২৫ লক্ষ টাকার ব্যাগ ফিরিয়ে দিয়ে নজির সৃষ্টি করলেন ওয়েটার রবি

টাকা রোজগারের জন্য মানুষ বেছে নেয় দুই পথ এক সৎ পথে পরিশ্রমের মাধ্যমে তিল তিল সঞ্চয়ের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন, আর অন্য একটি পদ্ধতি হল অসৎ বা আইন বিরুদ্ধ কাজ বা চোরা চালানের সাথে বা চুরি ডাকাতি প্রতারণার সাহায্য নিয়ে অল্প দিনেই আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যাওয়া। বিশ্ব জুড়ে মানুষের মধ্যে যেসব চারিত্রিক অধঃপতন ঘটছে তাতে বর্তমানে সৎ ,সাহসী, ব্যতিক্রমী, প্রতিবাদী, মানবদরদী মানুষ খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। মানুষ এখন তার বিবেক ,বুদ্ধি ,চরিত্র সকলকে অন্ধকারে রেখে অর্থ উপার্জনের পথে সকল প্রকার দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। আর এইসব ঘটার ফলে মানুষের মধ্যে একে অপরকে বিশ্বাস করতে পারছে না। কেমন যেন সন্দেহের চোখে একে অপরকে আজ আমরা দেখি একজন অপরিচিতকে আর একজন অপরিচিত যদি দেখি। আর এর ফলেই মানবতার যে মূল স্তম্ভ যার উপর সকল কিছু দাঁড়িয়েছে অর্থাৎ  ভালোবাসার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু  এত কিছু ঘটার পরও তবুও এমন কিছু সাধারণ মানুষ এখনও খুঁজে পাওয়া যায় যারা সাধারণ হয়েও তাদের অসাধারন কাজের উদাহরণ দিয়ে সকলের সামনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। শুধু তাই নয় মানুষের উপর মানুষের বিশ্বাসকে বজায় রাখতে সাহায্য করেছে। সততা এখনও যে কিছু মানুষের মধ্যে বিদ্যমান তা তাদের কাজের মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে।

এমনই একজন সাধারন মানুষ, যে সামান্য একজন ওয়েটার হয়েও তার সততার মাধ্যমে এক অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছে। তার নাম রবি। তিনি ২৫লক্ষ টাকার এক পলি ব্যাগ পেয়েছিলেন, টেবিল পরিষ্কার করার সময়। এক মিনিটের জন্যেও লোভের বশবর্তী না হয়ে সে তৎক্ষনাৎ সেই টাকার পলিব্যাগ হোটেলের ম্যানেজারের কাছে জমা দিয়ে দেন। ঘটনাটি ছিল এইরূপ।

প্রতিদিনের মতো গত শুক্রবার অর্থাৎ পয়লা জুনের সকাল ১১টার সময় চেন্নাইয়ের” শ্রবন ভবন” নামের এক শীততাপ নিয়ন্ত্রনহীন হোটেলের কামরা ছিল কর্মব্যস্ত। নানা মানুষের আগমনে এবং তাদের খাবারের অর্ডার নেওয়ার জন্য ওয়েটাররা ছিল ব্যস্ত। তারা কালো পোষাক পরিহিত করে বিভিন্ন খাদ্য রসিকদের ঘি মাখানো পঢ়ি, ইডলি  ইত্যাদি পরিবেশন করছিল। সেইসময় ওয়েটার রবি টেবিল পরিষ্কার করার সময়  দেখতে পান দুইজন খাদ্য রসিক তার খাবার খাওয়ার পর বিল জমা দিয়ে চলে যাচ্ছেন। কিন্তু  যাওয়ার পর  তিনি আরও দেখতে পান তারা একটি পলিথিনের ব্যাগ সোফায়  ভুলে চলে গিয়েছেন। রবি তৎক্ষনাৎ ব্যাগ খুলে দেখেন যে ব্যাগ ভর্তি টাকা।তবে ব্যাগ ভর্তি টাকা দেখলেও তাকে নিজের করার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করে নি রবি। সে বিন্দুমাত্র দেরি না করে সেই টাকার থলি হোটেলের ম্যানেজার মি.লনগাঁথান এর  কাছে জমা দিয়ে দেন।

ম্যানেজার টাকার পলিথিন খুলে তা গুনে দেখতে পান, টাকার পরিমান প্রায় ২৫লক্ষ টাকা। এই ঘটনায় “শ্রবণ ভবন” হোটেলের সকল কর্মচারীরা যখন জানতে পারল তখন সবাই স্তম্ভিত হয়ে গেল। তারা সবাই নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে শুরু করেছিল কীভাবে কোন ব্যক্তি এতগুলো টাকা এইভাবে ভুলে চলে যেতে পারে? আর রবিই নিজে না হাতিয়ে নিয়ে তা ম্যানেজারের হাতে তুলে দিয়ে তাদের সকলের মন জয় করেছে। রবি যিনি এই হোটেলের সাথেবিগত ১৩ বছর কাজের মাধ্যমে যুক্ত তার কথায়, “আমরা তাই ঠিক করেছিলাম আমরা সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করবো, যদি ওই খাদ্য রসিকরা তাদের ভুলে যাওয়া টাকার কথা মনে পড়ে আবার ফিরে আসে, তাহলে তাদের সেই টাকার ব্যাগ ফিরিয়ে দেবো। আমরা সবাই অবাক হচ্ছিলাম কী করে তারা এত গুলো টাকার ব্যাগ ভুলে গেল? যদিও সেই দুই গ্রাহক আর ফিরে আসে নি। তাই আমাদের মনে সন্দেহ হয়েছিল টাকাগুলি আসল কী না তা সম্পর্কে। পরে যখন আমরা দেখলাম, টাকাগুলি আসলই। আমরা তখন আর দেরি না করে সেই টাকার থলি আমাদের নিকটস্থ পুলিশ স্টেশনে জমা দিয়ে আসি”।

আর এই ঘটনা যখন জানাজানি হতে লাগল তখন রবির সততার উপর সবাই গর্ব করতে লাগল। তারা সবাই রবিকে একজন প্রকৃত হিরোর মর্যাদা দিতে লাগল। পুলিশের তরফ থেকে রবির এইরূপ অসামান্য সততার জন্য বিশেষ সম্মান জানানো হয়, তাকে সম্মান স্বরূপ একটি  টাইটানের হাত ঘড়ি তুলে দেওয়া হয়।এছাড়াও তার ” শ্রবণ ভবন” এর মালিক নিজে তাকে ডেকে পাঠান তার ম্যানেজারের মাধ্যমে। হোটেল মালিক তথা শিল্পপতি মি. রাজাগোপালন তার কর্মচারী রবির প্রশংসা করেন তার এইরূপ সততার জন্য এবং তিনি নিজে তাকে একটি সোনার আংটি উপহার হিসেবে দান করেন।

রবি আরও জানান যে,”আমরা সাধারণত অনেকবার গ্রাহকদের মোবাইল ,মানি ব্যাগ  ইত্যাদি পেয়ে থাকি এবং তা সবসময় হোটেলের ম্যানেজারের কাছে জমা করে দিয়ে থাকি, পরবর্তী সময়ে তার প্রকৃত মালিক এসে তা ফেরত নিয়ে যায়। আমাদের শিক্ষাই এইরূপ। এইরকম শিক্ষা আমাদের দেওয়া হয় যখন আমাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তবে সবচেয়ে বেশি আশ্চর্যের যে সেই গ্রাহকরা কেন আর ফিরে এল না তাদের টাকার ব্যাগ নিতে।”

সত্যি সমাজে আজও রবির মতো সৎ, নির্লোভী এইরূপ লোক আছে বলে আজও মানুষ তাদের হারিয়ে যাওয়া টাকার বান্ডিল বা ব্যাগ ফিরে পাবার আশায় থাকে। অর্থহীন মানুষরা অর্থহীন হতে পারে ঠিকই কিন্তু তাদের বিবেক সকল রকম ভালো গুণে ভর্তি তা রবির মতো মানুষদের দেখলেই বোঝা যায়।