চীন এবং নেপালের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক খারাপ হচ্ছে কেন

4834

বিগত বছর গুলিতে প্রতিবেশী দেশগুলির সাথে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বন্দ্ব ও মতানৈক্যতে জড়িয়েছে ভারত। সে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সার্জিক্যাল স্ট্রাইক হোক কিংবা চীনা সেনার লাদাখের গালোয়ান উপত্যকা ও প্যাঙ্গং লেক অঞ্চলে ভারতে প্রবেশ। অন্যদিকে যেদিকে চীনের সাথে সাংঘর্ষতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অন্তত ২০ জন সৈন্য নিহত হলো সেখানে বুধবার নেপালে সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হওয়া নতুন ম্যাপে ভারতের কিছুটা অংশও আছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে দিল্লি। এখন প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে ভারতের বিদেশ নীতি নিয়ে।

ঘটনাগুলো বারবার একটি প্রশ্ন তুলে ধরছে, কেন প্রতিবেশী দেশগুলির সাথে সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে ভারতের? পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই খারাপ, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। চীনের সঙ্গেও ভারতের সম্পর্ক বরাবরই খারাপ। কিন্তু নেপালের মতো বন্ধু রাষ্ট্রও ভারতের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছে কেন?

এই বিষয় দিল্লির  জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের রিটায়ার্ড অধ্যাপক অশ্বিনী রায় বিবিসি-কে বলেন যে এই অঞ্চলের প্রতিটি দেশই এই বিষয়টি জানে যে তাদের স্বতন্ত্র ভারত চীন সম্পর্কের ওপরেই নির্ভর করছে। তার কথায় নেপাল এই সুযোগটি আগে থেকেই নিয়ে এসেছে এবং এখন বেশী করে এই সুযোগটি ব্যবহার করছে। তিনি আরও বলেন যে, পুরো দক্ষিণ এশিয়াতে ভারতের তুলনায় চীনের বৈদেশিক সম্পর্ক অনেক বেশী উন্নত। তিনি বলেন যে এইক্ষেত্রে চীন আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে কাজ করে যার প্রভাব ভারতের সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে।

চীনের সঙ্গে ভারতের বিবাদের কারণ

চীন ভয় পাচ্ছে ভারত তীব্বতকে স্বাধীন করে দেবে। ঘটনার শুরু ১৯৪৯ সালে। ১৯৪৯ সালে চীন তীব্বত দখল করে নেয়। চীনের প্রধান গুরু দলাই লামা ৮০,০০০ হাজার তীব্বতীকে নিয়ে ভারতে প্রবেশ করে। জহরলালের ইচ্ছায় দলাই লামার নেতৃত্বে তীব্বতীদের শাষিত করার জন্য একটি কাউন্সিল গঠন করা হয় (CTA) ১৯৫৯ সালে। ২০০৬ সালে ভারতে প্রথম তীব্বতী সরকার স্থাপন কর হয়। যার নাম TPIE (Tibetan parliament in exile)। লক্ষ্য তীব্বতকে স্বাধীন করা। এরপরই চীন তীব্বত হারানোর ভয়ে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যা শুরু করে।

জম্মু কাশ্মীরে ৩৭০ উঠে যাওয়ার পরও লাদাখের মানচিত্র বদলে যাওয়ায় চীন সরকার প্রমাদ গুনতে থাকে। ভারতের সীমান্ত কৌশলে দখল না করলে তীব্বত হাতছাড়া হতে পারে এই ভয় চীনকে বর্তমানে মরীয়া করে তুলেছে। তীব্বত হারালে সমস্ত জলের উৎস হারাবে যা চীনকে কৃষিতে দুর্বল অর্থনৈতিক ভাবে শেষ করে দেবে। সে কারণেই চীনের ভারতের সীমান্ত দখলের রাজনীতি বলে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

বিশ্লেষকরা আরও বলেছেন যে লাদাখ সীমান্তে গলোয়ান উপত্যকায় ভারত যেভাবে কাঠামো বিস্তার করছে তাতে ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছে চীন সরকার এবং এই বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি চীন। সীমান্ত নিয়ে চীন ও ভারতের বিরোধ অনেক দিন ধরে চলে এলেও গত বছর দশেক ধরে সীমান্তে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রাক প্রস্তুতি হিসেবে ভারতের তৈরি করা অবকাঠামো উদ্বিগ্ন করে তুলেছে চীনকে। ভারতে মোদী সরকরের ক্ষমতায় আসা এবং তার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের রাজনৈতিক ও সামরিক নৈকট্যও চীনের ভয়ের কারণ হয়ে দাড়ায়।

নেপালের সঙ্গে ভারতের বিবাদের কারণ

ভারতের তিনটি ভূখণ্ড – উত্তরাখণ্ডের লিম্পিয়াধুরা, কালাপানি ও লিপুলেখকে নিজেদের দাবি করে নয়া মানচিত্র তৈরি করেছে নেপাল সরকার। বিতর্কিত সেই মানচিত্রে সবুজ সংকেত দিয়েছে নেপালের সংসদের উচ্চকক্ষ। এর পর বাকি রাষ্ট্রপতির অনুমোদন। সেটি হয়ে গেলেই নেপালের সমস্ত রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক কাজে নয়া এই মানচিত্র ব্যবহৃত হবে।

গত বছর ভারত নতুন একটি রাজনৈতিক মানচিত্র প্রকাশ করে যেখানে এই বিতর্কিত ভূমি দু’টি ভারতের হিসেবে দেখানো হয়। আর গত ৮ মে লিপুলেখ গিরিপথ থেকে কৈলাস মানস সরোবরে যাওয়ার নয়া ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তার উদ্বোধন করেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। এর পরেই ভারত এবং নেপালের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়।

এই রাস্তা উদ্বোধনের প্রতিবাদ জানায় কাঠমান্ডু। নেপালের মতে ১৮১৬ সালের সুগাউলি চুক্তি অনুসারে মানচিত্র তৈরি হয়েছে কিন্তু সেই মত মানতে নারাজ ভারত কারন দিল্লির অভিযোগ এই মানচিত্রে আছে ভারতের কিছুটা অংশ।

এক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো মে মাসেই বিতর্কিত ভূখণ্ড কালাপানি আর লিপুলেখকে নিজেদের মানচিত্রে যোগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল নেপাল সরকার। এক্ষেত্রে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক কাকলি সেনগুপ্ত বিবিসি-কে বলেন নেপালের নতুন মানচিত্র প্রকাশের পেছনেও চীনের প্রভাব কাজ করতে পারে। কালাপানি, লিপুলেখ এবং লিম্পিয়াধাউরা ভারত, নেপাল ও চীন এই তিন দেশের একটি সংযোগস্থল, যাকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে বর্তমান পরিস্থিতির জন্য চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা প্রভাব ছাড়াও ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিরও অনেক দোষ আছে। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ পার্থসারথি ঘোষ বিবিসি-কে বলেন ২০১৪ সালের আগে যতবার প্রধানমন্ত্রী বিদেশ ভ্রমণে গেছেন তা সবই প্রচারের জন্য,তার মধ্যে দূরদর্শিতা ছিলনা। পার্থসারথি ঘোষ আরও বলেন,””প্রধানমন্ত্রী শপথ নেওয়ার পর থেকে তিনি যতবারই বাইরে গিয়েছিলেন তা দেশগুলির সাথে সম্পর্ক ভালো করার উদ্দেশ্যে নয় বরং নিজের দেশের মানুষের কাছে প্রচারের জন্যই।” তিনি আরও বলছেন যে “নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর বিদেশনীতি বেশীরভাগটাই প্রচারসর্বস্ব।”

এই সম্পর্কিত আরও খবর :- 

ভারতের এই ৫ এলাকা দখল করতে চায় চীন

ভারত চীন দুই দেশের ঝামেলার পেছনে রয়েছে এই ৫টি কারণ

চীনকে উচিত শিক্ষা দিতে ভারতের কাছে রয়েছে ৫টি বিকল্প

চীন ভারত যুদ্ধ লাগলে কোন কোন দেশ কার কার পক্ষ নেবে

ভারত-চীন সীমান্তে সেনাদের মধ্যে হাতাহাতি হলেও কখনো গোলাগুলি হয়না কেন

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমন কল্যান লাহিড়ী বলেন যে ভারতে পাশ করানো আইনগুলিকে ভালোভাবে নিচ্ছেনা প্রতিবেশী দেশগুলো। তার মতে এটি বিশ্বায়নের যুগ এবং এই সময় উগ্র জাতীয়তাবাদ কাম্য নয়। ভারত এমন একটা দেশ যা এক সময় জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের অংশ ছিল, বর্ণবৈষম্য এর বিরুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। সেখানে সেই ভারতের কাছ থেকেই উগ্র জাতীয়তাবাদী আইন প্রতিবেশী দেশগুলো আশা করেনি বলেই মনে করছেন তিনি।

এই সমস্যার সমাধান কি হতে পারে?

বিশ্লেষকদের মতে এই সময় বিশ্বের অনান্য দেশগুলির সাথে পৃথকভাবে কথা বলতে হবে ভারতকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের মানুষ ও নেতাদের কিছুজন যুদ্ধের মনোভাব নিয়ে এগোচ্ছেন কিন্তু সেই পথে এখন গেলে নিজেই সমস্যায় পড়তে পারে ভারত। সেইজন্য বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই পথে না গিয়ে কূটনৈতিক ভাবে ভারতকে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।