ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা কেমন? দায়িত্বে কারা? কতটা শক্তিশালী তারা?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক এবং কেবিনেট সচিবালয়ের একটি বৈঠকের পর ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের এসপিজি নিরাপত্তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এবার থেকে শুধুমাত্র জেড প্লাস নিরাপত্তা পাবেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন আরপিএফ। এরপর দেশে মাত্র চারজন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কংগ্রেস সভাপতি সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এসপিজি নিরাপত্তা পাবেন।

ভারতে সুরক্ষা বাহিনীর দায়িত্বে কারা থাকেন ?

ভারতের সাতটি নিরাপত্তা বাহিনী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে নিরাপত্তা দেওয়ার কাজ করে। এই বাহিনী গুলি হল বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স, (সিআরপিএফ), কেন্দ্রীয় শিল্প সুরক্ষা বাহিনী, ( সিআইএসএফ), আসাম রাইফেলস, জাতীয় সুরক্ষা গার্ড, (এন এস জি), ইন্দো তিব্বত সীমান্ত পুলিশ (আইটিবিপি) এবং সশস্ত্র সীমা বল (এসএসবি)।

সুরক্ষা বাহিনী কীভাবে তৈরী করা হয়েছিল?

১৯৮৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে তার দেহরক্ষীরা হত্যা করলে রাজীব গান্ধী সরকার প্রধানমন্ত্রী সুরক্ষা কর্মকর্তাদের জন্য একটা বিষয় গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৮৫ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক দ্বারা গঠিত সুপারিশের ভিত্তিতে একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করেছিলেন। প্রাথমিকভাবে এই ইউনিটের নামকরণ করা হয়েছিল বিশেষ সুরক্ষা ইউনিট যা পরবর্তীকালে স্পেশাল প্রোটেকশন গ্রুপ বা এসপিজিতে পরিবর্তিত হয়। ১৯৯১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর হত্যার পর এই আইন সংশোধন হয়। সংশোধনী আইন অনুযায়ী প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে এলপিজির সুরক্ষায় আনা হয়।

ভারতে কতগুলি সুরক্ষা বাহিনী আছে?

এসপিটি ছাড়াও ভারতে ভিআইপিদের সুরক্ষার জন্য অন্যান্য সুরক্ষা বাহিনী আছে। এই বাহিনীকে নিরাপত্তার গুরুত্ব অনুসারে চার ভাগে ভাগ করা হয়। এই বিভাগগুলি হল জেড প্লাস, জেড, ওয়াই এবং এক্স। সুরক্ষা কভারের স্তরে সাথে সাথে নিরাপত্তায় বেশি সংখ্যক অফিসার মোতায়েন করা হয়। জেড প্লাস ক্যাটাগরিতে ভিআইপি সুরক্ষার জন্য থাকে ২৪ থেকে ৩৬ জন অফিসার এবং জেড ক্যাটাগরিতে থাকেন ১৬ থেকে ২০জন অফিসার। এনএসজি এবং ব্ল্যাক ক্যাট কমান্ডো কে সেই সমস্ত ভিআইপিদের সুরক্ষায় নিয়োগ করা হয় যাদের জীবনের অত্যন্ত ঝুঁকি রয়েছে।

বিশেষ সুরক্ষা কখন দেওয়া হয়?

যখন কোন ব্যক্তি রাষ্ট্রের কোন উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত থাকে তখন সরকারি নিয়মে তাদের  বিশেষ নিরাপত্তা দেওয়া হয়ে থাকে। যেমন প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, প্রাপ্তন প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতি , উপরাষ্ট্রপতি ,সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও তাদের পরিবার। এছাড়াও লোকসভার বিরোধী দলের নেতা নেত্রী, বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং অন্যান্য মন্ত্রীরাও পেয়ে থাকে এই সুরক্ষা।

এছাড়াও যদি কোন বিশেষ ব্যক্তি বা শিল্পপতি বা অভিনেতা বা অন্য কোন ব্যক্তি প্রাণ নাশের হুমকি পেয়ে থাকে তাহলে তিনি তা নিকটবর্তী থানায় জানাতে পারেন এবং  পরবর্তীতে তা গুপ্তচর বিভাগের কাছে পাঠানো হয়  ঘটনার সত্যতা জানার জন্য।ঘটনার সত্যতা প্রমান হলে একটি কমিটি গঠন করা হয়। যে কমিটিতে থাকেন সাধারণত কেন্দ্রীয় সরকারের গৃহ মন্ত্রকের সচিব পর্যায়ের কোন আমলা, রাজ্য পুলিশের ডিজি এবং  রাজ্য মুখ্য সচিব। তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে যে ব্যক্তিকে নিরাপত্তা দেওয়া হবে তার সম্পর্কিত তথ্য কেন্দ্রীয় গৃহ মন্ত্রকে পাঠানো হয় অন্তিম অনুমোদন নেওয়ার জন্য।

Z+ সিকুউরিটি কারা পায়?

এই নিরাপত্তা হল দেশের সর্বোচ্চ স্তরের নিরাপত্তা। তাই এই নিরাপত্তা দেওয়া হয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের। যেমন প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার গুরুত্বপূর্ন মন্ত্রীরা। এইসব গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তিদের সমস্ত জায়গার সফরে দেওয়া হয় এই বিশেষ নিরাপত্তা। তাদের সফরসূচি ঠিক করা হয় সকল নিরাপত্তা মাথায় রেখে। এমনকি তারা যদি বিদেশেও যায় তাহলে তাদের সঙ্গে থাকে বেশ কিছু দক্ষ মানের কামান্ডো। আর বাকি দায়িত্ব থাকে তিনি যে দেশে যাচ্ছেন সেই দেশের সরকারের। এদের সফরসূচির যাত্রাপথের পুরো অংশটাই গোপনীয় রাখা হয়।

Z+ সিকুউরিটি তে কি থাকে?

Z+ নিরাপত্তা হল ভারতের কোন ব্যক্তিকে দেওয়া সর্বোচ্চ স্তরের নিরাপত্তা।  এই পর্যায়ের নিরাপত্তা বলয়ে ৫৫ জনের মতো নিরাপত্তাকর্মী বিশেষ ব্যক্তির  নিরাপত্তায় নিযুক্ত থাকে। যাদের মধ্যে  ১০ জনের বেশি থাকে NSG কমান্ডো এবং বাকিরা হয় পুলিশ বাহিনীর বিশেষ দক্ষ  নিরাপত্তা কর্মী।

এই নিরাপত্তায় যেসব NSG কমান্ডো থাকে তারা প্রত্যেকেই  অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র চালাতে দক্ষ এবং মার্শাল আর্টে  এবং হাতিয়ার ছাড়া লড়াই করতেও তারা উচ্চ প্রশিক্ষিত।এই সমস্ত কমান্ডোদের কাছে থাকে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র।যেমন MP5 বন্দুক ,এবং তাছাড়াও থাকে প্রযুক্তিগত উন্নত মানের যোগাযোগ রক্ষাকারী যন্ত্র।

Z+ সিকুউরিটি কারা পায়?

সারা ভারত জুড়ে  ১২ থেকে ১৭ জনের মতো বিশেষ বিশেষ গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তিদের এই Z+ ক্যাটাগরির নিরাপত্তা দেওয়া হয়।বর্তমানে এই শ্রেণীর নিরাপত্তা দেওয়া হয় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী, ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ,বি জে পি দলের সভাপতি অমিত শাহ, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ,কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুন জেটলি ,কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী,সোনিয়া গান্ধী, মনমোহন সিং ,এবং আরও অনেকে।

Z সিকুউরিটি তে কি থাকে?

এই শ্রেণীর নিরাপত্তা হল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্তরের নিরাপত্তা। এই শ্রেণীর নিরাপত্তা বলয়ে  মোট ২২ জনের মতো নিরাপত্তা কর্মী থাকে।যাদের মধ্যে ৪থেকে ৫ জন  NSG কমান্ডো থাকে।আর বাকিরা হয় পুলিশ বিভাগের দক্ষ কর্মী। এই শ্রেণীর নিরাপত্তা বলয়ে ITBP বা CRPF কর্মীরাও থাকেন ।তাছাড়া থাকে একটি এসকর্ট গাড়ি।

ভারতে Z সিকুউরিটি কারা পায়?

যোগগুরু  বাবা রামদেব, বলিউড অভিনেতা আমির খান এবং আরও অনেকেই এই শ্রেণীর নিরাপত্তা পান।

Y সিকুউরিটি তে কি থাকে?

এই শ্রেণীর নিরাপত্তা বলয় হল তৃতীয় স্তরের নিরাপত্তা বলয়।এই শ্রেণীর নিরাপত্তায়  ১১জনের মতো নিরাপত্তা কর্মী নিযুক্ত থাকে যাদের মধ্যে ১থেকে দুই জন NSG কমান্ডো এবং বাকিরা হয় পুলিশের দক্ষ কর্মী। এই শ্রেণীর নিরাপত্তায় দুইজন ব্যক্তিগত নিরাপত্তা অফিসার নিযুক্ত থাকে। ভারতের এই শ্রেণীর নিরাপত্তা দেওয়া হয় অনেককেই।

X  সিকুউরিটি তে কি থাকে?

এই শ্রেণীর  নিরাপত্তা বলয় হল চতুর্থ শ্রেণীর নিরাপত্তা বলয়। এই শ্রেণীর নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ব্যক্তির নিরাপত্তায় ২জন নিরাপত্তা কর্মী থাকে। এক্ষেত্রে কোন NSG কমান্ডো থাকে না। তার বদলে পুলিশ কর্মী থাকে। এদের মধ্যে একজন ব্যক্তিগত নিরাপত্তা অফিসার হয়ে থাকে। ভারতে এই শ্রেণীর নিরাপত্তা অনেককেই দেওয়া হয়।

কীভাবে সুরক্ষা বাহিনী মোতায়েন করা হয়?

এই নিরাপত্তা’র মাত্রা স্থির হয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উপর হামলার আশঙ্কার উপর নির্ভর করে। যাদের ওপর হামলার আশঙ্কা সবথেকে বেশি সেইসব ভিআইপিদের সুরক্ষার জন্য থাকেন এনেরজি ব্ল্যাক ক্যাট কমান্ডো।

বিভিন্ন সরকার বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিরাপত্তা কমায় বাড়ায় তাদের ওপর হামলার আশঙ্কার বার বৃদ্ধির উপর। যেমন ২জি কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশীলকুমার শিন্ডের প্রাক্তন লোকসভার স্পিকার মীরা কুমার সহ ৩০ জন ব্যক্তির সুরক্ষা ২০১৫ সালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। একইভাবে ২০০৯ সালে পি চিদাম্বরম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী থাকাকালীন ভারতের অনেক ভিআইপিদের সুরক্ষার কভার প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৯৮৮ সালের এসপিজি আইন অনুযায়ী ২০১৪ সালে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর ইস্তফা দেওয়ার পর এক বছর পর্যন্ত মনমোহন সিংয়ের এসপি নিরাপত্তা পাওয়ার বৈধতা ছিল। কিন্তু প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিং এবং তার স্ত্রী ঘরের নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির দিক বিবেচনা করে বাৎসরিক ভাবে এসপিজি নিরাপত্তা পুনর্নবীকরণ করা হয়। ১৯৯১ সালে রাজীব গান্ধী হত্যাকাণ্ডের পর যে এসপিজি আইন সংশোধন হয়েছিল সেখানে বলা হয় দেশে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এবং তাদের পরিবারকে ১০বছরের নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে রাখা হবে। কিন্তু পরবর্তীকালে অটল বিহারী বাজপেয়ী আবার এসটিডির কার্যকারিতা বিচার করে তিন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর ( পি ভি নরসিমা রাও, এইচ ডি দেবগৌড়া এবং আইকে গুজরাল)  নিরাপত্তা প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। ২০০৩ সালে আইপিজি আইনে সংশোধন করে বাজপেয়ী সরকার। এই আইনে প্রাক্তন প্রধান মন্ত্রীদের এসপিজি নিরাপত্তা দেওয়ার সময়সীমা ১০বছর কমিয়ে ১ বছর করা হয়।

তবে কোন প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার পরও তাঁর নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিচার করে এক বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও এসপিজি নিরাপত্তা বহাল রাখার সংস্থান করা হয়েছিল এই সংশোধিত আইনে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী পদে ইস্তফা দেওয়ার পরও আমৃত্যু নিরাপত্তার মধ্যেই থেকেছেন।