অবিশ্বাস্য লাগবে, এই ৮ খাবার জন্মসূত্রে আদৌ বাঙালি নয়

Bengali Food

সুখাদ্যের স্বর্গ বাংলা। টক, ঝাল, মিষ্টি তেঁতোর মতো কত না স্বাদ, গন্ধ, বর্ণের খাবার! আর আছে রকমারি মশলা। রান্নাকে করে তোলে আস্বাদনীয়। সারা পৃথিবীর লোক রকমারি খাবারের স্বাদ চাখতে উপস্থিত হন বাংলায়। চেটেপুটে খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলেন তাঁরা। কিন্তু জানলে আশ্চর্য হতে হয় অনেক খাবারই আছে যেগুলির উৎপত্তি বাংলা তো বটেই ভারতেই নয়। চমকে গেলেন? হ্যাঁ, ভারতীয়রা গর্ব করলেও জিভে জল আনা অনেক পদই এসেছে বাইরে থেকে। এখানে তেমনই কয়েকটি খাবারের তালিকা করলাম আমরা।

চা : চা-এর উৎপত্তি সুদূর চীন দেশে। ১৬০০ শতাব্দীতে ফুজিয়ান থেকে চা নিয়ে বিদেশে পাড়ি দেন ডাচ ব্যবসায়ীরা। সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে চা। উইকিপিডিয়া জানাচ্ছে, চা চাষে চীনের একচেটিয়া আধিপত্যে ভাগ বসাতেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি স্থানীয়ভাবে ভারতে চা চাষ শুরু করে।

চা-এর উৎপত্তি হল কিভাবে ?

চা আবিষ্কার করেন মহান চৈনিক শাসক শেন নাং। তিনি নিজেই সবসময় ফোটানো জল পান করতেন। একদিনের কথা, শেন তখন চীনের জুন্নান প্রদেশে অবস্থান করছেন। যাত্রাপথে এক বনানীর নিচে যাত্রা বিরতি করা হলো। খোলা প্রান্তরে গাছের ছায়ায় বসে আছে সবাই। কেউ বিশ্রাম করছে, কেউ খাবারের ব্যবস্থা করছে। জলপাত্রে জল ফোটানো হচ্ছে। জলের স্ফূটনাংক ১০০ ডিগ্রি সেন্ট্রিগ্রেড। হঠাৎ বাতাস পাশের ঝোপ থেকে কিছু পাতা উড়িয়ে এনে ফুটন্ত জলের ভিতর ফেলল। পাতাটাকে তুলে ফেলার চেষ্টা করার আগেই সেটা জলে দ্রবীভূত হয়ে গেছে। জলের রং বদলে গেলো।

Invention of Tea

শেন কৌতূহলী হয়ে জলের ঘ্রাণ শুঁকে দেখেন অন্যরকম এক মাদকতা ছড়ানো গন্ধ। তিনি এটার স্বাদ নিলেন। তারপর তো রীতিমত চায়ের প্রেমে পড়ে গেলেন। টি এর বাংলা হিসেবে আমরা চা ব্যবহার করি। চা কিন্তু বাংলা শব্দ না। চা চীনা শব্দ। শাং শাসনামলে চা পাতার রস ঔষধি পানীয় হিসেবে সেবন করা হত। সিচুয়ান প্রদেশের লোকেরা প্রথম চা পাতা সিদ্ধ করে ঘন লিকার তৈরী করা শেখে।

১৬১০ সালের দিকে ইউরোপে চায়ের প্রবেশ ঘটে পর্তুগীজদের হাত ধরে। শীতের দেশে উষ্ণ চায়ের কাপ প্রাণে স্ফুর্তির জোয়ার নিয়ে এলো। ১৭০০ সালের দিকে ব্রিটেনে চা জনপ্রিয় হয়। ইংরেজদের হাত ধরে চা ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করে। তারা ভারতের আসাম রাজ্যে চায়ের চাষ শুরু করে। চা উৎপাদনে চীনের একক আধিপত্যকে খর্ব করতে বিলাতিরা ভারতে চা চাষ শুরু করে। প্রথম দিকে এংলো ইন্ডিয়ানরাই চা ব্যবসা শুরু করে পরে ভারত স্বাধীনতা লাভ করার পর চা শিল্প দেশীয়দের হাতে বিকশিত হয়। আসাম থেকে বাংলায়।

Roadside Tea

সুক্তো : কেরালাবাসীর হাত ধরে সুক্তো ছড়িয়ে পরে ভারতে। কিন্তু প্রাচীন কালে পর্তুগীজদের একচেটিয়া খাবার ছিল সুক্তো। ‘চৈতন্যচরিতামৃতে’ সুকুতা, শুকুতা বা সুক্তা বলতে একধরণের শুকনো পাতাকে বলা হয়েছে। এটি ছিল আম-নাশক। সম্ভবত এটি ছিল শুকনো তিতো পাটপাতা। রাঘব পণ্ডিত মহাপ্রভুর জন্য নীলাচলে যেসব জিনিস নিয়ে গিয়েছিলেন তার মধ্যে এই দ্রব্যটিও ছিল।

শুক্তোকে সেকালে ‘তিতো’ বলা হত।শুক্তো যে যে সব উপকরন দিয়ে তৈরী হয় সেগুলি স্বাস্থ্যের পক্ষ্যে উপকারী। তিক্ত রসে রুচী বাড়ে। পলতা, নালতে, উচ্ছে, করলা, কচি নিম পাতা ইত্যাদি শুক্তোর তিক্ত রসের জন্যে ব্যবহার করা হয়। পর্তুগিজরা বাংলায় আলুর ব্যবহার চালু করবার পর থেকে এটি শুক্তোর একটি উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

Sukto

জিলিপি : জিলিপি মূলত পশ্চিম এশিয়ার খাবার। আরবি শব্দ জুলেবিয়ার এবং পার্সি শব্দ জুলবিয়া থেকে জিলিপি শব্দটির উৎপত্তি। মধ্যযুগে ফার্সিভাষী তুর্কিরা ভারত আক্রমণ করে। তাদের হাত ধরেই এই দেশে জিলিপির আগমন।এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া যাবে না যে জিলাপি খেতে ভালবাসে না। ১৫শ শতাব্দী নাগাদ সংস্কৃত ভাষার পুথিতে ‘কুণ্ডলিকা’ এবং ‘জালাভালিকা’ নামে দুটি মিষ্টির নাম পাওয়া যায়।

গবেষকরা জানাচ্ছেন, ‘কুণ্ডলিকা’ এবং ‘জালাভালিকা’ আসলে জিলিপিরই অন্য নাম।তবে শুধু ভারত বা বাংলাদেশে নয়, গোটা বিশ্বে বিশেষ করে এশিয়ায়, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নানা নামে জিলিপি পাওয়া যায়। ইরানে এর নাম জালাবিয়া, মালদ্বীপে জিলিপি, তিউনিসিয়া, লিবিয়া এবং আলজেরিয়াতে জিলিবিয়া এবং নেপালে একে বলা হয় জেলি।

জানা যায়, মুগল যুগে বাদশাদের খাদ্যতালিকায় জিলিপির প্রবেশ ঘটে সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময় থেকে। এই মিষ্টি জাহাঙ্গীরের এতো প্রিয় ছিল যে, তিনি এই মিষ্টির সঙ্গে নিজের নাম জুড়ে দিতে দ্বিধা করেননি। তিনি নাম রেখেছিলেন ‘জাহাঙ্গিরা’। জিলিপির স্বাদ যে অতুলনীয় সেকথা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।  সেই কারণেই যুগযুগ ধরে এই উপাদেয় পদটি টিকে আছে নিজের ঐতিহ্যকে বজায় রেখে। আশা করা যায় আগামী দিনেও থাকবে।

গুলাবজামুন : মধ্য এশিয়ার তুর্কিদের খাবার প্যানকেকের বিবর্তিত রূপ গুলাবজামুন। তুর্কিদের হাঁড়িতেই তাই গুলাবজামুন তৈরি। ভিন্ন মতে, শাহজাহানের ব্যক্তিগত রাঁধুনি দূর্ঘটনাবশত গুলাবজামুন তৈরি করে ফেলে।
পারসি ‘গোল’ শব্দের অর্থ ফুল এবং ‘আব’ অর্থে জল অর্থাৎ গোলাপগন্ধী সিরাপ। ‘জামান’ বা ‘জামুন’ শব্দের উৎপত্তি উর্দু ও হিন্দি থেকে। রান্নার ইতিহাস বিশেষজ্ঞ মাইকেল ক্রন্ডল এবং লুকমত আল কাদির মতে, গুলাবজামুন পারস্য পদ।

সিঙাড়া : দশম শতাব্দীতে মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম সিঙাড়ার উদ্ভব। ওরা বলে ‘সাম্বোসা’। ত্রয়োদশ এবং চতুর্দশ শতাব্দীতে মধ্য এশিয়ার ব্যবসায়ীদের হাত ধরে ভারত এবং উপমহাদেশের অন্যান্য দেশে সিঙাড়ার প্রবেশ। ফার্সি শব্দ ‘সংবোসাগ’ থেকেই এই সিঙ্গারার শব্দের উৎপত্তি। আবার কোনও কোনও ইতিহাসবিদদের দাবি, গজনবী সাম্রাজ্যে সম্রাটের দরবারে এক ধরনের নোনতা পেস্ট্রি পরিবেশন করা হতো। যার মধ্যে কিমা, শুকনো বাদাম জাতীয় কিছু দেওয়া হতো।

ভারতে ২ হাজার বছর আগে সিঙ্গারার আবির্ভাব। ১৬ শতকে পর্তুগিজরা যখন এ দেশে আলুর ব্যবহার শুরু করার পর থেকে সিঙ্গারার মধ্যে আলু দেওয়ার রীতি চালু হয়। বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে আলাদা আলাদা স্বাদের সিঙ্গারা পাওয়া যায়। কোথাও পনির ব্যবহার করা হয় তো, কোথাও শুকনো ফল। এখন আবার চাউমিনের পুর দিয়েও সিঙ্গারা তৈরি করা হয়।

বিরিয়ানি : দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমদের খাবার বিরিয়ানি। কিন্তু উইকিপিডিয়া জানাচ্ছে, এর সঠিক উৎপত্তি অনিশ্চিত। ভারতীয় রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী ক্রিস ধিলনের বিশ্বাস, বিরিয়ানি আসলে পারসি পদ এবং মুঘলদের হাত ধরে তার ভারতে প্রবেশ। আরও একটি প্রচলিত মত, বিরিয়ানি খাঁটি ভারতীয় পদ। বাবর ভারতে আসার অনেক আগে থেকেই ভারতীয়রা বিরিয়ানির স্বাদ নিতে অভ্যস্ত।

চিকেন টিক্কা মশালা : স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে উৎপত্তি। জানলে অবাক হতে হয়, গ্রেট ব্রিটেনের একটি জনপ্রিয় পদ চিকেন টিক্কা মশালা। ২০০১ সালে ব্রিটেনের মন্ত্রী রবিন কুক দাবি করেছিলেন, চিকেন টিক্কা মশালা খাঁটি ব্রিটিশ পদ।

নান : মধ্যপ্রাচ্যের রান্না থেকে প্রভাবিত হয়ে মধ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ায় নান পদের উৎপত্তি হয়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ, প্রায় ২৫০০ বছর আগে পারস্য এবং মুঘলদের হাঁড়িতে নানের উদ্ভব। খাবার নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করতে গিয়ে তৈরি হয়ে যায় নান। সুদূর ইজিপ্ট ঘুরে ভারতীয়দের পাতে নানের আগমন।