কোটি টাকা দিয়েও শুনতে হচ্ছে কটুক্তি, রেগে দানের তালিকা ফাঁস করলেন অমিতাভ

বিগত প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সারাদেশ এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। করোনা ভাইরাসের সংক্রমনের জেরে বিধ্বস্ত ভারত। সারা পৃথিবীর মধ্যে এখন ভারতের সংক্রমিত হার সবথেকে বেশি। ভারতের করোনা পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এমতাবস্থায় প্রশাসন সর্বতোভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনার। অপরপক্ষে করোনা বিধ্বস্ত মানুষদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসছেন বলিউডের সেলিব্রেটিরা।

করোনাকালে বলিউডের বহু সেলিব্রিটিই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। এদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য হলেন সোনু সুদ, যিনি করোনার প্রাক মুহূর্ত থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত লড়াইয়ের ময়দানে টিকে রয়েছেন। তবে অন্যান্যরাও কিন্তু কম কিছু যান না। এই সংকটময় মুহূর্তে প্রত্যেকেই প্রত্যেকের মতো যথাসাধ্য সাধারণ মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা চালাচ্ছেন। কেউ কেউ প্রচারের আলোয় আসছেন, কেউ আবার প্রচারের আড়ালে থেকেই নিঃশব্দে কাজ করে চলেছেন।

এমনই এক বলিউড সেলিব্রিটি হলেন অমিতাভ বচ্চন। বিগত এক বছরে তিনি দেশের সাধারণ মানুষের জন্য অনেক কিছুই করেছেন। তবে তা তিনি কখনো প্রকাশ্যে আনেননি। নিঃশব্দে যথাসাধ্য সাহায্য করেছেন মানুষের। কিন্তু প্রচারের আলোতে না আসা তার অন্যতম বড় ভুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ নেটিজেনদের একাংশের মনে হয়েছে করোনাকালে সকলেই যখন কমবেশি সংগ্রামের ময়দানে নেমেছেন, বিগ বি তখন “কিছু না করেই বড় বড় কথা বলছেন’!

নেটিজেনদের এমন মনোভাবে বেশ আঘাত পেয়েছেন অমিতাভ বচ্চন। বলিউডের “অ্যাংরি ইয়ং ম্যান” কটুক্তি শিকার হয়ে ফের রেগে গেলেন। এরপর তিনি করোনাকালে সাধারণ মানুষের জন্য নিজের কর্মসূচির তালিকা প্রকাশ করে নেটিজেনদের মুখ বন্ধ করতে উদ্যোগী হলেন। নেটিজেনদের তিনি জানিয়ে দিলেন, ‘শ্রী গুরু তেগ বাহাদুর কোভিড কেয়ার সেন্টার’-এ ২ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছেন তিনি।

অমিতাভের বিরুদ্ধে নেটিজেনদের অভিযোগ ছিল, উনি সারাক্ষণ শুধু নেট মাধ্যমে অন থাকা ছাড়া আর কিচ্ছু করছেন না! অমিতাভ এতদিন এমন কটুক্তি নিঃশব্দে হজম করছিলেন। তবে এবার তিনি বিগত এক বছরে তার কর্মকাণ্ডের সম্পূর্ণ খতিয়ান পেশ করলেন। তিনি জানালেন, গত বছর তিনি এবং তার পরিবার ১ মাস ধরে দেশের ৫ হাজার শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রায় ৪ লক্ষ শ্রমিকের ২ বেলার অন্ন সংস্থানের ভার নিয়েছিলেন।

এখানেই শেষ নয়, অমিতাভ তার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে টাকা নিয়ে প্রশাসন এবং চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের জন্য পিপিই কিটের বন্দোবস্ত করেছিলেন। শিখ জনসেবা সংগঠনকে অর্থ দানের পাশাপাশি দেশের বহু পরিযায়ী শ্রমিককে ঘরে ফেরানোর বন্দোবস্ত করেছিলেন তিনি। তাদের জন্য বিশেষ বাসের বন্দোবস্ত করেছিলেন অমিতাভ। গোটা একটি ট্রেন তাদের জন্য বুক করে দিয়েছিলেন তিনি যে ট্রেনে একসঙ্গে প্রায় ২৮০০ যাত্রী যাতায়াত করতে পারেন।

তবে ট্রেনটি আচমকা বন্ধ হয়ে যাওয়াতে সঙ্গে সঙ্গে তিনি চারটি বেসরকারি বিমান ভাড়া করে দেন পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য। যাতে চড়ে বিহার, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান এবং জম্মু ও কাশ্মীরের পরিযায়ী শ্রমিকরা নিজেদের ঘরে ফিরতে পেরেছিলেন। উল্লেখ্য, গতকাল রাজধানীর শিখ গুরুদ্বার ব্যবস্থাপক সমিতির সভাপতি মনজিন্দর সিং সিরসা জানিয়েছেন, অর্থের পাশাপাশি অমিতাভ করোনা রোগীদের জন্য অক্সিজেন সিলিন্ডারেরও ব্যবস্থা করে দেবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।

৩০০ শয্যা বিশিষ্ট এই সেন্টারে করোনা রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা করানো হবে, যেখানে ২ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছেন অমিতাভ। আরো একটি তথ্য জানতে পারলে অমিতাভের প্রতি শ্রদ্ধায় আপনার মাথা নত হয়ে আসবে। করোনা আবহে মৃত মা-বাবার  ২ অনাথ শিশু সন্তানকেও দত্তক নিয়েছেন এই প্রবীণ অভিনেতা। তবে তিনি কখনোই নিজেকে প্রচারের আলোয় আনতে চাননি।

পোল্যান্ড থেকে ৫০ টি অক্সিজেন কনসেনট্রেটর আনতে চলেছেন তিনি। সঙ্গে, ২০টি ভেন্টিলেটর কেনার ব্যবস্থাও করেছেন। তাঁর কেনা ২০টি ভেন্টিলেটরের মধ্যে ১০টি বর্তমানে রয়েছে বৃহন্মুম্বই মিনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (BMC) এবং মুম্বইয়ের বেশ কয়েকটি হাসপাতালে। আরও ১০টি কিছুদিনের মধ্যেই চলে আসবে বলে জানিয়েছেন বিগ বি।

অমিতাভ জানাচ্ছেন, “ছোট থেকে শিখেছি, দান করে তা সবার সামনে প্রচার করতে নেই। এতে যিনি দিচ্ছেন এবং যাঁকে দিচ্ছেন, উভয়েই ছোট হয়ে যান।’’ প্রবীণ অভিনেতার দাবি, সময় বদলেছে। এখন সামান্য কিছু করেই তা প্রচার করতে হয়। লোককে জানাতে হয়। না হলেই সবাই ভাবেন, কিছু না করে কেবল বড় বড় কথার চাষ চলছে।”

অভিনেতার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তার আক্ষেপ। তিনি জানাচ্ছেন, আজ একবছর পর নিজের কাজের খতিয়ান নেটদুনিয়ায় তুলে ধরতে গিয়ে তিনি প্রতি মুহূর্তে নিজেকে অপমানিত এবং লজ্জিত বোধ করছেন। তবে নেটিজেনদের উপযুক্ত জবাব দেওয়ার জন্যই আজ তাকে নিজের আদর্শের বাইরে গিয়ে নিজের কাজের বড়াই করতে হলো! এতে অবশ্য নেটিজেনদের কটূক্তির বহর কমবে। তবে তা করতে গিয়ে মনে মনে প্রতিমুহূর্তে রক্তাক্ত হচ্ছেন বলিউডের এই বর্ষীয়ান অভিনেতা।