বিজেপি নাকি তৃণমূল বাংলা জিতবে কে? ইতিহাস কি বলছে

সামনেই বাংলার বিধানসভা ভোট (Bidhansava Election)। ইতিমধ্যেই ভোট পূর্ববর্তী উত্তেজনা শুরু হয়েছে রাজ্য জুড়ে। বিজেপির (BJP) তরফ থেকে বারবার চ্যালেঞ্জ ছোড়া হচ্ছে যে আসছে বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে শাসন ক্ষমতায় আসবে বিজেপি, পদচ্যুত হবে বর্তমান শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস (TMC)। একদিকে বিজেপি (BJP) নেতা মুকুল রায় বলছেন, তিন অংকে পৌঁছাতে পারবে না তৃণমূল কংগ্রেস, অন্যদিকে তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, দুই অঙ্কের সংখ্যাও পার করতে পারবে না বিজেপি (BJP)।

অন্যদিকে প্রশান্ত কিশোর প্রশান্ত কিশোর বলেছেন, বিজেপি দুই ডিজিট পেরোবে না। অর্থাৎ তিন ডিজিট হবে না ১০০-র মধ্যে্ই সীমাবদ্ধ থাকবে। পিকের সেই দাবি উৎখাত করে অনুব্রত বলেছেন, অনেক বেশি বলে ফেলেছেন প্রশান্ত কিশোর। প্রশান্ত কিশোরের ওই বার্তা ভাইরাল হওয়ার পর পাল্টা দেন কৈলাশ বিজয়বর্গীয়ও। বিজেপি নেতাদের কটাক্ষের জবাবে প্রশান্ত বলেছেন, আমি বলেছি বিজেপি তিন ডিজিটে পৌঁছালে আমি রাজনীতি ছেড়ে দেব। কিন্তু আমি যা বলছি, তা যদি হয় কৈলাশ বিজয়বর্গীয়রা রাজনীতি ছেড়ে দেবেন তো!

কিন্তু কি বলছে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ইতিহাস? গত পঞ্চাশ বছরের বাংলার বিধানসভার ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে বাংলার বিধানসভা নির্বাচনে যখনই যে দল জিতেছে সেই দলই ২০০ এর গণ্ডি পার করে জিতেছে। তবে এর ব্যতিক্রম ঘটেছে একবারই, ২০০১ সালে। তবে সেটাকেও ঠিক ব্যতিক্রম বলা যায়না কারণ সেইবার ১৯৯ আসনে জিতেছিল বামফ্রন্ট (CPIM)। একনজরে দেখে নিন পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের ইতিহাস কেআই বলছে

১৯৭২ সালের বিধানসভা নির্বাচন

সেই সময় রাজ্যে আসন সংখ্যা ছিল ২৮০। সেই সময় ৪৯.৮০ শতাংশ আসন অর্থাৎ ২১৬টি আসনে জিতেছিল কংগ্রেস। সেই বছর সিপিআই পায় ৮.৩৩ শতাংশ ভোট এবং সিপিএম পায় ২৭.৪৫ শতাংশ ভোট। অর্থাৎ দুই দল মিলিয়ে বামরা পায় ৪৯টি আসন।বাকি দলগুলি মোট জিতেছিল ৬টি আসন।

১৯৭৭ সালের বিধানসভা নির্বাচন

এই বছরই রাজ্যে বিধানসভা পদের সংখ্যা বেড়ে হয় ২৯৪ এবং ম্যাজিক নম্বর হয় ১৪৭।সে বার বাংলায় ওঠে বাম ঝড়।বামেরা সেইবার বাংলায় পায় ২৩১টি আসন যার মধ্যে শুধু সিপিএম জিতেছিল ১৭৮টি।জনতা পার্টির সাথে জোট থাকলেও মাত্র ২০টি আসনে জিতেছিল কংগ্রেস, এবং জনতা পার্টি জিতেছিল ২৯টি আসনে। তখন থেকেই বাংলায় বামফ্রন্ট দুর্গ গড়ে ওঠে।

১৯৮২ সালের বিধানসভা নির্বাচন

আগের বারের থেকে আরও ৭টি আসন এবার বেশী পেয়েছিল বামফ্রন্টরা।সেবার বামফ্রন্ট ২৩৮টি আসনে জিতেছিল এবং এদের মধ্যে ১৭৪টি আসন জিতেছিল সিপিএম।কংগ্রেস পেয়েছিল ৪৯টি আসনে এবং কংগ্রেস (সোসালিস্ট) পেয়েছিল মাত্র ৪টি আসন।এই নির্বাচনটি হয়েছিল ভারতে বিজেপি প্রতিষ্ঠা হওয়ার মাত্র ২বছর পরে। এই নির্বাচনে বিজেপি পেয়েছিল মাত্র ০.৫৮ শতাংশ ভোট।

১৯৮৭ সালের বিধানসভা নির্বাচন

এইবার নির্বাচনে সিপিএম একাই ১৮৭টি আসনে জিতেছিল এবং বামফ্রন্ট পেয়েছিল মোট ২৫১টি আসন। সেইবার মাত্র ৪০টি আসন পেয়েছিল বামফ্রন্ট।অন্যদিকে বিজেপি সব মিলিয়ে পুরো বাংলায় পেয়েছিল মাত্র ১,৩৪, ৮৫৭টি ভোট।

১৯৯১ সালের বিধানসভা নির্বাচন

এই বছর বামেরা মোট ২৪৫টি আসনে জিতেছিল। সিপিএম জিতেছিল ১৮২ টি আসন এবং কংগ্রেস জিতেছিল ৪৩টি আসনে।কিন্তু এইবারের ভোটে বাংলায় রাম মন্দির আন্দোলনের প্রভাবে বিজেপির ভোট একলাফে বেড়ে ১১.৩৪ শতাংশ হয়ে যায়।

৯৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন

এই ভোটে বিজেপি পেয়েছিল ৬.৪৫ শতাংশ ভোট। তবে এইবার নির্বাচনে কংগ্রেসের আসন সংখ্যা বেড়ে ৮২টি হয় এবং বামেরা জিতেছিল ২০৩টি আসন।

২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচন

এই নির্বাচনেই জোট হয় দুই দল,কংগ্রেস এবং তৃণমূল কংগ্রেস। তবে তা সত্বেও ১৯৯ টি আসন পায় বামফ্রন্ট।তৃণমূল পায় ৬০ টি এবং কংগ্রেস পায় ২৬ টি আসন। কোনও আসন বাংলায় পায়নি বিজেপি।

২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন

মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের শিল্পায়নের স্লোগানে ২৩৫টি আসন জিতেছিল বামেরা। কংগ্রেস জেতে ২১ টি আসন এবং তৃণমূল জিতেছিল মাত্র ৩০টি আসনে।বিজেপির হাত ছিল এবারও খালি।

২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচন

এই সেই ঐতিহাসিক বছর যে বছরে বাংলার চৌত্রিশ বছরের বাম শাসনের পতন ঘটেছিল।এই বছরেই তৃণমূল এবং কংগ্রেসের মহাজোট হয় এবং দুই দল ২২৭ টি আসনে যেতে যার মধ্যে এক তৃণমূল যেতে ১৮৫টি আসন এবং কংগ্রেস পায় ৪২টি আসন।সেই বছর ৪০ টা আসনে জিতেছিল সিপিএম। তবে এই বছরেও তেমন কিছুই হাতে আসেনি বিজেপির।

২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন

এই বছরে বিজেপি ১০.১৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিল অর্থাৎ ৩ টি আসনে জিতেছিল।অন্যদিকে এই বছরে কংগ্রেস এবং তৃণমূল কংগ্রেসের জোট থাকলেও একা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল ২০০ আসন পেরিয়ে পেয়েছিল ২১১ টি আসন।কংগ্রেস পায় ৪৪ টি আসন এবং ৩৩টি আসন পেয়েছিল বামেরা।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে এই বছরে রীতিমত হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে চলেছে তৃণমূল এবং বিজেপির।২০১৯ সালে লোকসভা ভোটে দেখা গেছে কম বেশী ৪০ শতাংশ ভোট পেয়েছে।সুতরাং বিধানসভার ক্ষেত্রেও এই ফারাক খুব কম থাকবে বলেই মনে করছেন তারা। কিন্তু বাংলার ইতিহাস বলছে ভোট শতাংশের ব্যবধান কম হলেও আসন সংখ্যার ব্যবধান হবে খুব বেশী।এবার ফলাফল কি হবে তা জানা কেবল সময়ের অপেক্ষা।