জিকা ভাইরাস কি? লক্ষণ, প্রতিরোধ এবং নিরাময়; খুঁটিনাটি জেনে নিন

বিগত কয়েক মাস আগে আমরা দেখেছি নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ। প্রধানত বাদুড়ের  লালা থেকে  সাধারণত সৃষ্ট এই ভাইরাস গত বছরের কেরালা জুড়ে সৃষ্টি করেছিল এক ত্রাহি ত্রাহি রব। আর তাই সতর্কতামূলক অনেক রকম ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। যদিও পরবর্তী সময়ে এই ভাইরাসের আক্রমণ প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু মানুষের মনে তৈরি হয়েছিল অনেক আশঙ্কা। আর এইসব আশঙ্কা যে অমূলক ছিল তা কিন্তু নয় নিপা ভাইরাসের আক্রমণে মৃত্যুর ঘটনাও যেমন আমরা প্রত্যক্ষ করেছি তেমনি, এই ভাইরাসের টিকা আবিষ্কার না হওয়ার জন্য তার মারাত্মকতা সম্বন্ধে প্রত্যেকের মনে ছিল সন্দেহ।

বর্তমান সময়ে ভারত জুড়ে আবার দেখা গেছে নতুন এক ভাইরাসের সংক্রমণ, আর এই ভাইরাস হল জিকা ভাইরাস। সম্প্রতি রাজস্থানে ২২ জনেরও বেশি রক্তের নমুনায় জিকা ভাইরাসের জীবাণু সংক্রমণ পাওয়া গিয়েছে। তাই আমাদের কাছে রীতিমতো আতঙ্কের বিষয় হতে চলেছে জিকা ভাইরাসের সংক্রমণ। প্রথম এই ভাইরাসের সংক্রমণ ভারতে দেখা দিয়েছিল গুজরাটে এই বছর জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি মাসে। পরবর্তী সময় তা তামিলনাড়ুতে ছড়িয়ে পড়ে জুলাই মাসের নাগাদ। তামিলনাড়ুর কিছু পীড়িত ব্যক্তির রক্তের এই ভাইরাসের সন্ধান পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে ২৩শে সেপ্টেম্বর ২০১৮থেকে এই ভাইরাসে নতুন সংক্রমিত হওয়ার ঘটনার খবর পাওয়া যাচ্ছে রাজস্থানের জয়পুর থেকে। আসুন জেনে নিই জিকা ভাইরাস এর সম্বন্ধে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

Source

জিকা ভাইরাসের নামকরণ ও উৎপত্তি

প্রথম আবির্ভাব বা প্রথম এই ভাইরাসের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়১৯৪৭সালে উগান্ডার জিকা বনাঞ্চলের কাছাকাছি অঞ্চল থেকে। এই থেকেই এই ভাইরাসের নাম দেওয়া হয়েছিল জিকা ভাইরাস।

Source

জিকা ভাইরাসের বাহক

জিকা ভাইরাসের বাহক হলো আমাদের পরিচিত এক মারাত্মক রোগ সৃষ্টিকারী মশা যার নাম এডিস ইজিপ্টটাই। অর্থাৎ আমাদের যে মশা ডেঙ্গু, চিকেনগুনিয়া ইত্যাদির মতো প্রাণঘাতী রোগ ছড়ায়। সাধারণত এই ভাইরাস এই মশার শরীরে তার বংশবৃদ্ধি করে থাকে। সাধারণত এডিস মশা দিনের বেলায় আমাদের কামড় দেয় অর্থাৎ দিনের বেলায় এই মশার কামড়ের ফলে আপনি ডেঙ্গু, চিকেনগুনিয়ার মতো যেমন মারাত্মক রোগের শিকার হতে পারেন তেমনি বর্তমানে জিকা ভাইরাসে সংক্রামিত হতে পারেন।

Source

জিকা ভাইরাসের সংক্রমনের লক্ষণ

এই ভাইরাসে যদি সংক্রমণ দেখা যায় তাহলে আক্রান্ত ব্যক্তির যে সমস্ত রোগ লক্ষণ দেখা যেতে পারে সেগুলি হল

Loading...

প্রথমত, আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তাপমাত্রা বাড়তে থাকবে অর্থাৎ আক্রান্ত ব্যক্তির উচ্চ তাপমাত্রাযুক্ত জ্বর আসবে।

দ্বিতীয়ত, এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে আপনার অর্থাৎ আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে গুটি গুটি লাল ফুসকুড়ির মতো দানাদার অংশ সারা শরীর জুড়েই দেখা যাবে ।

তৃতীয়ত ,এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে গাঁটে গাঁটে ব্যথা অনুভূত হবে এছাড়াও গাঁটে ব্যথা ছাড়াও সারা শরীর জুড়ে আপনি ব্যথা অনুভব করবেন ।

এই ভাইরাসে সংক্রমিত হলে আরেকটি নতুন যে রোগ লক্ষণ দেখা যায় তা হল কনজাংটিভাইটিস এর মত ছোঁয়াচে রোগও দেখা যেতে পারে।

অর্থাৎ কোন ব্যক্তির শরীরে যদি উপরের উক্ত সকল লক্ষনই দেখা যায় তাহলে কোন মতেই তাকে নিয়ে অবহেলা করা উচিত নয়। নিকটস্থ হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে অবশ্যই রক্ত পরীক্ষা করানো উচিত।

জিকা ভাইরাস থেকে বাঁচতে করণীয়

বাড়ির চারপাশে অর্থাৎ বাড়ির ভিতরে এবং বাড়ির বাইরে মশা বংশ বিস্তার করতে না পারে এমন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ রাখতে হবে।

জিকা ভাইরাস যে মশার শরীরে বংশবিস্তার করে অর্থাৎ এডিস ইজিপ্টটাই তারা পরিষ্কার জলে বংশবিস্তার করে। আপনার বাড়ির এবং তার চারপাশে জায়গায় এমন কোন খোলা জায়গায় জল জমতে দেওয়া যেতে পারে না যেখানে এই মশা বংশ বিস্তার করতে পারে। তাই বাড়ির মধ্যে খোলা চৌবাচ্চা বা ফুলদানি বা ফ্রিজ বা এস সি এ সমস্ত কিছুর জল যেখানে জমা হয় সে সমস্ত জলগুলি যেন প্রতিদিন পাল্টে দেওয়া যায় তার সুবন্দোবস্ত করতে হবে অথবা তা বায়ু নিরুদ্ধ অবস্থায় থাকতে হবে।

আরও পড়ুন : মশার কামড়ের জন্য পেলেন ১.৩৫লক্ষ টাকা,আপনিও পেতে পারেন, জানুন কীভাবে?

বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক মশা নিধনকারী বস্তু যেমন ক্রিম ,জেল, ইলেকট্রনিক মশা বিতাড়ন ও হত্যাকারী পদার্থ এছাড়া মশা মারার জন্য কয়েল বা ধুপ প্রতিদিন বিকাল দিক থেকেই বাড়ির মধ্যে ব্যবহার করতে হবে। সাধারণত বিকালবেলা এই এডিস মশার প্রাদুর্ভাব বাড়ির মধ্যে বেশি দেখা যায়।

রাত্রে বা দিনের বেলায় দুপুরে ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে।

দিনের বেলায় বাড়ির মধ্যে বা বাড়ির বাইরে যেখানেই থাকুন না কেন ফুলহাতা জামা এবং ফুল প্যান্ট ব্যবহার করা উচিত ।কারণ এই মশা দিনের বেলায় কামড়ায়। তাই দিনের বেলায় এই  মশার কামড় থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য সকল রকম উপায় অবলম্বন করতে হবে।

বাড়ির মধ্যে মশা তাড়ানোর জন্য বেশ কিছু গাছ লাগাতে পারেন ।যেমন তুলসী ,পাতিলেবু ,ল্যাভেন্ডার ,পুদিনা রোজমেরি ইত্যাদি।

আরও পড়ুন : মশা মারা ধুপ দিয়ে নয় মশা মারুন লেবু আর লবঙ্গ দিয়ে

Source

জিকা ভাইরাস সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা কাদের বেশি?

সাধারণত গর্ভবতী মহিলা এবং সদ্যোজাত শিশুদের এই ভাইরাসের সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি তাই গর্ভবতী মহিলা এবং সদ্যোজাত শিশুদের বিশেষ যত্ন নিতে হবে তারা যেন বেশিরভাগ সময় ফুল হাতা জামা এবং প্যান্ট এবং দিনের বেলায় যেন তারা মশার কামড় থেকে নিরাপদ থাকে তার ব্যবস্থা নিতে হবে। এই ভাইরাসের আক্রমণের ফলে শিশুদের মধ্যে জন্মগত বিকলাঙ্গতা সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়াও স্নায়ুঘটিত নানা সমস্যাও দেখা দিতে পারে শিশুদের মধ্যে।

ভারতে জিকা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এর সম্ভাব্য কারণ

ভারতের আবহাওয়া এডিস মশার বংশ বৃদ্ধির জন্য খুবই অনুকূল আবহাওয়া  দেখা যায়।এখানে যেমন জমে থাকা জল দেখা যায় বিভিন্ন জায়গায় সেই রকমই সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা বোধ উন্নত দেশের মতো সেইভাবে গড়ে ওঠেনি যার ফলে এই মশার সংখ্যা এবং বংশবৃদ্ধি অত্যধিক দ্রুতহারে ঘটছে।

আরও পড়ুন : নিপা ভাইরাস কী ? লক্ষণ, প্রতিরোধ এবং নিরাময় ; খুঁটিনাটি জেনে নিন

Source

আতঙ্কের কারণ

জিকা ভাইরাস সংক্রমিত হলে সবচেয়ে বেশি ভয়ের যা তা হল এই ভাইরাসে টিকা এখনো পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। অর্থাৎ সাবধানতা অবলম্বন ছাড়া এই ভাইরাস সংক্রমণ হওয়া থেকে অন্য কোন রাস্তা বর্তমানে আমাদের সামনে নেই। তাই নিজে সতর্ক থাকুন এবং অন্যকেও সতর্ক করে দিন।

Loading...