে পরিণত হয়েছে। ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, কুষ্ঠ, ইনফ্লুয়েঞ্জা, গুটিবসন্ত প্রভৃতি বিভিন্ন রোগ নানা সময়ে মহামারির আকার নিয়েছে। মানবসভ্যতা যত উন্ননের দিকে গেছে, মহামারির প্রকোপ ততই বেড়েছে।তবে এই প্রথম নয়, আমাদের ভারতে এর আগেও করোনার মতো বহু মহামারী হানা দিয়েছে। তখনও বহু মানুষ তাদের প্রাণ হারিয়েছিলেন। আসুন জেনে নিন এমন কিছু ভয়ংকর মহামারি যা বিগত কয়েক শতকে ভারতে দেখা গিয়েছিল…

১) কলেরা :-  ১৮১৭ সাল থেকে ১৮৮১ সালের মধ্যে মোট পাঁচ বার কলেরার সংক্রমণ ঘটে ভারতে। কলেরা রোগের প্রথম মহামারী শুরু হয় রাশিয়াতে। সেখানে এই রোগ প্রায় ১০ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়েছিল। দূষিত জলের মাধ্যমে এই রোগটি পরে ব্রিটিশ সেনাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। যার ফলে ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোতেও এই রোগ মহামারীর আকার ধারণ করে। যা পরে ভারতে প্রবেশ করে এবং তাতে ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে।

স্পেন, আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, চীন, জাপান, ইতালি, জার্মানি ও আমেরিকায়ও এই রোগ মহামারীর আকার ধারণ করে। এসব অঞ্চলে প্রায় দেড় লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। সব মিলিয়ে মোট ২২–২৩ লাখ লোক মারা যায়। তবে এখানেই শেষ নয় কলেরার আবির্ভাব ঘটেছে এর পরেও বহুবার। এখনও ভারতের বহু গ্রামে কলেরা দেখা যায়।

২) বম্বে প্লেগ :- উনিশ শতকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে একটি হল তৃতীয় প্লেগ অতিমারি বা যা “বম্বে প্লেগ” নামে পরিচিত। এই অতিমারিরও উৎপত্তি স্থান চিন প্রদেশ। অনেকের মতে, সেখান থেকেই জাহাজের সংক্রমিত ইঁদুরের মাধ্যমে বম্বে বন্দরে এসে পৌঁছায়। এই প্লেগ ভারতে ঢুকেছিল ১৮৯৬ সালে।

তখন থেকে ১৯২১ সালের মধ্যে কেবল ভারতেই প্রাণ হারিয়েছিল হাজার হাজার মানুষ। তৎকালীন বম্বে শহরে সংক্রমণের প্রথম বছরে মৃত্যুহার ছিল সপ্তাহে প্রায় ১,৯০০। পরে এই মহামারী কলকাতা, করাচি ও অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে। এই মহামারী তে মৃত্যু হয়েছিল বিশ্বব্যাপী মোট ত্রিশ লক্ষ মানুষের।

৩) স্প্যানিস ফ্লু (ইনফ্লুয়েজ্ঞা) :- ১৯১৮ সাল থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত স্প্যানিস ফ্লু বা ইনফ্লুয়েজ্ঞায় প্রাণ হারান বহু মানুষ। ধরা হয়, এই রোগটি ও চিন দেশ থেকে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯১৮ সালের শুরুর দিকে এই ফ্লু উত্তর আমেরিকায় চিনা শ্রমিকদের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরে তা ইউরোপে ছড়ায়।

স্পেনের মাদ্রিদে প্রথম এই রোগটি মহামারি আকার ধারণ করায় এর নাম ‘স্প্যানিশ ফ্লু’। পরে তা ইউরোপে থেকে ভারতে প্রবেশ করে। এই মহামারিতে বিশ্বব্যাপী প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের মারা যান। স্পেনের মোট ৮০ লাখ মানুষ এই ফ্লুতে আক্রান্ত হয়। গোটা বিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫০ কোটি।

৪) স্মল পক্স :- স্মল পক্স বা গুটি বসন্ত রোগের ইতিহাস বহু পুরনো। ধারণা করা হয়, রোগটির প্রথম প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর মিশরীয় মমিগুলিতে। পরে তা মহামারী রূপ নেয় অষ্টাদশ শতাব্দীর ইউরোপে। পৃথিবীতে শেষবার স্মল পক্স বা গুটি বসন্ত রোগের মহামারি হয়েছিল ১৯৭৪ সালে ভারতে।

সেই সময় হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ভারতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও ওড়িশা। এই রোগের ভারতে মৃত্যুহার ছিল ২০ হাজারেরও বেশি। উত্তর প্রদেশ এবং বিহারে এক লাখ দশ হাজার মানুষ গুটি বসন্তে আক্রান্ত হয়েছিল