‘আমার সাধ না মিটিলো’ গেয়েও পাননি যোগ্য সম্মান, মাত্র ৩৬ বছরেই আত্মঘাতী হন পান্নালাল

কালজয়ী শ্যামাসঙ্গীতের জনক কিন্তু পান্নালাল পেলেন না কোনও সম্মান, শেষ পরিণতি ছিল খুবই করুণ

দীপাবলি উৎসব উপলক্ষে এখন বাংলার ঘরে ঘরে খুশির মরসুম। দীপাবলি সকলের জীবনের অন্ধকার কাটিয়ে আলোর রোশনাই নিয়ে আসে। কালীপুজোর রাত প্রদীপের আলো আর শ্যামাসংগীত (Shyama Sangeet)) ছাড়া যেন কল্পনাও করা যায় না। ‘মা আমার সাধ না মিটিলো’, ‘সকলই তোমার ইচ্ছা’, এরকম বেশ কিছু পুরনো শ্যামা সংগীত আজও এই আধুনিকতার জগতে জনপ্রিয়তা পায় ভক্তদের কাছে।

কিন্তু কখনও ভেবে দেখেন কি যে গানগুলো যুগের পর যুগ ধরে মানুষের মনে ভক্তিরসের উদ্রেক ঘটাচ্ছে, মায়ের প্রতি সন্তানের সমস্ত নিবেদন পৌঁছে দিচ্ছে, সেই কালজয়ী গানগুলোর স্রষ্টা কে বা কারা? এমন সুন্দর গান কারা গেয়েছেন তাদের নামটুকু পর্যন্ত জানিনা আমরা অনেকেই। যেমন অধিকাংশ শ্যামাসঙ্গীতের গায়ক পান্নালাল ভট্টাচার্যকেও (Pannalal Bhattacharya) অনেকেই চেনেন না।

হ্যাঁ, আজও বাঙালির ঘরে ঘরে, মন্দিরে মন্দিরে, পাড়ার পাড়ায় যে শ্যামাসংগীত গুলো বাজে, সেগুলো বেশিরভাগই পান্নালালের গাওয়া। কমলাকান্ত ভট্টাচার্য, রামপ্রসাদ সেন, রজনীকান্ত সেনদের মত নামী সংগীত শিল্পীদের মত পান্নালালও সেইসময় শ্যামা সংগীত গেয়ে ধীরে ধীরে তার পরিচিতি গড়ে তুলছিলেন। কিশোর অবস্থায় তিনি সংগীতের দুনিয়ায় পা রাখেন।

পান্নালাল তার জীবনে ৪০ টি শ্যামা সংগীত, ৩৬ টি আধুনিক গান এবং ৩ টি বাংলা সিনেমাতেও গান গেয়েছিলেন। কিন্তু তবুও সাফল্য কিংবা জনপ্রিয়তা ঠিক সেভাবে পেয়ে উঠছিলেন না তিনি। তিনি নিজেও গান লিখে তাতে সুর দিতে শুরু করেন। তিনি ছিলেন বাংলার প্রতিভাবান শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম। কিন্তু কখনও তিনি তার যোগ্য সম্মান পেলেন না।

আসলে আধুনিক গানের ভিড়ে কোথাও যেন হারিয়ে যেতে থাকেন পান্নালাল। কিন্তু শ্যামা সংগীতের ক্ষেত্রে তার গান আজও যেরকম জনপ্রিয় তা থেকে বেশ বোঝা যায় তিনি কত বড় মাপের শিল্পী ছিলেন। তার গান রেকর্ড করে মোটা অংকের অর্থ রোজগার করত রেকর্ড কোম্পানিগুলো। কিন্তু তুমি কখনও শ্যামা সংগীত গায়কের গণ্ডি পেরিয়ে উঠতে পারলেন না।

তার সময়ে অন্যান্য গায়করা যেখানে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গাওয়ার জন্য ডাক পেতেন সেখানে অবহেলার শিকার হতে হত পান্নালালকে। তিনি নিজের গায়কীতেও পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সফল হননি। জীবনের শেষ পর্যায়ে কালীঘাটে বাড়ি ভাড়া নিয়ে মাঝেমধ্যে কেওড়াতলার মহাশ্মশানে শান্তির খোঁজে যেতেন তিনি। তিনি বুঝতেন কোটিপতি হন বা ভিখারী, সকলেই জীবনের শেষ পর্যায়ে সেই একই আগুনে পুড়ছে।

একদিন সাংসারিক অশান্তির জেরে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মঘাতী হন পান্নালাল ভট্টাচার্য। তখন তিনি তিন সন্তানের বাবা। সংসারের দায়িত্ব ছিল তার কাঁধে। জীবনে যেন সত্যিই তার সাধ মিটলো না। সবকিছু বিসর্জন দিয়ে তিনি মৃত্যুকেই আপন করে নিলেন। রেখে গেলেন তার কালজয়ী অমর সৃষ্টি।