সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অভিনীত সেরা ১৫ টি ছবি যা সবার দেখা উচিত

"মানিকদার সঙ্গে" তে অভিনেতা লিখেছিলেন, সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray) তাকে "অভিযান" এর শুটিং এর সময় বলেছিলেন, "স্ট্রাগল না করলে ভালো অভিনেতা হওয়া যায়না"। আগামী দিনে এই কথাকে নিয়েই এগিয়ে গিয়েছেন ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chattopadhyay)।

15 Soumitra Chatterjee Films That Everyone Should Watch
15 Soumitra Chatterjee Films That Everyone Should Watch

বাংলা চলচ্চিত্র জগতে এক অন্ধকারময় দিন। আলোর উৎসবের মধ্যেই যেন চারিদিকে অন্ধকারের নিস্তব্ধতা ছড়িয়ে বিদায় নিলেন কিংবদন্তী অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chattopadhyay)। দীর্ঘ্য ৪০ দিনের লড়াইয়ের অবসান।একসময় তিনিই বলেছিলেন, যেদিন তিনি অভিনয় ছেড়ে দেবেন, সেদিনই তিনি জীবনও ত্যাগ করবেন। সত্যি হয়ে গেল তার সেই কথা।

তার দীর্ঘ অভিনয় জীবনে কিংবদন্তী পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের (Satyajit Ray) হাত ধরে তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন এক একটা ধাপ। “মানিকদার সঙ্গে” তে অভিনেতা লিখেছিলেন, সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray) তাকে “অভিযান” এর শুটিং এর সময় বলেছিলেন, “স্ট্রাগল না করলে ভালো অভিনেতা হওয়া যায়না”। আগামী দিনে এই কথাকে নিয়েই এগিয়ে গিয়েছেন ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chattopadhyay)।

অভিনয়ের জন্য দেশ বিদেশ থেকে বিভিন্ন সন্মান কুড়িয়েছেন তিনি। বারবার পদ্মশ্রী (Padmashree) ফিরিয়ে দেওয়ার পরে ২০০৪ সালে পদ্মভূষণ (Padmabivushan),২০১২ সালে দাদাসাহেব ফালকে (Dadasaheb Phalke),২০০৬ সালে সুমন ঘোষের “পদক্ষেপ” ছবির জন্য জাতীয় পুরষ্কার (National Award), ফ্রান্সের সরকারের থেকে Legion d’Honneur এবং Commandeur de l’Ordre des Arts et des Lettres ছাড়াও অসংখ্য পুরষ্কারে সন্মানিত হয়েছেন তিনি। তাহলে চলুন একবার ফিরে দেখা যাক সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অভিনীত সেরা ১৫ টি ছবি যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাংলার আবেগ হয়ে থেকে যাবে।

১. অপুর সংসার (১৯৫৯) :- সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray) পরিচালিত অপুর সংসার শুধু বাংলা বা ভারতীয় সিনেমার নয়, বিশ্বের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এটি একটি অন্যতম সেরা ছবি। প্রথমে অপুর ট্রিলজির অপারিজিত(১৯৫৬) এ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chattopadhyay) এর অভিনয়ের করার কথা হয়। সেই সময় সত্যজিৎ রায়ের (Satyajit Ray) মনে হয় কলেজে পড়া সৌমিত্র ‘অপুর’ সেই বয়সের তুলনায় অনেকটা লম্বা। ফলে তার পরিবর্তী ছবি অপুর সংসার এর শুটিং শুরু হওয়ার আগে সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray) সৌমিত্রকে ডেকে পাঠান।

সেই সময় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chattopadhyay) আকাশ বাণীতে কাজ করছিলেন। এরপর, শুরু হলো অপুর সংসারের শুটিং, ছবি প্রকাশ পেল আর বাংলা চলচ্চিত্র জগতে একটা যুগ তৈরি হলো। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chattopadhyay) এর শর্মিলা ঠাকুরের যুগলবন্দী, স্ক্রিনে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের (Soumitra Chattopadhyay) অভিনয়, ডায়লগ বলার ভঙ্গি আজও বাঙালির কাছে নস্টালজিয়া।

২. ঝিন্দের বন্দী (১৯৬১) :- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা “ক্ষুধিত পাষাণ” এর অবলম্বনে বাংলার আরেক কিংবদন্তী পরিচালক তপন সিনহা (Tapan Sinha) প্রথম কাজ করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সাথে। কিন্তু ঝিন্দের বন্দী ছবিতে সৌমিত্রের অভিনয় রীতিমত তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতন ছিল। ছবির উপরি পাওনা, একই ছবিতে দুই কিংবদন্তী উত্তম কুমার (Uttam Kumar) এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ( Soumitra Chattopadhyay) কে দেখতে পাওয়া। Anthony Hopes এর বই “Prisoner of Zenda” থেকে অনুপ্রণিত হয়ে লেখক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় একটি উপন্যাস রচনা করেছিলেন, এই ছবিটি সেই উপন্যাস থেকেই অনুপ্রাণিত।

৩. অভিযান (১৯৬২) :- এই ছবিতে ট্যাক্সি ড্রাইভার ‘নরসিংহ’র চরিত্রের বিভিন্ন দিকগুলি দক্ষতার সাথে ফুটে উঠেছে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের (Soumitra Chattopadhyay) অভিনয়ে।চরিত্রের মধ্যে ফুটে ওঠা, গ্লানি,আবেগ আত্মসম্মানবোধ যেমন তিনি নিপুণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তেমনই তার স্ত্রী গুলাবি (ওয়াহিদা রহমান) এবং তার প্রথম ভালোবাসা নিলী ( রুমা গুহ ঠাকুরতা) র সাথে তার রসায়ন দর্শকদের মুগ্ধ করেছে।

৪. সাত পাকে বাঁধা (১৯৬৩) :- এই ছবিটি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের (Soumitra Chattopadhyay) অভিনয় জীবনের অন্যতম মাইলস্টোন।একজন ভদ্র কিন্তু নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা ব্যাক্তি ‘সুখেন্দু’র চরিত্রকে অসাধারণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি।তার বিপরীতে ছিলেন বাংলার evergreen শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী সুচিত্রা সেন (Suchitra Sen)।ছবিতে অর্চনার ভূমিকায় সুচিত্রা সেনের অভিনয় সবখানে প্রশংসিত হয়।সৌমিত্র এবং অজয় করের যুগলবন্দী ছবিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করে।

৫. চারুলতা (১৯৬৪) :- সত্যজিৎ রায়ের (Satyajit Ray) কেরিয়ারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং বহুল প্রশংসিত ছবি চারুলতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের (Soumitra Chattopadhyay) জীবনেরও একটা মাইলস্টোন ছিল।এই ছবিতে সৌমিত্রর নিপুণতা চোখে পড়ার মতন। যেহেতু ছবিটি ১৮৭০ এর দশকের ওপর নির্মিত হয় তাই সেই সময়ের বাংলার হরফ এবং লেখার ভঙ্গি বোঝার জন্য রীতিমত পড়াশোনা করেছিলেন অভিনেতা।

৬. আকাশ কুসুম (১৯৬৫) :- মৃণাল সেন (Mrinal Sen) পরিচালিত এই ছবিতে একজন মধ্যবিত্ত  চাকুরীজীবী ‘অজয় সরকার’এর ভূমিকায় অভিনয় করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chattopadhyay)। ছবিতে ব্যাক্তির বিভিন্ন সত্তার মধ্যে সংঘাত, কল্পনা ও বাস্তবের মধ্যে সংঘাত, ইত্যাদি আবেগকে নিপুণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন অভিনেতা। তিনি এই চরিত্রটিকে “প্রিয় চরিত্র” হিসেবেও ব্যাখ্যা করেছেন।

৭. অপরিচিত (১৯৬৯) :- সলিল দত্ত (Salil Dutta) পরিচালিত এই ছবিটি সংগৃহীত হয়েছে সমরেশ বসুর একটু উপন্যাস থেকে। ছবিতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chattopadhyay) এর সাথে উত্তম কুমারকে (Uttam Kumar) একই স্ক্রিনে দেখতে পান দর্শকরা।তারা দুজনে একসাথে মোট ৯টি ছবিতে কাজ করেছিলেন। ছবিতে অপরিণত চরিত্র সুজিত এর চরিত্রে সৌমিত্রের অভিনয় ছিল অনবদ্য।

৮. সোনার কেল্লা (১৯৭৪) :- এই ছবিতে সত্যজিৎ রায়ের (Satyajit Ray) পরিচালনায় তিনি যখন অভিনয় করেন তখন তার বয়স ৪০ এর কাছাকাছি। কিন্তু তা সত্বেও ছবিতে ফেলুদা রূপে তার পোশাক, কথা বলা এবং হাঁটাচলার ভঙ্গি বাংলার তরুণ প্রজন্মের কাছে অপুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। ছবিতে গোয়েন্দা ‘ ফেলুদা’র চরিত্রে তার অভিনয় এতটাই অসাধারণ ছিল যে আজও বাঙালির কাছে তিনিই বাংলার ফেলুদা হয়ে আছেন।

১০. কোনি (১৯৮৪) :- সরোজ দে (Saroj Dey) পরিচালিত এই জাতীয় পুরষ্কার (National Award) প্রাপ্ত ছবিটি একটি বাংলা উপন্যাস থেকে সংগৃহীত যে উপন্যাসের লেখক ছিলেন লেখক,সাংবাদিক মতি নন্দী। এই ছবিতে ‘ কোনি ‘ ( ছবিতে শ্রীপর্ণা ব্যানার্জি) র জীবনের কথা ফুটে ওঠে যে দারিদ্রের সাথে লড়াই করেও জাতীয় স্তরে সাঁতারু হিসেবে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। তার এই যুদ্ধে তার সবথেকে বড় সঙ্গী হিসেবে দেখা যায় তার গুরু ক্ষিতদা ( Soumitra Chattopadhyay)কে। এই ছবিতেই ছিল সেই বিখ্যাত সংলাপ “ফাইট,কোনি ফাইট”।

১১. আতঙ্ক (১৯৮৬) :- তপন সিনহার (Tapan Sinha) এই ছবিতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chattopadhyay) একজন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকের চরিত্রে অভিনয় করেছেন যিনি তার প্রাক্তন ছাত্রদের নিজের চোখে খুন করতে দেখেছেন।এই ছবিরই বিখ্যাত ডায়লগ ” মাষ্টারমশাই, আপনি কিছু দেখেননি”। ছবিতে তৎকালীন বাংলা সমাজের একটি প্রতিফলন ধরা পড়ে।

১২. গণশত্রু (১৯৮৯) :- আবারও সত্যজিৎ রায়ের (Satyajit Ray) পরিচালনায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের (Soumitra Chattopadhyay) অভিনয়।ছবিটি অনুপ্রাণিত হয় Henrik Ibsen এর ১৮৮২ সালের একটি নাটক An Enemy of the People থেকে। ছবিতে সৌমিত্র ধরা দেন ডাক্তার ‘অশোক গুপ্তা’র চরিত্রে যিনি  একটি পবিত্র মন্দিরের পবিত্র জলে অনেক পরিমাণে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পান।ছবিতে তার অভিনয় ছিল মনে রাখার মতন।

১২. অসুখ ( ১৯৯৯) :- বাংলার ওপর এক কিংবদন্তী পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের (Rituparno Ghosh) পরিচালিত এই ছবিতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের (Soumitra Chattopadhyay) অভিনয় সত্যিই প্রশংসনীয়।এটি একটি জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত (National Award Winning) ছবি যেখানে অত্যন্ত গভীর ভাবে একজন পূর্ণবয়স্ক কন্যার সাথে তার বাবার সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।ছবিতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের (Soumitra Chattopadhyay) সাথে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন দেবশ্রী রায়।

১৩. দেখা (২০০১) :- গৌতম ঘোষ (Gautam Ghosh) পরিচালিত এই ছবিটি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর একটি ছোট গল্প অবলম্নে তৈরি হয় যেখানে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chattopadhyay) একজন খিটখিটে এবং প্রায় অন্ধ হয়ে যাওয়া কবির বিভিন্ন আবেগকে তুলে ধরা হয়েছে।এই ছবির পরে তিনি তার জীবনের দ্বিতীয় স্পেশাল জুড়ি (2nd special jury) পুরষ্কার অর্জন করেন। তবে, সৌমিত্র জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কারের বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতি উল্লেখ করে তাকে “সান্ত্বনা পুরষ্কার” বলে অভিহিত করতে অস্বীকার করেছিলেন।অন্যদিকে পরিচালক গৌতম ঘোষও সেরা বাংলা চলচ্চিত্রের জাতীয় পুরষ্কার গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন।

১৪. পদক্ষেপ (২০০৬) :- পরিচালক সুমন ঘোষের (Suman Ghosh) প্রথম ছবিতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chattopadhyay) একজন স্ত্রী হীন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মী ‘ শশাঙ্ক ‘ এর ভূমিকায় ধরা দেন।ছবিতে তার সাথে তার কন্যার সম্পর্ক এবং তার পাড়ার একটি বাচ্চা মেয়ের সম্পর্ককে তুলে ধরা হয় যা তার জীবনকে একটি নতুন দিশা দেখায়। এই ছবির জন্য সৌমিত্র প্রথম জাতীয় ফিল্ম আওয়ার্ড (National Film Award) এ সেরা অভিনেতার পুরস্কার গ্রহন করেন।

১৫. বেলাশেষে (২০১৫) :- শিবপ্রসাদ মুখার্জি, নন্দিতা রায় পরিচালিত এই ছবি বার্ধক্য জীবনে এসে সম্পর্কের ওঠানামা এবং সম্পর্কের অর্থগুলো বিশ্লেষন করে। ছবিতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chattopadhyay)  ‘বিশ্বনাথ মজুমদার’ নামে এমন একজন ব্যাক্তির চরিত্রে অভিনয় করেন যিনি জীবনের শেষ ধাপে এসে তার স্ত্রী (সাতিলেখা সেনগুপ্ত) কে স্বনির্ভর করতে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেন। তার আবেগ এবং সংকল্পের মাঝে তার সত্বাকে অসাধারণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chattopadhyay।