মা লক্ষ্মী সম্পর্কে কয়েকটি অজানা তথ্য, যা শুনলে চমকে যাবেন

মা লক্ষ্মী হলেন সৌভাগ্য ,সম্পদ এবং সৌন্দর্যের দেবী। তিনি সৃজনী শক্তির প্রতীক, তিনি সৃষ্টিশীলতার রূপ। তিনি যেমন তার রূপের এবং ধনের ও ঐশ্বর্যের মাধ্যমে সকলকে মুগ্ধ করে দেন, তেমনি তার কৃপা যদি সবার ওপর বর্ষিত হয় তাহলে সকলেই ধনলাভ থেকে শুরু করে সকল শুভ কাজে সিদ্ধিলাভ করেন। তাই বলা হয় যার বাড়িতে মা লক্ষ্মী অবস্থান করেন তিনি সকল রকম অর্থকষ্ট,ধনহীন অবস্থা, দুঃখ এবং হতাশা থেকে মুক্তি পান। মা লক্ষ্মী খুবই চঞ্চলা অর্থাৎ এক জায়গায় তিনি বেশিক্ষণ স্থায়ী ভাবে থাকতে পারেন না। তাই মা লক্ষীকে ঘরে স্থায়ীভাবে রাখতে গেলে আমাদের করতে হয় বেশ কিছু নির্দিষ্ট পদ্ধতি। যে সব পদ্ধতি অবলম্বন করলে এবং মা লক্ষ্মীকে শুদ্ধ মনে শুদ্ধ বস্ত্রে ভক্তিভরে পূজা করলে তবে তিনি ভক্তদের ঘরে স্থায়ীভাবে অধিষ্ঠান করেন।

প্রথমত মনে রাখতে হবে মা লক্ষ্মী যদিও ধনের দেবী কিন্তু তিনি অবশ্যই প্রথমে মর্যাদা দেন কর্মকে অর্থাৎ কর্ম না করে যদি কেউ ধনের আশা করেন তাহলে কিন্তু মহালক্ষ্মী তার ওপর কৃপা বর্ষণ করেন না। তাই প্রথমেই আপনার কর্মের প্রতি সততা রাখতে হবে। এছাড়াও কর্ম যেমন মা লক্ষ্মীর কাছে অন্যতম প্রধান বিষয় তেমনি জ্ঞান লাভ করা এবং সত্যের পথে চলাও মা লক্ষ্মীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অর্থাৎ যে সব ভক্ত সত্যপথে এবং সঠিক জ্ঞান অর্জন করে ধন লাভের আশা করেন তারাই মা লক্ষ্মীর কৃপা লাভ করেন। এমনিতে আমরা অনেকেই জানি মা লক্ষীকে দেবী নারায়নী বলা হয়ে থাকে ।অর্থাৎ মা লক্ষ্মী কে আমরা জানি ভগবান নারায়নের পত্নী হিসাবে। কিন্তু বিভিন্ন রকম পুরান ঘাটলে এবং পৌরাণিক গ্রন্থ থেকে দেখা যায় মা লক্ষ্মীর উৎপত্তি সম্পর্কে নানান তথ্য এই সকল তথ্য আজ আমরা সকলের সামনে তুলে ধরবো এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে

ভারতীয় বিভিন্ন পুরাণ ঘাঁটলে দেবী লক্ষীর উৎপত্তি সম্পর্কে নানান তথ্য পাওয়া যায়। এই সমস্ত তথ্য একদিকে দেবী লক্ষীর উৎপত্তি সম্পর্কে আমাদের নানান দিক তুলে ধরে, তেমনই দেবী লক্ষ্মীর সৃষ্টি এবং কল্যাণকর রূপকেউ সকলের সামনে তুলে ধরে।বিষ্ণু পুরাণ, পদ্মপুরাণ, গরুর পুরান এবং বায়ু পুরাণ অনুযায়ী যে সকল তথ্য আমরা পাই সে সকল তথ্য আজ আমরা তুলে ধরব মা লক্ষ্মীর উৎপত্তি সম্পর্কে।

গড়ুর পুরান এবং বায়ু পুরাণ অনুযায়ী আমরা যা তথ্য পায় তা হল দেবী লক্ষ্মী হলেন প্রসূতি গর্ভে দক্ষকন্যা অর্থাৎ দক্ষ রাজার পত্নীর সন্তান রূপে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। এছাড়াও তাকে খ্যাতির গর্ভে ভৃগু কন্যারূপেও জন্ম গ্রহণ করতে অনেক পুরাণে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও আর একটি প্রচলিত গল্প অনুযায়ী আমরা জানতে পারি ভগবান নারায়ণের পত্নী লক্ষ্মীর উৎপত্তি সম্পর্কে ।এই গল্প অনুযায়ী একবার মুনি দুর্বাসা তার নিজে বরযুক্ত পারিজাত মালা প্রদান করেন দেবরাজ ইন্দ্রকে। দেবরাজ ইন্দ্র সেই মালার গুরুত্ব অনুধাবন করতে ব্যর্থ হন এবং তিনি তখন সেই মালা তার বাহন ঐরাবত কে পরিয়ে দেন। কিন্তু ঐরাবত সেই মালা তার শুড়ে করে মাটিতে ফেলে দেন এবং পরবর্তী সময়ে পদদলিত করেন। তখন তার বরযুক্ত মালা মাটিতে পদদলিত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে মুনি দুর্বাসা প্রচন্ড ক্রুদ্ধ হন।  দেবরাজ ইন্দ্রকে তিনি অভিশাপ প্রদান করেন যে তিনি তার শ্রীযুক্ত মালা ইচ্ছাকৃতভাবে বর্জন করার জন্য তার তিনলোক  লক্ষীছাড়া হবে।  ঋষি দুর্বাসার মুখ থেকে এই অভিশাপ বাণী নিঃসৃত হলে মা লক্ষ্মী দেবরাজ ইন্দ্রের দেবলোক পরিত্যাগ করে পাতাল লোকে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করলেন। পরবর্তী সময়ে দেবতা এবং অসুর মিলে যখন সমুদ্র মন্থন করেন তখন  সমুদ্রগর্ভ থেকে দেবী লক্ষ্মী পুনরায় উত্থিত হন এবং দেবতারা পুনরায় তাকে ফিরে পান ।

অন্য একটি কাহিনী অনুযায়ী দেবী লক্ষ্মীর সমুদ্রগর্ভ থেকে উত্থানের পূর্বে দেবী সরস্বতী সমুদ্রগর্ভ থেকে উত্থান করেন অর্থাৎ দেবী সরস্বতী প্রথমে আবির্ভূত হন এবং এই দেবী সরস্বতী থেকে সমস্ত ঋষিগণ এবং দেবতারা জ্ঞান লাভ করেন। তখন মহর্ষি ভৃগু এক প্রশ্ন সকলের সামনে উপস্থাপন করেন ।তিনি জানান ,”আমরা সকলেই তো দৈব জ্ঞান লাভ করেছি, কিন্তু জ্ঞান লাভ করলেই আমরা আমাদের ক্ষুধা তো নিবারণ করতে সক্ষম হচ্ছি না। অর্থাৎ আমাদের ক্ষুধা নিবারণ করতে হবে, নইলে সকলের যে অকাল মৃত্যু ঘটবে।” তাই তিনি সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন ক্ষুধার অর্থাৎ অন্নের দেবী এবং শষ্যের দেবীর সন্ধানে। এইভাবে সন্ধান করতে করতে তিনি শস্যের দেবী অর্থাৎ অন্যের দেবী লক্ষ্মীর সন্ধান পান।

এছাড়াও কিছু পুরাণ অনুযায়ী পাওয়া তথ্য অনুযায়ী দেবী লক্ষ্মী দেবসেনাপতি কার্তিক এর পত্নী রূপে আবির্ভূত হন বলেও জানা যায়। এছাড়াও জানা যায় শাস্ত্রমতে ভগবান বিষ্ণু যখন বামন রূপে পৃথিবীতে অবতার নেন, সেই সময় দেবী লক্ষ্মী লাল পদ্ম থেকে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

এছাড়াও জানা যায় ভার্গ যখন রাম রূপে জন্মগ্রহণ করেন তখন দেবী লক্ষ্মী তার ঘরনী রূপে অধিষ্ঠান করেছিলেন। অর্থাৎ তিনি রামায়ণে সীতা রূপে আবির্ভূত হন এবং পরবর্তী সময়ে ভগবান বিষ্ণু যখন কৃষ্ণ রূপে অবতার নেন তখন তিনি রুক্মিণী রূপেও আবির্ভূত হয়েছিলেন বলে জানা যায়।

এছাড়াও তাকে ভগবান শ্রী হরির বক্ষ স্থলে অধিষ্ঠাত্রী হরিপ্রিয়া নামেও অবতীর্ণ হতে শোনা যায়। দেবী লক্ষ্মীর যে স্বাভাবিক রূপ আমরা দেখতে পা তাতে আমরা দেখতে পাই তিনি কখনও  দুই হাতে অবতীর্ণ হয়েছেন আবার কখনো তিনি চতুর্ভূজা অর্থাৎ চার হাতে অবতীর্ণ হয়েছেন। যখন তিনি দুই হাতে অবতীর্ণ হয়েছেন তখন তার এক হস্ত জ্ঞান এবং অন্য হস্ত কর্মকে সূচিত করে। চতুর্ভূজা অবতারে তার চারটি হাত নির্দেশ করে জ্ঞান, অর্থ ,কর্ম এবং মোক্ষকে।

দেবীকে আমরা দেখতে পাই কখনো এক লক্ষী রূপে আবার তিনি অনেক জায়গায় অষ্টলক্ষী রূপে অবস্থান করেন। দেবীর অধিষ্ঠান আমরা দেখতে পাই পদ্ম ফুলে বিল্ব পত্রে এবং হস্তী কপালে,এবং গোমাতার পৃষ্ঠে এবং মানুষের অঙ্গুলি শীর্ষেও দেবী লক্ষ্মী অবস্থান করেন। এছাড়াও আরেক মত অনুযায়ী জানা যায় দেবী লক্ষ্মী গোমুত্রে এবং গোময় অধিষ্ঠান করেন ।এই গল্পটি যা জানা যায় তা হল, গোমাতার মধ্যে সকল দেব দেবীর অধিষ্ঠান করেন। সেই রকমই দেবী লক্ষ্মীও গোমাতার মধ্যে অধিষ্ঠান করতে চান, কিন্তু দেবী লক্ষ্মী চঞ্চলা হওয়ার দরুন গোমাতা তাকে তার দেহে অধিষ্ঠান করতে জায়গা দেন না ।তাই দেবী লক্ষ্মী এক প্রকার বাধ্য হয়ে গোমূত্র এবং গোময় অবস্থান করেন।

অর্থাৎ দেবী লক্ষ্মীর উৎপত্তি সম্পর্কে আমরা যে সকল তথ্য দেখলাম তা যেমন এক ক্লিকে বিভিন্ন বৈচিত্রে ভরা তেমনি পুরান যুগে দেবী লক্ষ্মীর নানারকম উৎপত্তি আছে সেটাও এক প্রকার জানা যায়।

বাড়িতে দেবী লক্ষ্মীর কিরকম ছবি রাখা উচিত?

এর সম্পর্কে যা তথ্য জানা যায় তা হলো, দেবী লক্ষ্মীর বাহন রূপে পেঁচা যে সমস্ত ছবিতে আছে ,সে সমস্ত ছবি অবশ্যই রাখবেন। তবে পেঁচা যেন দেবী লক্ষ্মীর ঊর্ধ্বে অবস্থান না করে ।দেবী লক্ষ্মীর পদপৃষ্ঠ সন্মুখে যেসব ক্ষেত্রে পেঁচার ছবি পাওয়া যায়, সেসব দেবী লক্ষ্মীর ছবি বাড়িতে রাখা উচিত।

পেঁচার উপর অধিষ্ঠাত্রী অবস্থায় থাকা লক্ষ্মীর ছবি বাড়িতে রাখবেন না। অর্থাৎ যেসব ছবিতে দেবী লক্ষ্মী পেঁচা উপর বসে আছে সেসব ছবি বাড়িতে রাখবেন না তাতে বাড়িতে দৈন্যদশা বাড়বে।

বাড়ি থেকে অলক্ষী যেভাবে তাড়াবেন

যেসব বাড়িতে সদায় ঝগড়া, কলহ এবং বাড়ির সদস্যদের মধ্যে পারস্পারিক মতবিরোধ লেগে থাকে সেসব বাড়িতে লক্ষ্মী অধিষ্ঠান করেন না। অর্থাৎ বাড়ি থেকে অলক্ষী তাড়াতে হলে আপনার বাড়ির সকল সদস্যদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ মনোভাব থাকতে হবে এবং বাড়ির মধ্যে অশান্তি কলহ এবং ঝগড়াঝাটি যেন না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে।

সৎ পথে অর্থ উপার্জন এবং সঠিক কর্ম করলে বাড়ি থেকে অলক্ষী বিতাড়িত হয় অর্থাৎ আপনি যদি অসৎ উপায়ে লক্ষ লক্ষ টাকা রোজগার করছেন তাহলে জানবেন যদিও আপনার বাড়িতে লক্ষ্মী অধিষ্ঠান করছে কিন্তু সেই লক্ষ্মী অল্প সময়ে আপনার বাড়িতে অধিষ্ঠান করবে অর্থাৎ বিপদের সময় আপনি সেই লক্ষ্মীলাভ করতে পারবেন না তাই সৎ পথে অর্থ উপার্জন করুন তবে বাড়িতে মা লক্ষ্মী অধিষ্ঠান করবেন।

আরও পড়ুন : কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর খুঁটিনাটি; কি কি করবেন আর কি কি করবেন না

নারী জাতির সম্মান করলে বাড়িতে লক্ষ্মী অবস্থান করেন অর্থাৎ নারী জাতি রূপে পূজিত মা, স্ত্রী,  কন্যা সন্তান, বোন বা  সকল নারী জাতিকে তাদের সকল উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করলে বাড়িতে মা’র লক্ষ্যে অধিষ্ঠান করবেন।

দেবী লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা কেন?

দেবী লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা সম্পর্কে যে তথ্য পাওয়া যায় পেঁচা হল নিশাচর প্রাণী। দেবী লক্ষ্মী পেঁচাকে তার বাহনরূপে রেখেছেন কারণ পেঁচা শুধুমাত্র আপন কর্ম নিয়ে থাকেন তার সাথে অন্যান্য প্রাণীদের বা অন্য কারো সেইরূপ ভালোবাসার সম্পর্ক দেখা যায় না। তেমনই দেবী লক্ষ্মী সকল মানুষকে বোঝাতে চেয়েছেন আপন কর্মে নিয়োজিত থাকলে জীবনে সফলতা লাভ করা যায়।

যদিও অনেকের মতে প্যাঁচার সাথে দেবী লক্ষ্মী সকল ধর্মের বৈসাদৃশ্য রূপ দেখা যায় ।দেবী লক্ষী রূপে অতুলনীয়া হলেও তার বাহন পেঁচা যেমন কুৎসিত তেমনি তার দিবা কালে দর্শন পাওয়া যায় না অর্থাৎ পেঁচাকে বাহনরূপে রাখার মাধ্যমে দেবী লক্ষ্মী বোঝাতে চেয়েছেন তার আরাধনা যারা করবে তিনি তাদের সকল কুৎসিত মানসিক অবস্থাকে নিজের কাছে বন্দী করে নেবেন এবং তাদের মধ্য থেকে খারাপ দিক দূর করে ভালো দিক তুলে ধরবেন।

এছাড়াও পেঁচাকে দেবী বাহনরূপে রাখার মাধ্যমে দেবী বোঝাতে চেয়েছেন অন্ধকারকে তিনি আপন শক্তির মাধ্যমে বন্দি করে রেখেছেন। অর্থাৎ সকল প্রকার অন্ধকারের কালিমা দূর করতে হলে দেবীকে আরাধনা করতে হবে ভক্তিভরে।