পুরীর জগন্নাথ মূর্তির হাত নেই কেন?

রথের রশি থেকে প্রবাদ প্রবচন – সবেতেই আছেন জগন্নাথ। হিন্দু ধর্মের অন্যতম জনপ্রিয় দেবতা। উড়িষ্যার খ্যাতি এই জগন্নাথদেবের জন্যই। সঙ্গে আছেন বলরাম ও সুভদ্রা। এই জগন্নাথকেই বলা হয় ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’। কারণ, মূর্তিতে কোনও হাত নেই।

তাছাড়া এই মূর্তির আরও বিশেষত্ব আছে, ভারতের সমস্ত বিগ্রহই কোনও না কোনও ধাতুর তৈরি। একমাত্র পুরীর এই জগন্নাথের বিগ্রহ নিম কাঠের তৈরি। বিগ্রহের আকারও বিচিত্র। চৌকো মাথা, বড় বড় চোখ এবং অসম্পূর্ণ হাত।

এখানেই শেষ নয়। ভারতের মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহের বিসর্জন হয় না। কিন্তু এই জগন্নাথ দেবের মূর্তি বদলানো হয় প্রতি ১২ বছর অন্তর। যাইহোক জগন্নাথের এই অসম্পূর্ণ হাতের পিছনে চলতি অনেক গল্প রয়েছে। কিন্তু আসল কারণটি ভিন্ন।

পুরীর জগন্নাথ মূর্তির হাত নেই কেন?

রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নর অভিলাষ, কলিঙ্গ রাজ্যে ভগবান বিষ্ণুর মন্দির স্থাপিত হবে। কিন্তু কেমন হবে আরাধ্য দেবতার রূপ? সমস্যার কথা রাজা জানালেন সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার কাছে। তখন ভগবান ব্রহ্মা পরামর্শ দিলেন, ভগবান বিষ্ণুর ধ্যান করে তাঁর কাছ থেকে জেনে নিতে হবে বিগ্রহের রূপ। রাজা বসলেন কঠোর তপস্যায়। সাধনায় তুষ্ট হয়ে আবির্ভূত হলেন ভগবান বিষ্ণু।

রাজাকে বললেন, পুরীর সমুদ্রে ভেসে আসবে এক নিমগাছের গুঁড়ি। সেখান থেকেই বানাতে হবে তাঁর মূর্তি। ইষ্টদেবতার নির্দেশমতো রাজা গেলেন নির্দিষ্ট স্থানে। দেখলেন সত্যি সমুদ্রের জলে ভেসে এসেছে নিমগাছের গুঁড়ি। রাজা নিযুক্ত করলেন রাজপ্রাসাদের খাসশিল্পীকে। কিন্তু কিছুতেই সেই দারু থেকে রূপলাভ পায় না দারুব্রহ্ম। যতবারই সেই গুঁড়ি কাটতে যায়, ভেঙে যায় অস্ত্র।

পুরীর জগন্নাথ মূর্তির হাত নেই কেন?

চিন্তায় পড়লেন রাজা। এমন সময়ে তাঁর সামনে ছদ্মবেশে আবির্ভূত হলেন স্বর্গলোকের দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা। বললেন, তিনি তৈরি করবেন দেববিগ্রহ। কিন্তু একটা শর্ত আছে। বিশ্বকর্মা যতক্ষণ কাজ করবেন, তাঁকে কোনওরকম বিরক্ত করা চলবে না।

তিনি রুদ্ধদ্বার হয়ে মূর্তি বানাবেন। সেই দরজা একমাত্র তখনই খোলা যাবে যখন তিনি অভ্যন্তর থেকে বলবেন। ইতস্তত করেও অপরিচিত শিল্পীর এই শর্তে রাজি হয়ে গেলেন রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন। কেটে গেল একপক্ষকাল। রাজা অতিকষ্টে দমন করলেন কৌতূহল।

পুরীর জগন্নাথ মূর্তির হাত নেই কেন?

কিন্তু একদিন হঠাৎই সেই রুদ্ধদ্বারের ওপারে সব নিঃশব্দ। কোনও আওয়াজ নেই। রাজার চিন্তার পারদ আরও ঊর্ধ্বমুখী। তাতে ইন্ধন দিলেন রাজমহিষী গুন্ডিচ্চা। তাঁর অনুরোধে রাজা আর থাকতে পারলেন না। সব নিষেধ অমান্য করে গিয়ে খুলে ফেললেন রুদ্ধদ্বার। মুহূর্তের মধ্যে বুঝলেন কী ভুল করে ফেলেছেন।

রাজাকে দেখামাত্র কাজ বন্ধ করে দিলেন বিশ্বকর্মা। সামনে তখন দাঁড়িয়ে আছে তিন মূর্তি। গাছের গুঁড়ি থেকে বানানো। কিন্তু অসমাপ্ত। বড় বড় চোখ। নাসিকা-নির্মাণ অর্ধসমাপ্ত। কান নেই। নেই পদযুগলও। হাত সবে তৈরি হতে শুরু করেছিল। এবার রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নকে নিজের প্রকৃত পরিচয় জানালেন বিশ্বকর্মা। জানালেন স্বয়ং ভগবান বিষ্ণুর আদেশে তিনি এসেছিলেন। কিন্তু রাজা যেহেতু কৌতূহল নিরসন করতে না পেরে শর্তের খেলাপ করেছেন তাই তিনি আর বিগ্রহ বানাবেন না। এই বলে অদৃশ্য হয়ে গেলেন বিশ্বকর্মা।

আরও পড়ুন :- পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের অবাক করা কিছু বৈশিষ্ট্য ও ইতিহাস

প্রবল অনুশোচনায় যখন রাজা বিলাপ করছেন তখনই দৈববাণী হয় – যে আকৃতির বিগ্রহ তৈরি হয়েছে, সেই বিগ্রহই যেন প্রতিষ্ঠা করা হয়। দৈববাণীর নির্দেশ মতো, রাজা ইন্দ্রদুম্ন সেই বিগ্রহই প্রতিষ্ঠা করেন। পুরী মন্দিরে সেই থেকে এই রূপেই পূজিত হচ্ছেন জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা।