১৬ বছর বয়সে বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ প্রধানশিক্ষক, শিক্ষিত করেছেন ৫০০০ জন শিশুকে

ওরা শিশুশ্রমিক। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় জনবসতির একটা বড় অংশই জীবনধারণের স্বার্থে ছোটবেলা থেকেই বাড়ির বড়দের সঙ্গে কাজে হাত লাগাতে বাধ্য হয়। কেউ বিড়ি বাঁধে, কেউ আবর্জনা কুড়োয়। স্কুল যাওয়া আসার পথে প্রতিদিন এইসব কচিকাঁচাদের দেখত বাবর আলি। আর ভাবত, এরা কেন পড়াশোনার সুযোগ পায় না? শুধুমাত্র অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়ার জন্য এরা লেখাপড়া থেকে বঞ্চিত হবে?

বাবরের তখন মাত্র ১০ বছর বয়স। মুর্শিদাবাদের গাঙপুরের বাসিন্দা। বাড়ি থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে বেলডাঙা সিআরজিএস স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র। স্কুল যাওয়া আসার পথে সমবয়সী ছেলে মেয়েদের কাজ করতে দেখে বাবর ভাবল, নিজে যা শিখেছে সেগুলো এদের শেখালে কেমন হয়?

যেমন ভাবা তেমন কাজ। ২০০২ সাল। নিজের বোন আমিনা খাতুন আর আশপাশের দুঃস্থ পরিবারের ৭ টি বাচ্চাকে নিয়ে, নিজেদের একচিলতে বাড়ির পেছনে একটা পেয়ারা গাছের তলায় শুরু হল স্কুল। নাম, আনন্দ শিক্ষা নিকেতন। বাবরের বাবা পাট ব্যবসায়ী মহম্মদ নাসিরুদ্দিন ৬০০ টাকা দেন বই-খাতা কেনার জন্য। বাবরের বাবা-মাও পড়াশোনা শেষ করেননি। কিন্তু ছেলের এ উদ্যোগে তারা পাশে আছেন। তা নিয়ে মা-বাবার গর্বের শেষ নেই। কারণ একটি শিক্ষিত সমাজ গড়তে লড়ছে বাবর।

 

বাবর সকালে নিজে পড়ে। বিকেলে অন্যদের পড়ায়। ৩ ঘণ্টা। নিজে যা শিখেছে সেটাই অন্যদের শিখিয়ে দেয়। বাবরের এই কীর্তির কথা জানতে পেরে তার স্কুলও পাশে দাঁড়িয়েছে। জানা যায়, মাঝে মাঝেই ক্লাস থেকে চক চুরি হতো। শিক্ষকরা ধরেও ফেলেন, এটা বাবরেরই কাজ। কিন্তু তারা যখন জানতে পারেন, কেন বাবর চক চুরি করে? এর পর থেকে প্রতি সপ্তাহে এক প্যাকেট করে চক স্কুলের শিক্ষকরা বাবরের হাতে তুলে দেন।পরিবার ও স্কুলের চেষ্টায় সেই শিশুদের স্কুলের পোশাক, বই ও অন্যান্য পড়ার সামগ্রী দেয় বাবর। এ ধরনের শিশুর পরিবারের লোকজনদের বোঝাতে সমর্থ হয় বাবর। তারাও স্কুলে পাঠাতে রাজি হন বাচ্চাদের। এইভাবে কেটেছে ৬ বছর।

২০০৯ সালে জুটল স্বীকৃতি। বিবিসি থেকে বাবরকে বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ প্রধানশিক্ষক হিসাবে ঘোষণা করা হয়। পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদও ‘আনন্দ শিক্ষা নিকেতন’কে স্কুল হিসাবে স্বীকৃতি দেয়। আর মাত্র ১৬ বছ বয়সে বাবর আলি হলেন একটি সরকার স্বীকৃত স্কুলের প্রধান শিক্ষক।

 

আনন্দ শিক্ষা নিকেতন স্কুল এখন পেয়ারাতলা থেকে উঠে এসেছে পাকা বাড়িতে। একজন এনআরআই-এর আর্থিক সহায়তায় ৭২০০ বর্গফুট জায়গায় নির্মান হয়েছে স্কুল বাড়ি। ছাত্র সংখ্যাও ৮ থেকে বেড়ে এখন ৮০০ জন। গত ১৬ বছরে প্রায় ৫০০০ জন শিশুকে শিক্ষিত করেছে বাবর।

বেশ কয়েকজন আবার সেই স্কুলেই শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছে। বাবরের স্কুলে গণিত, বিজ্ঞান এবং ভুগোল পড়ানোর ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। আর শেখানোহয় ঝরঝরে বাংলা লিখতে।

বাবর আলির বয়স এখন ২৫ বছর। নিজে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেছে। এখন ইতিহাসে স্নাতকোত্তর স্তরের পড়াশুনো করছে সে। নিজের স্কুল নিয়েও বেশ কিছু পরিকল্পনা রয়েছে বাবরের।

 

শিক্ষকতার পাশাপাশি স্বামী বিবেকান্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত বাবর একজন মোটিভেশনাল স্পিকারও। ইউরোপে, সিঙ্গাপুরের নানা অনুষ্ঠান থেকে বক্তৃতার জন্য ডাক আসে তার কাছে। ‘সত্যমেব জয়তে’ অনুষ্ঠানে তার জীবনী নিয়ে হয়েছে বিশেষ এপিসোড। নিজের জেলার দরিদ্রমানুষদের শিক্ষার হারে পরিবর্তন আনতে চায় বাবর। তার কথায়, ‘সরকার একা নিয়ম বদলাতে পারবে না। সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।’

বাবর আলিকে বিবিসি বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে ঘোষণা করে। এছাড়া ২০০৯ সালে বিবিসির একটি প্রতিবেদনে মাত্র ৯ বছর বয়সে নিজস্ব বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকারী বাবর আলিকে সারা বিশ্বের সামনে তুলে ধরা হয়। ২০০৯ সালে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম সিএনএন-আইবিএন তাকে ‘রিয়েল হিরোজ অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করে। এনডিটিভি তাকে ‘ইন্ডিয়ান অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার প্রদান করে।