বাবা মদ্যপ, মা নারকেল বেচে, ছেলে সফল IAS পরীক্ষায়

সফল হওয়ার জন্য কি দরকার? টাকা পয়সা ,উচ্চবিত্ত পরিবার, নাকি পরিবারের উচ্চ শিক্ষা। না এর কোনোটাও থাকে না অনেক সাধারণ ঘরে জন্মানো মেধাবীদের কাছে, কিন্তু তারাই জীবনে করে দেখায় অসম্ভবকে সম্ভব।তারাই তাদের জেদ আর অধ্যবসায় দিয়ে এমন কিছু উদাহরণ আমাদের কাছে তুলে ধরে, যা বর্তমান তথা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত হয়ে যায়। এইরকমই এক অতি সাধারণ থেকে  অনন্য সাধারণ হওয়ার নায়ক শিবগুরু প্রভাকারণ।

UPSC -২০১৭ এর পরীক্ষায় যে  ৯৯০ জন সারা ভারত থেকে সফলদের তালিকা প্রকাশ পেয়েছে তাদের মধ্যে একজন হল শিবগুরু প্রভাকারণ। তার রাঙ্ক ১০১। তামিলনাড়ু থেকে যে তিনজন এই অন্যতম পরীক্ষায় সফল হয়েছে তাদের মধ্যে শিবগুরু প্রভাকারণ একজন। কিন্তু বাকিদের মতো তার জীবন শুধু পড়াশোনা নিয়ে কাটে নি। এই যুদ্ধে জয়লাভের জন্য যে পরিমান জীবনসংগ্রাম করতে হয়েছে, তা আজ সবার কাছেই অবিশ্বাস্য। কিন্তু অনেক সময় জীবনের কাহিনী গল্পকেও হার মানায়।আর আজকের এই কাহিনীর নায়ক শিবগুরু প্রভাকারণ।

শিবগুরু প্রভাকারণ বললেন, “আমার বলতে কোনো লজ্জা নেই যে আমার বাবা একজন মদ্যপ ছিলেন। তাই আমার বাড়িতে রোজই অশান্তি লেগে থাকতো বাবাকে নিয়ে। আর তাই আমার মা ও আমার দিদিকে নারকেল বিক্রি করতে হয়েছে। আজ তাদের বিশ্বাস রাখতে পেরেছি, এই ভেবেই বারবার আমার চোখে জল চলে আসছে।

পরিবারের জন্য আমি কাঠের মিলে দুবছর অপারেটর হিসাবে কাজও করেছি। চার বছর কাজ করার পর যখন আমি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য প্রয়োজনীয় টাকা জোগাড় করতে পেরেছিলাম। ২০০৮ সালে ভর্তি হয়েছিলাম সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এ Thanthai Periyar Government Institute of Technology যা  Vellore এ।

কিন্তু এখানেও আমাকে নানান সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। যেহেতু আমার পড়াশোনার মাধ্যম ছিল তামিল তাই আমার ইংরেজিতে বলতে ও পড়তে সমস্যা ছিল অনেক। তবুও আমি হার মনিনি। কারন আমার মা আমাকে হার মানতে শেখায় নি। ইঞ্জিনিয়ারিং করার সময়ই আমি ভেবেছিলাম চেন্নাই গিয়ে ওখানে আই আই টি-মাদ্রাজ প্রবেশিকা পরীক্ষায় সফল হবো, তাই চেন্নাই চলে আসি।

এখানে আমার এক বন্ধু আমাকে  একজন আমার মতো গরীব ছাত্রদের প্রশিক্ষণ দেয়, সেইরকম একজন প্রশিক্ষকের সন্ধান দিয়েছিল St Thomas Mount তে। চেন্নাই এ আমার স্থায়ী থাকার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাই  প্রতি সপ্তাহের শেষের দিকে আমাকে  প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আসতে হতো।আর প্রশিক্ষণ শেষে যখন রাত হয়ে যেত তখন আমাকে আশ্রয় নিতে হতো St Thomas Mount railway station এর প্লাটফর্মে।

আরো পড়ুন : রিক্সাচালক থেকে বিশিষ্ট সাহিত্যিক হওয়ার গল্প, যা আপনাকে অনুপ্রানিত করবে

তাই শনি রবি কোচিং করে আসার পর সোমবার আবার আমি ভেলোর চলে আসতাম আমার ইঞ্জিনিয়ারিং ক্লাস করতে। এই সময় আমি  ছুটির সময় মোবাইল রিচার্জ দোকানে  কাজ করেছি হাতে কিছু টাকা আসার জন্য। তবে আমার এই কঠোর পরিশ্রম ব্যর্থ হয় নি। আমি আই আই টি- মাদ্রাজে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলাম এবং আমার  M.Tech  সফলভাবে করেছিলাম  ২০১৪ সালে ৯.০ GPA নিয়ে।

আমার মনে  IAS অফিসার হওয়ার স্বপ্ন জাগিয়েছিল তৎকালীন তামিলনাড়ু সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের এক সচিব মাননীয় শ্রী  জে.রাধাকৃষ্ণণ  মহাশয়। তিনি যখন ২০০৪ সালে  তাঞ্জাভুর জেলার কালেক্টর ছিলেন যখন কুমভাকনামের এক বিদ্যালয়ে আগুন লেগে যায়, আর তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসেছিলেন।সেই আমার প্রথম IAS অফিসার দেখা।আর পরবর্তীতে এই স্বপ্ন নিয়েই বাকি প্রস্তুতি শুরু করা।আমি এই পরীক্ষায় তিনবার অনুত্তীর্ণ হয়েও চার বারের বেলায় সফল ভাবে উত্তীর্ণ হয়েছি।”

আরো পড়ুন : ৪ বছর বয়সের ছেলের মা হয়েও, UPSC পরীক্ষায় মেয়েদের মধ্যে প্রথম

তামিলনাড়ুর তাঞ্জাভুর জেলার মেলাউত্তনকারু গ্রামের এই অতি সাধারণ ছেলের এই জীবন যুদ্ধে জয়ী হওয়ার কাহিনী যদি আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্য পূর্ন করতে সাহায্য করে , তাহলেই জানবেন আপনি আজ কিছু শিখতে পেরেছেন এই অসামান্য জীবনের কাহিনী থেকে।আসুন বাঁচিয়ে রাখি নিজেদের লক্ষ্যকে নানান হতাশার মধ্য দিয়ে। জেতার লড়াইটা যেন নিজের ভিতর থেকে কোনোদিন বন্ধ না হয়ে যায়।