রামায়ণের সীতার অভিশাপে আজও পৃথিবীতে শাস্তি পাচ্ছেন ৪ জন

4902

হিন্দু ধর্মে রামচন্দ্রকে বিষ্ণুর অবতার ও দেবী সীতাকে মা লক্ষ্মীর অবতার বলা হয়। হিন্দু পুরাণ মহাকাব্যে দেবী সীতাকে ত্যাগের প্রতীক বলা হয়েছে। ত্রেতাযুগে পিতৃআদেশ পালন করতে দশরথ পুত্র রামচন্দ্র যখন ১৪ বছরের জন্য বনবাসে গিয়েছিলেন, তখন সীতাদেবীও  রামচন্দ্রের সঙ্গ নিয়েছিলেন। স্বামীর পাশে দাঁড়ানোর জন্য তিনি রাজসুখ হাসিমুখে ত্যাগ করেছিলেন। এরপর ছদ্মবেশে লঙ্কাধিপতি রাবণ কর্তৃক সীতাহরণ হয় এবং সীতা দেবীকে উদ্ধার করবার জন্য রাম রাবণের যুদ্ধ হয় আর রাবণ ও তার রাক্ষসকুল পরাজিত হয়। এই সমগ্র ঘটনায় বর্ণিত আছে রামায়ণ নামক মহাকাব্যে।

তবে বলা হয় যে রাবণ বধের জন্য রাম রাবণের যুদ্ধ ও সীতা হরণের ঘটনা আগে থেকেই পূর্বপরিকল্পিত ছিল। সমস্ত ঘটনা জানতে পেরে আগে থেকেই দেবী সীতা বৈকুণ্ঠধাম চলে গিয়ে ছিলেন এবং নিজের বদলে ছায়া সীতাকে রেখে গিয়েছিলেন। রাবণ‌ও এই ছায়া সীতাকেই অপহরণ করেন এবং রামচন্দ্র ছায়া সীতাকেই উদ্ধার করেন। পরবর্তীকালে অগ্নিপরীক্ষার সময় অগ্নিদেব ছায়া সীতাকে গ্রহণ করে দেবী সীতাকে প্রত্যার্পণ করেছিলেন।

সীতার অভিশাপ

এই সীতাদেবীই একবার ক্রুদ্ধ হয়ে ৪ জনকে অভিশাপ দিয়েছিলেন আর সেই অভিশাপের ফল ভোগ করে আজও কষ্ট পাচ্ছেন সেই চারজন। সেই চারজন‌ কে কে? কেনই বা  সীতাদেবী তাদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে অভিশাপ দিয়েছিলেন জানেন কী?

রাজা দশরথের মৃত্যুর পর দশরথপুত্র রাম ও লক্ষণ পিন্ডদানের সমস্ত সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে চলে যান, তাদের ফিরতে বিলম্ব হ‌ওয়ায় সীতাদেবী নিজেই যাবতীয় বিধি-বিধান মেনে স্বর্গীয় শ্বশুরের পিন্ডদান করেন। হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীতে বলা হয় যে, চালের অভাবে সীতাদেবী বালুকার পিণ্ড প্রস্তুত করেছিলেন এবং দশরথের প্রেতাত্মা সীতাদেবীর হাত থেকে সেই পিণ্ড গ্রহণ করেছিলেন।

হিন্দু শাস্ত্রে মহিলাদের পিন্ডদান নিষিদ্ধ থাকায় এই সমগ্র ঘটনাটি করার সময় সীতাদেবী পুরোহিত,গরু, কাক ও ফল্গু নদীকে সাক্ষী রেখে ছিলেন। তারা সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য সম্মতও হয়েছিলো। এরপর রাম লক্ষণ দুই ভাই ফিরে এলে সীতাদেবী তাদেরকে জানান যে তিনি পিন্ডদান প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন।

সীতাদেবী কেন অভিশাপ দিয়েছিলেন?

একথা শুনে রামচন্দ্র বিস্মিত হয়ে যান তিনি কিছুতেই সম্পূর্ণ বিষয়টা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তখন সীতাদেবী তার চার সাক্ষীকে ডেকে আনেন। কিন্তু চারজনেই রামচন্দ্রের কাছে মিথ্যা সাক্ষ্য দেন এতে রেগে গিয়ে সীতাদেবী চারজনকে অভিশাপ দিয়েছিলেন।

সীতার অভিশাপ কী ছিল?

রামচন্দ্র যখন চার সাক্ষীকে জিজ্ঞেস করেন যে পিন্ডদান কাজ সু-সম্পন্ন ভাবে হয়েছে কিনা তখন চারজনই অস্বীকার করেন। এরপর সীতাদেবী চারজনকে অভিশাপ দিয়েছিলেন। সবশেষে বটগাছ রামচন্দ্রের কাছে সীতাদেবীর হয়ে সত্য সাক্ষ্য প্রদান করেছিল তাকে খুশি হয়ে আশীর্বাদ করেছিলেন সীতাদেবী। সেই অভিশাপ এবং আশীর্বাদ আজও ফলপ্রসূ হয়ে আছে। চারজনকে কী কী অভিশাপ দিয়েছিলেন সীতাদেবী  আর সত্য সাক্ষ্য প্রদানকারী বট গাছকেই বা কী আশীর্বাদ দিয়েছিলেন তা সবিস্তারে জানানো হলো

পুরোহিতকে দেওয়া সীতার অভিশাপ

রামচন্দ্রের কাছে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য সীতাদেবী পুরোহিতকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, তোমাদের দারিদ্র কখনো ঘুচবেনা। পুজোর পরে তোমরা যা কিছু দক্ষিণা পাবে তা দিয়ে তোমাদের আশা কখনো পূরণ হবে না। সেই থেকে অভাব  পুরোহিতের নিত্যসঙ্গী হলো।

ফল্গু নদীকে দেওয়া অভিশাপ

সীতাদেবী ফল্গু নদীকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে এই নদী সারাবছর শুকনো থাকবে এমনকি বর্ষাকালেও এই নদীতে খরা হবে। সেই থেকে ফল্গু নদী অন্তঃসলিলা।

কাককে দেওয়া অভিশাপ

সীতাদেবী কাক কে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, তোমরা কখনো পেট ভরে খেতে পারবে না। সবসময় মারামারি করে তোমাদের খেতে হবে এবং কখনও কখনও খাওয়ার জন্য তোমাদের মৃত্যু ঘটবে। সেই থেকে কাকেদের পেট কখনো ভরে না। তারা খাওয়ার জন্য সব সময় মারামারি করে।

গরুকে দেওয়া অভিশাপ

সীতাদেবী গরুকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, তুমি চির পূজ্য হয়ে থাকলেও তোমাকে সকল বাড়ির মানুষের এঁটো খাবার খেতে হবে। এই অভিশাপের ফলে আজ‌ও গরুকে উচ্ছিষ্ট খেতে হয়।

বট গাছকে দেওয়া সীতার আশীর্বাদ

সীতাদেবীর পিন্ডদানের ঘটনার সাক্ষ্য দিয়েছিলেন বটগাছ। সেই গাছকে আশীর্বাদ করেছিলেন সীতাদেবী যে, এখানে কেউ পিন্ডদান করতে আসলে তারা তোমাকেও পুজো করে সুতো বেঁধে দেবে। সেই থেকে কেউ তীর্থে গেলে বৃহৎ বট গাছে জল দেয়। বলা হয় যে তীর্থের বৃহৎ বট গাছে জল দিয়ে পুজো করলে ব্যক্তির সকল মনস্কামনা পূর্ণ হয়।