বিশ্বের সেরা সুন্দরী মহিলার তালিকায় পশ্চিমবঙ্গের এই রাজকন্যা

ভারতীয় নারীদের সৌন্দর্য্যের খ্যাতি জগৎজোড়া। বিশেষত ভারতীয় রাজবংশের রাণী কিংবা রাজকুমারীদের সৌন্দর্য্য বরাবরই বিশ্বের দরবারে চর্চার বিষয়বস্তু। তা সে রাজপুত নারী পদ্মাবতীই হোন বা পাঞ্চাল রাজকুমারী দ্রৌপদী। ভারতের ইতিহাস প্রসিদ্ধ সেরা সুন্দরীদের রূপ নানা ভাবে বর্ণনা করেছেন কাব্য রচয়িতারা। বিভিন্ন কবিতা বা কাব্যগ্রন্থ, উপাখ্যানমূলক রচনা থেকে ভারতীয় সুন্দরীদের রূপের বর্ণনা পাওয়া যায়। এমনই এক অসাধারণ সুন্দরী নারী ছিলেন কোচবিহার রাজবংশের রাজকুমারী গায়েত্রী দেবী।

গায়েত্রী দেবীর জন্ম হয় ১৯১৯ সালের ২৩ শে মে। জন্মসূত্রে তিনি কোচবিহার রাজ বংশের রাজকুমারী হলেও গায়েত্রী দেবীর জন্ম হয়েছিল ভারত বর্ষ থেকে দূরে, সুদূর লন্ডনে। তার মা ছিলেন বরোদার রাজকুমারী, মহারাজা তৃতীয় সয়াজিরাও গায়েকওয়াড়ের একমাত্র কন্যা ইন্দিরা রাজে। অসামান্যা সুন্দরী রাজকুমারী গায়েত্রী দেবী তার এমন ভুবনমোহিনী রূপ পেয়েছিলেন মায়ের থেকেই। বাল্য অবস্থায় প্রথমে বোলপুরের শান্তিনিকেতনে থেকে পড়াশোনা করেছিলেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশেষ স্নেহধন্যা হয়ে উঠেছিলেন গায়েত্রী। ভারতবর্ষের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সহপাঠী ছিলেন তিনি। এরপর অবশ্য তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য সুইজারল্যান্ডে পাড়ি দেন গায়েত্রী দেবী।

গায়েত্রী দেবী তার সমকালীন সময়ের অন্যান্য মহিলাদের থেকে বেশ আলাদা ছিলেন। তা শুধুই তার সৌন্দর্যের নিরিখে নয়, তার পোশাক-আশাক, স্বভাব-চরিত্র, পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতি তার মনোযোগ, ইত্যাদি অনেক বিষয়ের ক্ষেত্রেই তার বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটেছে। সর্বোপরি রাজনীতিতেও তার প্রবল জ্ঞান ছিল। যে কারণে পরবর্তীকালে সক্রিয় রাজনীতিতেও অংশগ্রহণ করেন তিনি।

তৎকালীন সময়ে গায়েত্রী দেবীর রূপে মুগ্ধ ছিল সারা বিশ্ব জগত। তার রূপের খ্যাতি পৌঁছে গিয়েছিল জয়পুরের মহারাজা দ্বিতীয় সাওয়াই মান সিং বাহাদুরের কানেও। জয়পুরের মহারাজার অন্দরমহলে দুই রাণী থাকা সত্ত্বেও মহারাজ গায়েত্রী দেবীকে বিবাহের প্রস্তাব দেন। ১৯৪০ সালে ৯ মে মাত্র ২১ বছর বয়সেই গায়ত্রী দেবীর সঙ্গে জয়পুরের মহারাজের বিয়ে হয়ে যায়। কোচবিহারের রাজকুমারী গায়ত্রী দেবী হয়ে ওঠেন জয়পুরের রাজমাতা।

প্রসঙ্গত, তৎকালীন সময়ে গায়েত্রী দেবী রাজ ঘরানার অন্যান্য বধূদের মতো নিজেকে কখনোই চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখেননি। রাজবংশের অন্যান্য মহিলাদের মতো কখনোই ইন্ট্রোভার্ট ছিলেন না গায়েত্রী দেবী। ঊনবিংশ শতাব্দীতে রাজপরিবারের মহিলা সদস্য হয়েও তিনি নির্দ্বিধায় বাইরে রাজত্ব করে বেরিয়েছেন। ঘোড়ায় চড়েছেন, পোলো খেলেছেন, গাড়ি চালিয়েছেন, এমনকি শিকারও করেছেন।

তার সাজ-পোশাক, বেশ-ভূষাও ছিল তৎকালীন সময়ের অন্যান্য মহিলাদের তুলনায় অনেক স্বতন্ত্র। উজ্জ্বল বর্ণের পোশাক, পুরনো আমলের ভারী গয়না, দামি দামি পাথর বসানো অলংকার নয়, গায়েত্রী দেবী নিজেকে সযত্নে সাজিয়ে তুলতেন হাল্কা প্যাস্টেল শেডের শিফন শাড়ি এবং তার সঙ্গে গলায় শুধু একছড়া মুক্তোর মালা দিয়ে। বাইরে বেরোলে চোখ ঢাকা থাকতো সানগ্লাসে, ব্যাস।

সাজপোশাকের ক্ষেত্রে তিনি যে নতুন ট্রেন্ড চালু করেছিলেন, তার সমকালীন মহিলারা সেই ট্রেন্ড অনুসরণ করতে শুরু করেন। তার এই সৌন্দর্য্য, ফ্যাশন সম্পর্কে তার সচেতনতাই তাকে সারা বিশ্বের কাছে পরিচিত করে তুলেছিল। ১৯৬০ সালে ব্রিটেনের জনপ্রিয় ভোগ ম্যাগাজিনে বিশ্বের ১০ জন সেরা সুন্দরীর তালিকায় উঠে এসেছিল জয়পুরের রাজমাতা গায়েত্রী দেবীর নাম। সারা ভারতবর্ষের গর্ব হয়ে উঠেছিলেন গায়েত্রী দেবী।

পড়াশোনায় দারুণ ভালো ছিলেন তিনি। জয়পুরে অনেক স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য সুখ্যাতি কুড়িয়েছেন। ১৯৪৩ সালে মহারানি গায়েত্রী দেবী গার্লস পাবলিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় জয়পুরের মৃৎ শিল্পীরা নতুন পথের দিশা খুঁজে পেয়েছেন। এমনকি, সেই সময়কার ভোগ ম্যাগাজিনে বিশ্বের সেরা দশ সুন্দরী মহিলার মধ্যে নাম স্থান করে নিয়েছিলেন তিনি। হয়েছিলেন সেরা স্টাইল আইকন। চক্রবর্তী রাজা রাজাগোপালাচারীর স্বতন্ত্র পার্টির প্রার্থীর হয়ে গায়ত্রীদেবী কংগ্রেসের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন ১৯৬২ সালের লোকসভা নির্বাচনে। জয়ী হয়েছিলেন রেকর্ড ব্যবধানে। এমনকি গিনেস বুক অফ রেকর্ডে সবথেকে বেশি ব্যবধানে ভোট পেয়ে জয়ী হিসেবে নাম করেছিলেন। ১৯৬৭ এবং ১৯৭১-এর লোকসভা নির্বাচনেও তিনি কংগ্রেস প্রার্থীর বিরুদ্ধে জয় ধরে রাখতে পেরেছিলেন।

গায়েত্রী দেবীর সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ বলিউডও। স্বয়ং বিগ-বি অমিতাভ বচ্চনও জয়পুরের রাজমাতার সৌন্দর্য্য মুগ্ধ ছিলেন। অমিতাভ বচ্চন একবার একটি ব্লগে স্বীকার করেছিলেন যে, সিল্কের পোশাক পরে যখন গায়েত্রী দেবী পোলো গ্রাউন্ডে খেলতে আসতেন তখন তিনি তাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে যেতেন। খেলা দেখার টানে নয়, গায়েত্রী দেবীর সৌন্দর্যের টানেই অমিতাভ বারংবার পোলো গ্রাউন্ডে ছুটে যেতেন তাকে এক ঝলক দেখার জন্য। মহারানী গায়েত্রী দেবীর রূপের প্রশংসা করেছেন শাহরুখ খানও।

উল্লেখ্য গায়েত্রী দেবী মহিলাদের শিক্ষার প্রসারের জন্য বহু কাজ করে গিয়েছেন। তিনি মনে করতেন নারীদের উন্নয়নের জন্য নারীদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। মহিলাদের শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নতির জন্য ১৯৪৩ সালে জয়পুরে মহারাণী গায়ত্রী দেবী গার্লস পাবলিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। ভারতের ইতিহাসের এমন বলিষ্ঠ নারী চরিত্র ২০০৯ সালের ২৯ শে জুলাই পরলোকগমন করেন। গত ২৩শে মে ছিল তার ১০২ তম জন্মদিন। জন্মদিন উপলক্ষে তাকে স্মরণ করছেন জয়পুর এবং কোচবিহারের মানুষেরা।