বাংলার রাজনীতিতে শুভেন্দু অধিকারী কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

আগামী বছরেই বাংলার বিধানসভা ভোট।ইতিমধ্যেই উত্তপ্ত হতে শুরু করেছে রাজ্য রাজনীতি। এমন পরিস্থিতিতে বাংলার রাজনীতির সবথেকে চর্চিত মুখ হয়ে উঠেছে শুভেন্দু অধিকারী (Shubhendu Adhikari)। ২০১১ সালে যে নন্দীগ্রাম আন্দোলনের পরে ৩৪ বছরের বাম রাজত্বের অবসান হয়ে বাংলায় পরিবর্তনের ঝড় আসে,সেই আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী (Shubhendu Adhikari)।

তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress) শুরুর সময় থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) অন্যতম সৈনিক হিসেবে দলের পাশে দাড়িয়েছেন তিনি। সেই ১৯৯৮ সাল থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) পাশে আছেন তিনি।

২০০৭ সালে তৃণমূলের অন্যতম মুখ হওয়ার দাবিদার ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী (Shubhendu Adhikari)। কিন্তু এখন তাকে নিয়েই রাজনীতি তোলপাড়। বিজেপিতে (BJP) যোগ দিতে চলেছেন কি শুভেন্দু অধিকারী (Shubhendu Adhikari)?উঠছে প্রশ্ন।

কীভাবে বিতর্কের সূত্রপাত হল?

২০২০-র অগস্টে তৃণমূলের রাজ্য সরকারি কর্মী সংগঠনের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় শুভেন্দুকে। দলীয় পর্যবেক্ষকের পদটাইঅ তুলে দেওয়া হয়। ঘটনাচক্রে, শুভেন্দু ছিলেন একাধিক জেলার পর্যবেক্ষক। ২০২০-র সেপ্টেম্বরে তমলুকে প্রয়াত প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের স্মরণসভায় দল এবং দলনেত্রীর নাম মুখে আনেননি শুভেন্দু। সেই শুরু নতুন জল্পনার।

এর পর অনুগামীদের নিয়ে জেলায় জেলায় পরপর দলীয় ব্যানারহীন কর্মসূচি করে চলেছেন শুভেন্দু। বিভিন্ন ‘তাৎপর্যপূর্ণ এবং ইঙ্গিতবাহী’ মন্তব্য করছেন। যা থেকে রাজ্য রাজনীতির কারবারিরা মনে করছেন, দল এবং রাজনীতিতে স্পষ্ট বার্তা পাঠাতে চাইছেন তিনি। পাশাপাশিই, তাঁর অনুগামীরাও বার্তাবাহী পোস্টার, ব্যানার দিচ্ছেন জেলার বিভিন্ন এলাকায়।

শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক জীবন

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) সাথে যুক্ত হওয়ার আগে কংগ্রেসের পাশে ছিলেন অধিকারী পরিবারের সদস্যরা। তিনবার সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন শুভেন্দু অধিকারীর (Shubhendu Adhikari) বাবা শিশির অধিকারীর। তিনি নিজেও ইউপিএ ১ ও ইউপিএ ২ আমলে সাংসদ দ্বারা নির্বাচিত হন। তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress) সাথে যুক্ত হওয়ার পর ২০০৯ সালে তমলুকের সিপিএম নেতা লক্ষ্মণ শেঠকে হারিয়ে রীতিমত তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। ২০১৪ সালেও তিনি বিজয়ী হন।

তবে এই সময় সারদা চিটফান্ডে সিবিআই তলব করে তাকে। ফলস্বরূপ তার ভাবমূর্তি বেশ ক্ষুন্ন হয়। তারপরে অবশ্য ২০১৬ সালে নন্দীগ্রাম কেন্দ্র থেকে বিধায়ক হিসেবে নির্বাচিত হন তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress) অন্যতম খুঁটি শুভেন্দু অধিকারী (Shubhendu Adhikari)। এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় তিনি দায়িত্ব নেন পরিবহন দফতরের।

বাংলার রাজনীতিতে শুভেন্দু অধিকারী কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলার গ্রামীণ রাজনীতিতে শুভেন্দু অধিকারীর (Shubhendu Adhikari) মতন এরকম এত পরিচিত মুখ কমই আছে। মেদিনীপুর অঞ্চলে তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress) ঘাঁটির অন্যতম খুঁটি তাকেই মনে করা হয়। সমাজের সব স্তরের মানুষের সাথে তার জনসংযোগ ভোটব্যাঙ্ক এ গুরুত্বপূর্ন অবদান রাখে বলেই মনে করেন রাজনীতিবিদরা। পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, মুর্শিদাবাদ, মালদা জেলাতেও শুভেন্দুর দাপট আছে।  পূর্ব মেদিনীপুরে ১৬টি বিধানসভা কেন্দ্রেই গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেন শুভেন্দু অধিকারী (Shubhendu Adhikari)।

অতীতে মুর্শিদাবাদ, মালদা জেলা কংগ্রেসের দুর্গ ছিল,কিন্তু সেখানেও তৃণমূল কংগ্রেসের পতাকা ওড়ার পেছনে অন্যতম কারণ তিনিই। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে যেখানে রাজ্যে একাধিক আসন পেয়ে তৃণমূল কংগ্রেসকে (Trinamool Congress) চেপে ফেলছিল বিজেপি (BJP), সেই সময় ৩ বিধানসভা উপনির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) দলের সাফল্য সম্ভব হয় তার দাপটের জেরেই।

শুভেন্দুর সঙ্গে তৃণমূলের বিবাদের কারণ

অনেকের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থানের কারণেই দলের সাথে দূরত্ব শুরু হয়েছে শুভেন্দু অধিকারীর (Shubhendu Adhikari)।বিগত কিছু বছরে দলের নানারকম দায়িত্ব অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর দিয়েছেন দলনেত্রী। সেই কারণেই অভিমানী হতে পারেন শুভেন্দু, এমনই মনে করছেন তৃণমূলের অনেক নেতারাও। সম্ভবত সেই কারণেই দলীয় বৈঠক থেকে মন্ত্রিসভার বৈঠক, অনেক জায়গাতেই দেখা মিলছেনা শুভেন্দু অধিকারীর (Shubhendu Adhikari)।

শুধু শুভেন্দু নন, এই ভাঙনের ইশারা মিলছে তৃণমূলের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ন নেতাদের কাছ থেকেও। সম্প্রতি নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর (Shubhendu Adhikari) কথার পাল্টা হিসেবে নন্দীগ্রামে গিয়েই বক্তব্য পেশ করেছেন ফিরহাদ হাকিম, দোলা সেনরা।তার একাধিক মন্তব্যের জেরে বঙ্গ রাজনীতিতে জল্পনা তুঙ্গে উঠছে।

শুভেন্দুকে দলে নিয়ে বিজেপির লাভ?

এই পরিস্থিতিতে শুভেন্দু অধিকারী (Shubhendu Adhikari) বিজেপিতে যোগ দিলে একদিকে যেমন পূর্ব মেদিনীপুরের মতো একাধিক জেলায় বিকল্প খোঁজাও কঠিন হবে শাসকদলের জন্য়, অন্যদিকে ভোট ব্যাঙ্কে ভোটের সংখ্যা বাড়বে বিজেপির। এর অন্যতম কারণ সেই অঞ্চলে অধিকারী পরিবারের দাপট। শুভেন্দুর বাবা শিশির অধিকারী ৩ বারের সাংসদ এবং তার অন্য দুই পুত্র দিব্যেন্দু এবং সৌমেন্দু তমলুকের সাংসদ এবং কাঁথি পুরসভার চেয়ারম্যান। বিভিন্ন কমিটি ও কর্মী ইউনিয়ের মাথাও এই বিখ্যাত অধিকারী পরিবার।

এইভাবে চলতে থাকলে তৃণমূলের জন্য একুশের লড়াই অনেক কঠিন হতে চলেছে। শুভেন্দু সঙ্গে তৃণমূলের সমস্যার সমাধান না হলে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে মমতা বাহিনীকে। রবীন্দ্র সংগীত তৃণমূলের সমস্যা যত বাড়বে আখেরে ততই লাভ হবে বিজেপির। একদিকে যেমন পূর্ব মেদিনীপুরের পদ্মফুল ফুটবে অন্যদিকে মালদা মুর্শিদাবাদের শুভেন্দু হীন তৃণমূল মুখ থুবরে পড়বে। ফলে সেখানে অ্যাডভান্টেজ পাবে বিজেপি।