‘ইয়াস’ না ‘আমফান’ কার ক্ষমতা সবথেকে বেশি, ইয়াস কতটা বিধ্বংসী

ভয়ঙ্কর শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় “ইয়াস” এর আক্রমণকে প্রতিহত করতে কার্যত ঢাল-তরোয়াল নিয়ে তৈরি হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ। মাঝে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা। তারপরই চলতি মরসুমের সবথেকে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় “ইয়াস” তার সর্বশক্তি দিয়ে আছড়ে পড়তে চলেছে বাংলার বুকে। ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবের আতঙ্কেই কার্যত প্রতিটি মুহূর্ত কাটাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা এবং বাংলাদেশ।

আলিপুর আবহাওয়া দপ্তরের তরফ থেকে নিশ্চিত ভাবে জানানো হয়েছে বুধবার সকালের দিকেই পশ্চিমবঙ্গের সাগর এবং উড়িষ্যার পারাদ্বীপের ঠিক মাঝখান দিয়ে স্থলভাগে আছড়ে পড়বে ঘূর্ণিঝড় “ইয়াস”। এই দুর্যোগের মোকাবিলায় তাই পশ্চিমবঙ্গের উপকূলবর্তী অঞ্চলসহ সারা রাজ্যে কড়া সতর্কবার্তা জারি করেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। একদিকে মহামারীর দরুন ভাইরাসের বিরুদ্ধে মরণপণ লড়াই চলছে মানুষের। তার উপর আবার “ইয়াস”র তান্ডবের পূর্বাভাস!

বর্তমানে জোড়া দুই ভয়ঙ্কর শক্তিশালী শত্রুর সম্মুখে পশ্চিমবঙ্গ। রাজ্যের প্রশাসনের নির্দেশে বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরও ঘূর্ণিঝড়ের মোকাবিলায় প্রস্তুত। মহামারী পরিস্থিতিতে ঘূর্ণিঝড়ের মোকাবিলা তাদের কাছে এক বড় চ্যালেঞ্জ। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপটি ক্রমে ঘূর্ণিঝড় “ইয়াস” এর রূপ ধরে বর্তমানে উত্তর এবং উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়ে চলেছে। প্রতিমুহূর্তে শক্তি বাড়াচ্ছে এই শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়।

 

ঘূর্ণিঝড়ের এই আগাম পূর্বাভাস রাজ্যবাসীর মনে কার্যত গতবছরের “আমফান” ঝড়ের স্মৃতি উস্কে দিচ্ছে। “আমফান” ছিল ভয়ঙ্কর শক্তিশালী সাইক্লোন। মুহূর্তের মধ্যেই যা রীতিমতো তছনছ করে দিয়েছিল উপকূলবর্তী অঞ্চলের মানুষের জীবনকে। বাড়িঘর হারিয়ে সর্বহারা মানুষের দলের হাহাকার এখনো দূর হয়নি। তারই মধ্যে ঘূর্ণিঝড় “ইয়াস” এর রূপ নিয়ে দ্বিতীয় বিপদ হাজির তাদের সামনে।

স্বভাবতই রাজ্যবাসীর মনে প্রশ্ন জাগছে ঘূর্ণিঝড় “ইয়াস” কি ঘূর্ণিঝড় “আমফান” এর থেকেও বেশি শক্তিশালী এবং মারাত্মক? গতবছর “আমফান”-এ যে ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলেন মানুষ, চলতি বছরে “ইয়াস”ও কি ঠিক একই ভাবে আঘাত হানবে পশ্চিমবঙ্গের বুকে? নাকি “আমফান” এর মতো রাজ্যবাসীর ততটা ক্ষতি “ইয়াস” করবে না? আবহাওয়া দপ্তরের তরফ থেকে পাওয়া গেল তার সঠিক জবাব।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, প্রবল শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় “আমফান” আদতে সুপার সাইক্লোন ছিল। সেই তুলনায় “ইয়াস” আসলে একটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়। তবে শক্তির নিরিখে “ইয়াস” “আমফান”এর তুলনায় কম কিছু নয়। ভারতীয় হাওয়া অফিসের DGM মৃত্যুঞ্জয় মহাপাত্র জানালেন, “ইয়াসের হাওয়ার তীব্রতা অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক। ক্ষয়ক্ষতির নিরিখে এটির সঙ্গে আমফানের তুলনা করা যেতে পারে”! অতএব স্বস্তি পাওয়ার কোনও কারণ নেই।

গত বছর প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে “আমফান” যখন স্থলভাগের আছড়ে পড়েছিল তখন তার গতিবেগ ছিল ঘন্টায় ২৬০ কিলোমিটার! এদিকে ঘূর্ণিঝড় “ইয়াস” প্রায় সাড়ে ৬০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে স্থলভাগে আছড়ে পড়তে চলেছে। বর্তমানে তার সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘন্টায় ১৬৫ কিলোমিটার। স্থলভাগে আছড়ে পড়ার পর তার গতিবেগ হতে পারে ঘন্টায় সর্বোচ্চ ১৮৫ কিলোমিটার।

“আমফান” ঘূর্ণিঝড়কে অতি শক্তিশালী ক্যাটেগরি ৫ সাইক্লোন ক্যাটাগরিতে ফেলেছিলেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা। ২০০৮ সালে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় “নার্গিস” যে ক্ষয়ক্ষতি করেছিল তার তুলনায় প্রায় বেশ কয়েক গুণ ক্ষতি করেছিল “আমফান”।

আরও পড়ুন : পশ্চিমবঙ্গের কোন কোন এলাকা ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্থ হবে, রইলো সম্পূর্ণ তালিকা  

আলিপুর আবহাওয়া দপ্তরের সর্বশেষ রিপোর্ট অনুসারে, ঘূর্ণিঝড় “ইয়াস” গত ৬ ঘণ্টা ধরে ঘণ্টায় ২ কিলোমিটার বেগে অগ্রসর হচ্ছে স্থলভাগের দিকে। সে যত সরকারের দিকে এগিয়ে আসবে, তার গতিবেগও তত বৃদ্ধি পাবে। একইসঙ্গে বাড়বে ঝোড়ো হাওয়ার গতিবেগ। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট এই ঘূর্ণিঝড় বর্তমানে ১৬ ডিগ্রি ৪ মিনিট উত্তর অক্ষাংশ ও ৮৯ ডিগ্রি ৬ মিনিট পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থান করছে।

আরও পড়ুন : ভারতের সাইক্লোন ম্যান, যিনি বশ করতে পারেন ঘূর্ণিঝড়কে, মিলে যায় প্রতিটি ভবিষ্যৎবাণী

আন্দামানের পোর্ট প্লেয়ার থেকে ৬২০ কিলোমিটার উত্তরে উত্তর-পশ্চিম, ওড়িশার পারাদ্বীপ থেকে ৫৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ দক্ষিণ-পূর্ব, ওড়িশার বালেশ্বর থেকে ৬৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ দক্ষিণ-পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের দিঘা থেকে ৬২০ কিলোমিটার দক্ষিণ দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছে “ইয়াস”। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুসারে সোমবার বিকেল থেকেই ঘূর্ণিঝড়ের দাপটে রাজ্যের উপকূলবর্তী এলাকায় ঘণ্টায় প্রায় ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাবে।