লন্ডনের রাস্তায় বাংলার ঝালমুড়ি, ঝড়ের বেগে ছুটছে ঝালমুড়ি এক্সপ্রেস

টেমসের ধারে কোটপ্যান্ট পরে ঝালমুড়ি বেচেন অ্যাঙ্গাস সাহেব। পুরো নাম অ্যাঙ্গাস ডেনুন ডানকান। কর্মসূত্রে এসেছিলেন কলকাতায়। খেয়েছিলেন ঝালমুড়ি। ব্যস, প্রেমে পরে যান মশলামুড়ির টক-ঝাল স্বাদের। এতটাই যে সব ছেড়েছুড়ে এখন নিজেই ঝালমুড়ি বিক্রি করেন ইংল্যান্ডের রাস্তায়।
অ্যাঙ্গাস সাহেব পেশায় লন্ডনের কভেন্ট গার্ডেনের নামজাদা এক রেস্তরাঁর শেফ। বড় হোটেলের রাঁধুনি। বানাতেন দেশী-বিদেশী রকমারি পদ। কিন্তু কলকাতার ঝালমুড়ি তাঁর জীবন বদলে দিল।

 ২০০৪ সালে কাজের সূত্রে অস্ট্রেলিয়া থেকে ব্রিটেনে ফিরছিলেন ডানকান। উড়ানের স্টপওভার ছিল কলকাতা। সেটাই কল্লোলিনীর সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয়। ডানকানের কথায়, ‘কলকাতা সম্পর্কে চিরকাল খারাপ খারাপ কথা শুনে এসেছি। আবর্জনা, পকেটমার, লোডশেডিং। কিন্তু শহরটা ঘুরে দেখতে গিয়ে চমকে গেলাম।’ নিউ মার্কেটে প্রথম খেয়েছিলেন ঝালমুড়ি। এবং প্রথম আস্বাদনেই প্রেম! তবে তখনও ডানকান ভাবেননি, এই ভাললাগাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন। স্ট্রিট ফুডের উপর তথ্যচিত্র বানানোর ইচ্ছে ছিল তাঁর। সেই স্বপ্ন পূরণ করতেই ২০১৪ সালে চাকরি ছাড়েন। সেই বছরেই আবার আসেন কলকাতায়। কিন্তু বিধি বাম! সেই ছবি দিনের আলো দেখেনি। নির্দেশক হিসেবেও কেরিয়ার সাজাতে পারেননি ডানকান। শেষমেশ রান্নার জগতেই ফিরে যান। ঠিক করেন এমন এক ‘ফাস্ট ফুড’ বিক্রি করবেন, যা আর পাঁচটা চটজলদি খাবারের থেকে আলাদা। সেই ফাস্ট ফুড ঝালমুড়ি ছাড়া আর কী-ই বা হতে পারে! কলকাতাতেই শেখেন ঝালমুড়ি বানানোর কৌশল। দেশে ফিরে শুরু করলেন ব্যবসা। মনের কোনে তবু সংশয় ছিল -ফ্রায়েড ফিশে অভ্যস্ত ব্রিটিশ রসনায় কি সাড়া জাগাতে পারবে ঝালমুড়ি! কিন্তু প্রথম দিনেই মারকাটারি বিক্রি। ডানকানের হাতে ঝালমুড়ি খেয়ে সাহেব-বিবিদের জিভে জল। আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।কোনও পাকাপোক্ত দোকান নেই ডানকানের। লন্ডন এবং তার আশপাশের শহরে ঘুরে বেড়ান তিনি। সঙ্গে থাকে ভাড়া। তার ওপর একেবারে কলকাত্তাইয়া স্টাইলে রাখা খোপ খোপ টিনের রেকাবে রাখা মুড়ি, ছোলা, চানাচুর, কড়াই, বাদাম, মশলা, তেল এমনকি কাটা কাগজ পর্যন্ত। তাঁকে ঘিরে ধরে আছেন আট থেকে আশির সাহেব-মেম। আর ডানকান দ্রুত হাতে ছোট হাতা দিয়ে মুড়িতে মেশাচ্ছেন ছোলা আর বাদাম ভাজা। সঙ্গে দিলেন শশা কুচি, পেঁয়াজ কুচি, আদা কুচি, লেবুর রস। দু’-এক ফোঁটা সর্ষের তেলও। তার পর বেশ নেড়েচেড়ে সেটা খবরের কাগজের ঠোঙায় ঢেলে ধরিয়ে দিচ্ছেন খদ্দেরের হাতে।

ইতিমধ্যে লন্ডনের একটি রান্নার রিয়াল্যিটি শো-য়ে অংশ নিয়েছিলেন ডানকান। সেখানেও তাঁর ঝালমুড়ি হিট। শো এর জাজেরা তাঁর মশলা মুড়ি খেয়ে রীতিমতো আঙুল চেটেছেন।
ডানকানের কথায়, ‘কেন আমি ঝালমুড়ি তৈরি করেছিলাম জানেন? কারণ এতে ‘কুকিং’ ব্যাপারটাই নেই। এখন সকলেই আমার কাছে এই ঝালমুড়ির জন্য ভিড় জমান।’ নিজের এই ভ্রাম্যমান স্টলের নাম দিয়েছেন ‘দ্য এভরিবডি লাভ লাভ ঝালমুড়ি এক্সপ্রেস’।

টুইটার অ্যাকাউন্টে জানিয়ে দেন, কখন, কোথায় থাকবেন ‘ঝালমুড়ি এক্সপ্রেস’ নিয়ে। সঙ্গে চাট এবং ভেলপুরিও বিক্রি করেন ডানকান। বিয়ে বা অন্য অনুষ্ঠানেও ডাক পড়ে তাঁর, অতিথিদের ঝালমুড়ি খাওয়ানোর জন্য।

এক মেমসাহেবের হাতে ঝালমুড়ির ঠোঙা তুলে দিয়ে ডানকান বললেন, ‘ভাল স্বাদের কোনও দেশ হয় না। আমার এই ঝালমুড়ি খেলেই তা বুঝতে পারবেন।’