নোট বন্দি: বিজেপি সরকার ব্যর্থ না সফল? জানুন কিছু পরিসংখ্যান

আজকের বিশেষ দিনটির কথা আশাকরি এই প্রজন্মের প্রাপ্ত বয়স্ক ভারতবাসীরা কোনদিনই ভুলতে পারবে না। কারন আজই ছিল সেই বিশেষ দিন যা আমাদের সকল ভারতবাসীকে এক মুহূর্তের মধ্যে জানিয়েছিল এই প্রজন্মের সবচেয়ে বড় চরম অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের কথা। আজকের এই বিশেষ দিনে ২০১৬ সালে রাত্রি ৮টার সময় ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী জাতির উদ্দেশ্যে এক বিশেষ ঘোষণা জানিয়েছিলেন, “ভারতে প্রচলিত ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোট বাজার থেকে তুলে নেওয়া হচ্ছে। মোদীর নোটবন্দির সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে তিনি এবং তার বিজেপি সরকার যে কারণগুলি জনগণের সামনে রেখে ছিলেন সেগুলি হল

১) এই নোট বন্দির ফলে বিভিন্ন ব্যক্তি যাদের কাছে কালো ধন বা নগদ পরিমানে প্রচুর  ক্যাশ টাকা জমা আছে তারা সে কালো ধন নিজের কাছে রাখতে পারবে না। আবার তারা তা ব্যাংকেও জমা করতে পারবে না। ফলে তাদের তা নষ্ট করে ফেলতে হবে। যার ফলে বাজার থেকে এবং দেশ থেকে কালো ধন এর পরিমাণ কমে যাবে। ২) নোট বন্দির ফলে সারা ভারত জুড়ে ভ্রষ্টাচার এর ঘটনা ঘটবে না বা কমে যাবে। ৩) নোট বন্দি হওয়ার ফলে ভারতজুড়ে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ বন্ধ হয়ে যাবে কারণ সন্ত্রাসবাদীদের কাছে থাকা পুরনো ভারতীয় নোট  নষ্ট হয়ে যাবে তার ফলে তারা এক প্রকার অর্থনৈতিক সাহায্য  না পেয়ে মেরুদণ্ডহীন হয়ে পড়বে। ৪) নোট বন্দির ফলে ভারতজুড়ে নকল নোটে যে রমরমা ছিল তা বন্ধ হয়ে যাবে । ৫) এছাড়াও ভারতের অভ্যন্তরীণ নকশালদের অর্থনৈতিক যোগান সাংঘাতিক হারে হ্রাস পাবে এবং তার পরে তারা এক প্রকার শেষ হয়ে যাবে। ৬) এছাড়াও গত বছর ২০১৭সালে জাতির উদ্দেশ্যে স্বাধীনতা দিবসের দিন লালকেল্লা থেকে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা করেছিলেন নোটবন্দি হওয়ার ফলে যে নোট বাজার থেকে ব্যাংকে ফিরে আসবে তাতে দেখা যাবে তিন লক্ষ কোটি টাকার মতো কালো ধন ব্যাংকে ফিরে আসবে না অর্থাৎ সরকার তিন লক্ষ কোটি টাকার মতো কালো ধন নষ্ট করতে সম্ভব হবে। ৭) বাজারে  নগদহীন লেনদেন বা ডিজিটাল লেনদেন বৃদ্ধি পাবে। ৮) আয়কর দাতাদের সংখ্যা এর ফলে বাড়বে। প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ করের পরিমাণ বাড়বে ।

নোট বন্দি: বিজেপি সরকার ব্যর্থ না সফল? জানুন কিছু পরিসংখ্যান

বর্তমানে কালো টাকার অস্তিত্ব?

গত দুই মাস আগে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক নোট বন্ধের সময় যে পরিমাণ টাকা বাজারে ছাড়া হয়েছিল এবং নোটবন্দির ফলে যে পরিমাণ টাকা জমা হয়েছে  তার এক রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। তাতে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক জানিয়েছে ৮ নভেম্বর ২০১৬সালে নোট বন্দির আগে ভারতীয় বাজারে যে পরিমাণ টাকা পুরানো ৫০০টাকা এবং ১০০০টাকার মূল্যে ছিল তার পরিমাণ ছিল ১৫.৪৪লক্ষ কোটি টাকা। আর নোট বন্দি হওয়ার পর ব্যাংক এর কাছে ফিরে এসেছে ১৫ .৩১৭লক্ষকোটি টাকা। অর্থাৎ পুরানো ৫০০টাকা এবং ১০০০ টাকার নোটের ফিরে এসেছে শতকরা৯৯.৩%।অর্থাৎ মাত্র ১০,৭২০কোটি টাকা ভারতীয় ব্যাংকিং সিস্টেমে ফিরে আসেনি। অর্থাৎ ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী যিনি দাবি করেছিলেনপ্রায় ৩থেকে ৪ লক্ষ কোটি টাকা ভারতীয় ব্যাংকিং সিস্টেমে ফিরে আসবে না তা ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক সম্পূর্ণ ভুল বলে প্রমাণিত করেছে।

নোট বন্দি: বিজেপি সরকার ব্যর্থ না সফল? জানুন কিছু পরিসংখ্যান

আর্থিক লাভ?

নোট বন্দির পর শুধু নতুন নোট ছাপতে গিয়ে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক এ খরচ করতে হয়েছে  ১২,৫০০কোটি টাকা।যার মধ্যে ২০১৬-১৭সালে নতুন ৫০০টাকা এবং ২,০০০টাকার নোট ছাপতে গিয়ে খরচ করেছে ৭,৯৬৫কোটি টাকা।এবং ২০১৭-১৮সালে নতুন নোট ছাপতে খরচ হয়েছে ৪,৯১২কোটি টাকা। তাহলে বর্তমান হিসেবে ১০,৭২০ কোটি টাকা লাভ করতে গিয়ে সরকারকে বা ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের খরচ করতে হয়েছে ১২,৫০০কোটি টাকা ।একজন সাধারন মানুষের কাছেও এটা লাভ না লোকসান তা বুঝতে অসুবিধা হয় না।এছাড়াও রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার ডিভিডেন্ড যার লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছিল সরকারের প্রতি ৭৪,৯০১কোটি টাকা তা অর্ধেক হয়ে দাঁড়িয়েছে ৩০,৬৫৯কোটি টাকায়।

নকল নোট এর লাগাম ?

ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক থেকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ২০১৫-১৬সালের তুলনায় ২০১৬-১৭সালে ২০.৪%বেশি নকল নোট ধরা পড়েছে। ২০১৬-১৭সালে প্রায় ৭লক্ষ ৬২হাজার নকল নোট ধরা পড়েছিল।সেই তুলনায় ২০১৭ -১৮তে পাওয়া নকল ৫০০টাকার জাল নোটের সংখ্যা ৯,৮৯২টি এবং নকল ২০০০টাকা পাওয়ার সংখ্যা ১৭,৯২৯টি।যা পূর্বের বছরের তুলনায় অনেকটাই কম। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যে দাবি করেছিলেন নতুন নোট জাল হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না তার সেই দাবিও ভুল তা রিজার্ভ ব্যাংকের এই রিপোর্টে প্রকাশিত হয়েছে এছাড়াও আশ্চর্যজনকভাবে নোট বন্দির আগের বছরের তুলনায়  ২০১৭-১৮বছর ১০০ টাকার নোটে নকল নোটে সংখ্যার বৃদ্ধি হয়েছে ৩৫%এবং ৫০টাকার নোটে নকল নোটের সংখ্যায় বৃদ্ধি হয়েছে ১৫৪%। যা জাল নোটের রমরমাকেই আমাদের সামনে তুলে ধরে।

নগদ নোটের ব্যবহারে হ্রাস?

রিজার্ভ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী নভেম্বর ২০১৬ সালে ভারতের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যে পরিমাণ নোট বাজারে ছাড়া অবস্থায় ছিল তার পরিমাণ ১৫.৪৪লক্ষ কোটি টাকা। বর্তমানে ২০১৮সালের মার্চ মাসের  হিসাব অনুযায়ী বাজারে এবং ব্যাংকে ছড়িয়ে থাকা নোটের পরিমাণ রিজার্ভ ব্যাংক থেকে জানানো হয়েছে  তা হল ১৮.০৩লক্ষ কোটি টাকা। অর্থাৎ নগর নোটের ব্যবহারে বিন্দুমাত্র হ্রাস তো আসেইনি বরং তা বৃদ্ধি পেয়েছে আশ্চর্যজনকভাবে ।যা গত বছরের তুলনায় ৩৭.৭%বৃদ্ধি পেয়েছে।অর্থাৎ ডিজিটাল লেনদেন বৃদ্ধি পাবে বলে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী এবং বিজেপি সরকারের তরফ থেকে যা ঘোষণা করা হয়েছিল তাও যে এক প্রকার সত্য নয় তা প্রকাশিত হয়েছে।

নতুন আয়কর দাতাদের সংখ্যায় বৃদ্ধি ও কর বৃদ্ধি?

এই প্রসঙ্গে বর্তমানে ভারতের অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি মাসে এক রিপোর্টে রেখেছেন দেখিয়েছেন ২০১৪ সালে আয়কর রিটার্ন দাখিল করা ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ৩.৮কোটি যা ২০১৭-১৮সালে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৬.৮৬কোটি । নোট বন্দি হওয়ার দুই বছরের মধ্যে আয়কর রিটার্ন দাখিল করা ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ১৯%-২৫%। এছাড়াও প্রত্যক্ষ কর বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে বৃদ্ধির পরিমাণ২১%। কিন্তু সরকারের কাছে কি কার কত আয় এর পরিমাণ তার জানার উপায় কি শুধুমাত্র নোট বন্দি? যেখানে একশোর বেশি লোক মারা গেছে শুধুমাত্র এই নোটবন্দির কারণে না খেতে পেয়ে, বিনা চিকিৎসায় বা নিজের কাছে থাকা টাকা ব্যবহার করতে না পেয়ে, টাকা জমা করতে এসে হৃদরোগে লাইনে দাঁড়িয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা, দিনের পর দিন। সেখানে এই সংখ্যা বাড়ানোর অন্য কোন পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারত না কী ?যেখানে প্রতিটি ব্যাংকের গ্রাহকদের তথ্য নেওয়ার অধিকার ভারত সরকারের আছে সেখানে এই নোটবন্দি কি সবচেয়ে সহজতম উপায় ছিল আয়কর রিটার্ন দাখিল করা ব্যক্তিদের সংখ্যা বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে?

ভারত সরকারের সংসদীয় আর্থিক বিষয়ক কমিটি নোটবন্দির প্রভাব বিষয়ে এক রিপোর্টে জানিয়েছে নোটবন্দির ফলে ভারতের  বছর প্রতি জি ডি পি ১%হারে কমে গিয়েছে ।যার পরিমান প্রায় ১.৫লক্ষ কোটি টাকা প্রতি বছরের হিসাবে ।যদিও ওই কমিটির বেশিরভাগ সদস্য বিজেপি দলের হওয়ায় তারা এই রিপোর্ট মানতে অস্বীকার করেছে।

টাকা নয়ছয়  করা কোম্পানির সংখ্যা?

ভারত সরকারের তরফ থেকে জানানো হচ্ছে নোটবন্দির ফলে ২লক্ষ ২৪হাজাররের মত বেনামি কোম্পানির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে যারা বিভিন্ন উপায়ে টাকা নয়ছয় করতো বা টাকা বিদেশে পাঠাতো। অর্থাৎ এই সব শেল কোম্পানী বর্তমানে তাদের কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। যার ফলে আর্থিক দিক দিয়ে লাভবান হবে সকল ভারতবাসী। কিন্তু নোট বন্দির ফলে প্রায়  যেখানে ১৫ কোটি মানুষ তাদের রোজকার হারিয়েছেন সারা ভারত জুড়ে। আর এই ১৫ কোটি মানুষই শুধুমাত্র অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করতো তা কিন্তু নয়। এদের মধ্যে অনেক মানুষই বিভিন্ন ছোট ছোট কুটির শিল্প বা ছোট কোম্পানিতে কাজ করতো যারা নোট বন্দির প্রাথমিক ঝাটকা সহ্য করতে পারেনি

ফলে তাদের আর্থিক অবস্থার লোকসান হবে বলে অনেকে হয়তো বন্ধ করেছে সেসব স্বল্পমূল্যের কোম্পানি যা আজকে ভারত সরকারের কাছে শেল কম্পানি নামে পরিচিত। তবে অনেক বেনামি কোম্পানি যে ছিল তাকে অস্বীকার করা যায় না ।আর নোট বন্দির ফলে এই বেনামি কোম্পানি বন্ধ হয়েছে তাতে  অবশ্যই উল্লেখ করা যেতে পারে সরকারের সাফল্য। কিন্তু এই বেনামী কোম্পানি বন্ধ করার জন্য নোটবন্দি কি সবচেয়ে সহজতম উপায় ছিল? অন্য কোন পদ্ধতি অবলম্বন করা যেত না ?যেখানে তিন থেকে চার মাসের মত সময় ধরে ভারতীয় অর্থব্যবস্থার উপর এক বুলডোজার চালিয়ে দেওয়া হল নোট বন্দির নাম করে, সেখানে উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে এ সমস্ত বেনামী কোম্পানি বা শেল কোম্পানি বন্ধ করা যেত সহজে তাই নয় কি?

আরও পড়ুন : প্রকাশ্যে এল নরেন্দ্র মোদীর সম্পত্তির পরিমাণ! কত কোটি টাকার মালিক মোদীজি?

সন্ত্রাসবাদীদের কার্যকলাপ হ্রাস

নোটবন্দির ১০মাস আগে জম্মু-কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদীদের কার্যকলাপের সংখ্যার পরিমান এবং নোটবন্দির ১০ মাস পরে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ সংখ্যার পরিমান তুলনা করলে পাওয়া যায় এক্ষেত্রে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ বৃদ্ধি পেয়েছে৩৮%হারে। যা থেকে সহজেই অনুমান করা যায় সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ বন্ধ করতে নোটবন্দি বিন্দু মাত্র প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। আর নকশাল আক্রমণের ঘটনা আমরা তো গত সপ্তাহতেই দেখেছি এছাড়া নোটবন্দির পরে নানা সময় ঘটেছে তাই নকশালদের আক্রমন।তাই নকশালদের মেরুদন্ড ভাঙতে নোটবন্দি যে ব্যর্থ তার বলার প্রয়োজন রাখে না।

তাই নোটবন্দি সুফল হয়েছে না ব্যর্থ? তা পাঠকের উপর ছেড়ে দিলাম।