মুঘল সাম্রাজ্যের অলখিত বাদশা নুর জাহান সম্পর্কিত ১০ অজানা তথ্য

তাঁর রূপের খ্যাতি চলে আসছে শতকের পর শতক ধরে। তাঁকে ধরা হয় নারীবাদের আইকন হিসাবে। তিনি মুঘল সম্রাজ্ঞী নুরজাহান। আঠারো শতকের ভারতের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী নারীদের একজন।
মুঘল আমলের দুটি বড় নগর ছিল আগ্রা এবং লাহোর। এই ২ শহরেই নুর জাহান সম্পর্কে ছড়িয়ে আছে হাজার কিংবদন্তী। তিনি জাহাঙ্গীরের স্ত্রী। অবশ্য এটাই তাঁর একমাত্র পরিচয় নয়। দিনের বেশীরভাগ সময়েই মদে আকন্ঠ ডুবে থাকতেন জাহাঙ্গীর। নিতেন আফিমও। ফলে দেশ শাসন করার মতো অবস্থা তাঁর থাকত না। তাই তাঁকে সামনে রেখে দেশ শাসন করতেন নুর জাহান নিজে। ইংরেজ দূত টমাস রো তাঁর ভ্রমণ লিখে গেছেন এই কথা।

নূর জাহান একজন মুঘল সম্রাজ্ঞী যাঁর পিতৃদত্ত নাম ছিল মেহেরুন্নিসা। জন্ম ১৫৭৭ ইংরেজি সনে ইনি মুঘল সম্রাজ্ঞী ও সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রধানা মহিষী ছিলেন। একজন বলিষ্ঠ, সম্মোহনী ও উচ্চশিক্ষিতা নারী হওয়ায় তাঁকে ১৭শ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী নারী ভাবা হয়। ইনি সম্রাট জাহাঙ্গীরের বিশতম ও সর্বাপেক্ষা প্রিয়া স্ত্রী ছিলেন। এখানে ‘ইচরেপাকা’র পাঠকদের জন্য তুলে দেওয়া হল নুর জাহানের  ১০ অনন্য কীর্তি।

১) নারীবাদী নুর জাহান

আসল নাম মেহেরুন্নিসা। বইয়ের পর জাহাঙ্গীর তাঁর নাম দেন নুর জাহান। যার অর্থ জগতের আলো। কিন্তু মুঘল হারেমেই কাটিয়ে দেননি নিজের জীবন। একমাত্র নুর জাহানকেই দেখা যেত রাজপ্রাসাদের বারান্দায়। আগে পর্যন্ত কেবল পুরুষদের জন্যই সংরক্ষিত ছিল। তবে পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে নুর জাহানের এটিই একমাত্র বিদ্রোহ ছিল না। শিকারে বের হওয়া থেকে শুরু করে নিজের নামে রাজকীয় মূদ্রা এবং রাজকীয় ফরমান জারি, বড় বড় রাজকীয় ভবনের নকশা তৈরি, দরিদ্র নারীদের কল্যাণে ব্যবস্থা গ্রহণ, এরকম নানা কাজে নুর জাহান তার স্বাক্ষর রেখেছেন। যা ছিল সেকালের নারীদের মধ্যে ব্যতিক্রম। এমনকি একা হাতে বিদ্রোহ সামলে যুদ্ধ পরিচালনাও করেছেন তিনি।

২) তাজমহলের নকশার অনুপ্রেরণা

Loading...

নুর জাহান ছিলেন একাধারে কবি, দক্ষ শিকারি এবং সৃজনশীল স্থপতি। আগ্রায় নুর জাহানের আঁকা নকশাতেই নির্মিত হয়েছিল তাঁর বাবা-মার সমাধি সৌধ। পরে এই স্থাপত্যরীতিই তাজমহলের স্থাপত্য নকশার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।

৩) শিকারি ও যোদ্ধা নুর জাহান

শারীরিকভাবে ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী। প্রায়ই সম্রাটের সঙ্গে বাঘ শিকারে যেতেন তিনি। বাঘ শিকারি হিসেবেও ছিল তাঁর নাম ডাক। শোনা যায়, ৬ টি গুলি দিয়ে ৪ টি বাঘ শিকার করেছিলেন নুর জাহান। তাঁর বীরত্বের কাহিনী নিয়ে বহু কবিতাও লিখেছেন অনেক কবি। এখানেই শেষ নয়, জাহাঙ্গীরের রাজত্বের শেষ দিকে ছেলে খুররম ও সেনাপতি মহাব্বত খা বিদ্রোহ করেন। তখন মুঘল সেনাদের নিয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন নুর জাহান নিজে।

আরও পড়ুন : ভারত থেকে ব্রিটিশরা কি কি লুট করেছিল?

৪) মুঘল সাম্রাজ্যের অলিখিত বাদশা

নিজের পানাসক্তি এবং আফিম সেবনের কারণেই সাম্রাজ্য বিস্তার বা দেশ শাসন কোনওটাতেই মন ছিল না জাহাঙ্গীরের। কিন্তু তাতে মুঘল বংশে কোনও আঁচ লাগতে দেননি নুর হাজান। জাহাঙ্গীরকে সামনে রেখে নিজেই তুলে নেন শাসনভার। এক রাজকর্মচারীর জমির অধিকার রক্ষায় রাজকীয় ফরমান জারি করেছিলেন তিনি। ফরমানের নীচে স্বাক্ষরে লেখেন, নুর জাহান পাদশাহ বেগম। যার অর্থ নুর জাহান, সাম্রাজ্ঞী।

আরও পড়ুন : এক নতুন শাহজাহানের দ্বিতীয় তাজমহল তৈরির গল্প

৫) নুর জাহান নামাঙ্কিত মুদ্রা

১৬১৭ সালে নুর জাহান নামাঙ্কিত রৌপ্য মুদ্রা ছাড়া হয় ভারতের বাজারে। কোনও ভারতীয় নারীর নামে মুদ্রার চল আজও ইতিহাস।

৬) আসল নাম

নুর জাহান বা জগতের আলো সম্রাট জাহাঙ্গীর এর দেওয়া নাম। তার আসল নাম ছিল মেহেরুন্নিসা। মেহেরের বাবা ছিল গিয়াস বেগ। তার বাবা গিয়াস বেগ ও মা যখন তেহেরান থেকে ভাগ্যের সন্ধানে হিন্দুস্তান আসছিলেন তখন পথের মধ্যেই নির্জন মরু প্রান্তে এক বাবলা গাছের তলায় জন্ম হয় মেহেরুন্নিসার। গল্প আছে যে এই সময় গিয়াস বেগ ও তার পত্নী এমন দুর্দশায় পরেছিলেন যে মেয়ে কে বাঁচাবার কোন উপায় না পেয়ে তারা পথের মাঝেই কচি মেয়েকে শুইয়ে রেখে রউনা হন। আশা ছিল কোন সহৃদয় ব্যক্তি যদি তাকে পায় নিয়ে আশ্রয় দিবে। কিছুদূর যাবার পর ই শিশু কন্যার কান্না শুনে তারা আর থাকতে পারলেন না। ফিরে এসে মেয়েকে বুকে চেপে নিঃসহায় , নিঃসম্বল গিয়াস বেগ এসে পৌঁছালেন লাহোরে। এবার তার ভাগ্য পরিবর্তন হল। আকবর বাদশার সুনজরে পরলেন তিনি, আর ছোট মেয়ে মেহেরের।

৭) নূরজাহানের বিয়ে

মেহেরের বিয়ে ঠিক হয় তুর্কিস্তানের খানদানি বংশের আলি কুলি বেগ এর সঙ্গে। একলা খালি হাতে বাঘ মারার জন্য তার নাম হয় শের আফগান। শেরের মৃত্যুর পর মেহেরকে আগ্রাতে নিয়ে আসা হয়। তখন মেহেরের বয়স ৩৩। ওই বয়স এও তিনি অপূর্ব রূপসী ছিলেন। মোঘল হেরেমে থেকেও দীর্ঘ চার বছর সম্রাটকে দেখেননি। তারপর আর পারলেন না সম্রাটকে ফেরাতে। ৩৭ বছর বয়সে বিয়ে করেন জাহাঙ্গীরকে। জাহাঙ্গীর তার নাম দিলেন নুরজাহান বা জগতের আলো।
মৃত্যু

৮) নূরজাহান ও জাহাঙ্গীর

নূরজাহানের প্রতি জাহাঙ্গীরের আকর্ষণ যে অনেক আগে থেকেই ছিল। তখন জাহাঙ্গীরের রাজত্বের ছয় বছর চলছে। ১৬১১ সালের ২১ মে সন্ধ্যায় শাহী মহলের মীনা বাজারে নওরোজের উৎসব দেখতে বের হন সম্রাট। ইরানী সংস্কৃতি অনুযায়ী নওরোজ হলো নববর্ষ বরণ উৎসব। এখানেই এক পোষাকের দোকানে এসে চমকে যান জাহাঙ্গীর। দোকানী রুপসী এক ইরানী কন্যা। এত বছর পরেও মেহের-উন-নিসাকে চিনতে একটুও অসুবিধা হয়নি তার। তৎক্ষনাৎ তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসেন জাহাঙ্গীর। সেই মাসেরই ২৫ তারিখে, আরবী ১২ রবিউল আউয়াল ১০২০ হিজরী তারিখে মেহের-উন-নিসাকে বিয়ে করে মহলে নিয়ে আসেন জাহাঙ্গীর। নতুন স্ত্রীর রুপে মুগ্ধ হয়েই হয়তো তাঁর নাম দেন ‘নূর মহল’ (মহলের আলো)। বিয়ের পাঁচ বছর পর, ১৬১৬ সালে এই নাম পরিবর্তন করে সম্রাট স্ত্রীর নাম দেন ‘নূর জাহান’ (জগতের আলো)। শুধু একটি মহলই নয়, মেহের-উন-নিসার কীর্তি ও মহিমা মহল ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র মুঘল সাম্রাজ্যে। তাই ‘নূর মহল’ নামটিতে তাঁকে সীমাবদ্ধ করা যায়নি।

৯) নুরজাহানের অবদান

শাহজাহানের উপর নূরজাহানের অনেক সুপ্রভাবও ছিল। অত্যাধিক মদ্যপানের জন্য সবসময় সমালোচিত সম্রাট জাহাঙ্গীর নূরজাহানের প্রভাবেই মদ খাওয়া কমিয়ে দেন। গরীব-দুখী ও বিধবাদের প্রতি নূরজাহান সবসময়ই সংবেদনশীল ছিলেন। নূরজাহান অনেক সমৃদ্ধ সাহিত্যবোধ সম্পন্ন পারসিক পরিবারের মেয়ে ছিলেন বিধায় নিজেও কাব্যচর্চায় অনন্য ছিলেন। একইসাথে তার চর্চা করা ঐতিহ্যবাহী পারসিক আতর তৈরির শিল্প, অতি উন্নত অলঙ্কার ও বুনন শিল্প ভারতবর্ষে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুঘল অবদান।

১০) নূরজাহানের মৃত্যু

নুরজাহানের শেষ জীবন সুখের হয় নি। তার বিরাট উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল তার জন্য দায়ী। জাহাঙ্গীর এর মৃত্যুর পর নুরজাহানও লাহোরেই থেকে যান। জীবনের শেষ ১৮টি বছর নূরজাহানের বন্দীদশাতেই কাটে। এই পুরো সময় তিনি রাজনীতি থেকে বিচ্যুত হয়ে, তার পিতার সমাধিতে দরগাহ তৈরির তদারকি করে ও কাব্যচর্চা করে দিনাতিপাত করেন। ১৬৪৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর ৬৮ বছর বয়সে নূর জাহানের মৃত্যু হয়। লাহোরের শাহদারা বাগে সম্রাট জাহাঙ্গীরের সমাধির অদূরেই নূরজাহানের সমাধি। তার কবরের উপরে খচিত আছে, “এই নগন্য আগন্তুকের কবরের উপর না কোনো প্রদীপ থাক, না কোনো গোলাপ। না কোনো প্রজাপতির পাখা পুড়ুক, না কোনো বুলবুলি গান গাক।” কী গভীর দার্শনিক উক্তি! সমাধিক্ষেত্রটি তারই তৈরি করানো ছিল, পঙ্কতিটিও সম্ভবত তারই কাব্য থেকে নেওয়া।

তার কবরের গাঁয়ে তার রচিত দুটি লাইন দেখতে পাওয়া যায়। ফরাসিতে লেখা। কবি সত্ত্যন্দ্র নাথ দত্ত বাংলায় অনুবাদ করেনঃ “ গরীব গোরে দ্বীপ জেলো না, ফুল দিও না কেউ ভুলে, শ্যামা পোকার না পোড়ে পাখ, দাগা না পায় বুলবুলে।“ সুতীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার অধিকারিনী, সুগভীর কূটনৈতিক জ্ঞানসম্পন্না এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মুঘল ইতিহাসে তো বটেই, সমগ্র ভারতবর্ষের ইতিহাসেই স্মরণীয়া এক নারী।

Loading...