প্রথম ভারতীয় হিসেবে সাইকেলে চড়ে চাঁদের পাহাড়ে ওঠার কাহিনী

নিজস্ব প্রতিবেদন : প্রথম ভারতীয় হিসেবে সাইকেলে চড়ে চাঁদের পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছালেন বীরভূমের মুখ উজ্জ্বল পাল। উজ্জ্বল পাল এখন বীরভূমকে ছাড়িয়ে সারা ভারত, বিশ্বের মুখ।

সাধারণতন্ত্র দিবসের দিন আফ্রিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ, মাউন্ট কিলিমানজারোর মাথায় পৌঁছে যান তিনি। ২৬ শে জানুয়ারি সকাল ছটায় সাইকেল বাহন ‘চেতক’কে সঙ্গী করে কিলিমাঞ্জারোর সর্বোচ্চ স্থান উহুরু শৃঙ্গে পৌঁছে যান তিনি। উজ্জ্বল পালের এই সাইকেল যাত্রা শুরুতেই আমরা আপনাদের জানিয়েছিলাম তাঁর যাত্রা পথের বিস্তারিত এবং তাঁর কর্মজীবন।

পৃথিবীর সবথেকে পরিবেশবান্ধব যান হলো সাইকেল, তাই চিনের মতো দেশে প্রায় ৮০ কোটি মানুষ সাইকেলের উপর নির্ভরশীল, ভারতবর্ষেও কম নয় সংখ্যাটা প্রায় ৫০ কোটি। তাই এই সাইকেলকে নিয়েই ‘সবুজ বাঁচাও’ অভিযানে বীরভূমের এক সাধারণ সাদামাটা মানুষ, যিনি হলেন উজ্জ্বল পাল। নাম শুনে হয়তো সেভাবে চিনতে পারবেন না, কিন্তু যখন তাঁর কথা শুনবেন তখন মনে মনে ভাববেন পরিচয়টা বিশাল বড়।

পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলেছেন সবুজ বাঁচাও বার্তা নিয়ে তাঁর স্বপ্নের প্রকল্প ‘Green on Wheel’ -এ। শুরুটা ২০১১ সালে সুন্দরবন বাঁচাও এর অভিযান নিয়ে বাংলাদেশ যাত্রার পর থেকে। সেবারও তার সঙ্গী ছিল সাইকেল, সঙ্গে আরো তিন বন্ধু। বাংলাদেশ থেকে ঘুরে আসার পর জীবনের লক্ষ্য এই বানিয়ে নেন ‘গ্রীন অন হুইল’ কে। এরপর অবশ্য পুরোটাই সাইকেলকে সঙ্গী করেই একাই পাড়ি দিয়েছে সাত সমুদ্র পেরিয়ে বিভিন্ন দেশে। এই যাত্রার আগেই তিনি ঘুরে নিয়েছেন বিশ্বের বারোটা দেশ। প্রতিটি দেশে তিনি পৌঁছে দিয়েছেন ‘সবুজ বাঁচাও’ এর বার্তা।

চাকরি সূত্রে বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ, পাহাড়-পর্বতের ঘুরতে যাওয়া এবং অন্যান্য বেশ কিছু স্থানে ঘুরতে যাওয়ার পরে তিনি পরিচিত হয়েছিলেন গ্লোব্যাল ওয়ার্মিং ইত্যাদি বিষয়গুলির সাথে। তারপর তিনি ভাবেন গরু ছাগল অবুঝ প্রাণীরা তো আর গাছ লাগাবে না তারা পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য রেখে জীবন অতিবাহিত করবে। গাছ আমাদেরই লাগাতে হবে, গাছকে বাঁচাতে হবে। এভাবেই শুরু হয়েছিল গ্রীন অন হুইল-এর।

নিজের দেশ ভারতবর্ষে দু বছরের বেশি সময়ই সাইকেলে করে ঘুরেছেন ২২ হাজার কিলোমিটার। ইউরোপের তুরস্ক, গ্রিসের মত কয়েকটি দেশ, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ, আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ ঘুরে এসেছেন সবুজের বার্তা নিয়ে সাইকেলে চেপে।

তিনি জানান “এই সমস্ত দেশে তিনি যাত্রা করেন বন্ধু বান্ধবদের সাহায্য নিয়ে, যুব কল্যাণ দপ্তর থেকে সামান্য কিছু সাহায্য এবার মিলেছে যাতে করে বিমানে যাওয়ার ও আসার খরচ বেরিয়ে যাবে। বাকি খরচ বলতে বিভিন্ন দেশে ভিসা কাটানো, এছাড়া রাস্তার খরচ রাস্তাতেই মিলে যায়। কখনো স্কুলের মিড ডে মিলে খাবার খেয়ে, কখনো কারোর বাড়িতে আশ্রয় পেয়ে, কখনো কোন পুলিশ স্টেশনে আশ্রয় নিয়ে সময় পেরিয়ে যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আবহাওয়ার বিভিন্ন হওয়ায় সেগুলির সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে সফরগুলি অতিবাহিত করতে হয়। অন্যান্য দেশে কখনো কাগজে ছবি, এঁকে কখনো গুগল ট্রান্সলেটরের মাধ্যমে সে সকল মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করি আমি কি চাইছি। তবে প্রাথমিক যে চাহিদা যেমন খাবার, জল, জিনিসের দাম এগুলি বিষয়ে বর্ডারে পৌঁছানোর সাথে সাথেই স্থানীয় ভাষার সাথে পরিচিত হয়ে যায়।”

আরও পড়ুন ঃ ১৫০ দিন সাইকেল চালিয়ে বীরভূম থেকে আফ্রিকা! কারণ জানলে স্যালুট জানাবেন

এতগুলি দেশ, এত বিপুল কিলোমিটার সাইকেলে করে যাত্রা করে আসার পরও তিনি থেমে থাকেননি, থেমে থাকতে চান না। আসলে থেমে থাকবেন কি করে! তাঁর জীবনের সখই তো ‘Green on Wheel’. তাইতো আবার গত ২০১৮ সালের ২৭ শে অক্টোবর তাঁকে হাতছানি দেয় দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ। লক্ষ্য মিশরের রাজধানী থেকে যাত্রা করে শেষ হবে চাঁদের পাহাড়ের গোড়ায়। মাঝে মিশর, সুদান, ইউথোপিয়া, সোমালিয়া, কেনিয়া, রোয়ান্ডা, বুরুন্ডি ইত্যাদির মত ১১ থেকে ১২ টি দেশ তিনি অতিক্রম, হ্যাঁ সাইকেলে চেপে। আর সে স্বপ্নকেও পূরণ করে এবার সাইকেলে চড়ে দেশ ভ্রমনের তালিকায় যোগ হলো আরও কম করে ১১ থেকে ১২ টি দেশ।

আর স্বপ্নকে পূরণ করে প্রথম ভারতীয় হিসেবে আফ্রিকার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছলেন বীরভূমের উজ্জ্বল পাল। উচ্চতম চূড়ায় দাঁড়িয়ে ৭০ তম সাধারণতন্ত্র দিবসে জাতীয় পতাকা ওড়ালেন তিনি। উজ্জ্বল পাল শুধু আমার, আপনার গর্ব নয়, গর্ব গোটা জেলার, গোটা রাজ্যের, গোটা দেশের, সমগ্র পরিবেশের।