গ্রহণে প্রচলিত কুসংস্কার ও তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা

গ্রহণ চলাকালীন সময়ে খাবার গ্রহণ না করা, বাইরে বের না হওয়া, গর্ভবতী মহিলাদের বিভিন্ন বিধিনিষেধ মেনে চলা প্রভৃতি কুসংস্কার প্রচলিত আছে, কিন্তু গ্রহণের সাথে আদৌ কি এসবের কোন সম্পর্ক আছে কি?

গ্রহণ নিয়ে নানা সংস্কার-কুসংস্কার রয়েছে। হোক সেটি সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ। সব গ্রহণকেই অপবিত্রতার চোখে দেয়া হয়।  চন্দ্রগ্রহণ কিংবা সূর্যগ্রহণ নাকি অপবিত্রতা। এই সময়ে অশুভ শক্তির প্রভাব বেড়ে যায় বলে মনে করেন। আর তাতে নাকি বাড়ি, মন্দির সর্বত্রই এর প্রভাব পড়ে।

ফলে গ্রহণের সময় পূজা-অর্চনাও বন্ধ রাখা হয়। গ্রহণ শেষ হলে ঘরবাড়ি পরিষ্কারও করেন অনেকে। এছাড়াও অনেকে গ্রহণ চলাকালীন বাড়ির রান্না ফেলে দেন। গ্রহণ শেষ হওয়ার পরে শুরু করেন রান্নাবান্ন। অনেকে বলেন, গ্রহণ চলাকালীন প্রচুর বিকিরণ পৃথিবীতে চলে আসে। যা মানব দেহের জন্যে খারাপ। তাই গ্রহণের সময় চাঁদের দিকে নাকি সরাসরি তাকানো উচিত নয়।

গ্রহণের সময় গর্ভবতী মহিলাদের কি কি করতে নেই?

  • বাড়ির বাইরে বেরতে নেই। এর ফলে গর্ভস্থ শিশুর ক্ষতি হতে পারে।
  • গ্রহণ চলাকালীন রান্না বা খাওয়া উচিত নয়।
  • সংসারের কোনও কাজ করা উচিত নয়।
  • গ্রহণের সময় কোনও ধারালো বস্তু, যেমন ছুরি, কাঁচি, বঁটি ব্যবহার নৈব নৈব চ। মনে করা হয়, গর্ভস্থ শিশুর শরীরে এর ফলে কাটা দাগ থাকে।

কুসংস্কারের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা

খালি চোখে গ্রহণ দেখলে গর্ভের শিশু বিকলাঙ্গ হয় কেন?

বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা :- পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় যখন চাঁদ সূর্যকে সম্পূর্ণরূপে আড়াল করে ফেলে, তখন এর উজ্জ্বল জোতির্বলয় থেকে তড়িৎচৌম্বক বিকিরণ ঘটতে থাকে। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন যে, এই বিকিরণ সূর্যের আলোর তীব্রতার তুলনায় অত্যন্ত ক্ষীণ। তাই এই বিকিরণ ১৫০ মিলিয়ন কিলোমিটার দূরত্ব পেরিয়ে, পৃথিবীর ঘন বায়ুমণ্ডল ভেদ করে এসে দর্শকের চোখে অন্ধত্ব সৃষ্টি করতে পারার কোনো সম্ভাবনা নেই।

তবে সূর্য পুরোপুরি আড়াল হয়ে যাওয়ার আগেই, অর্থাৎ আংশিক সূর্যগ্রহণের সময় সূর্যের উজ্জ্বল বিকিরণ চোখে পড়লে তাতে চোখের রেটিনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এমনকি এর ফলে অন্ধত্বও (eclipse blindness) দেখা দিতে পারে। তাই সরাসরি সূর্যের দিকে না তাকানোর নিয়মটি শুধু গর্ভবতী নারী নয়, বরং সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

গ্রহণ চলাকালীন, রান্না বা খাওয়া উচিত নয় কেন ?

বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা :- গ্রহণের সময় সূর্যের তেজ কমে যায়। এর ফলে, জীবাণুর প্রকোপ বেড়ে যায় খাদ্যের উপর। যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক। মনে করা হয়, গ্রহণের সময় এক প্রকার বিকিরণ ঘটে, যা খাবারকে বিষাক্ত করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে এ সময় এমন কোনো ক্ষতিকারক বিকিরণ ঘটে না, যা খাবারে বিষক্রিয়া করতে পারে।

তবে সূর্যগ্রহণের সময় সূর্যরশ্মি পৃথিবীপৃষ্ঠে আসতে বাধা পায়। ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা হঠাৎ বেশ কমে যায়। কম তাপমাত্রা এবং সূর্যালোকের অভাবের কারণে খাবারে ক্ষতিকর জীবাণুর আক্রমণ হতে পারে বলে আশঙ্কা থাকে। তাই জীবাণুজনিত বিষক্রিয়া এড়ানোর জন্যে, সূর্যগ্রহণ শেষ হয়ে যাওয়ার পর সমস্ত খাবার ফেলে দিয়ে নতুনভাবে খাবার তৈরি করাকে যৌক্তিক ভাবা যেতে পারে।

গ্রহণের অশুভ প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার জন্যে উপবাস পালন করা হয় কেন ?

বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা :- অনেকে চন্দ্রগ্রহণ শুরুর নয় ঘণ্টা এবং সূর্যগ্রহণ শুরুর বারো ঘণ্টা আগে থেকে এ উপবাস শুরু করেন। এ সময় উপবাস পালনকারীগণ রান্না করা খাবার এবং পানীয় গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেন। আসলে গ্রহণের সময় এমন কোনো বিকিরণ ঘটে না, যা খাবারকে নষ্ট বা বিষাক্ত করতে পারে এবং গ্রহণের সঙ্গে অশুভ কোনো কিছু ঘটারও সংশ্লিষ্টতা নেই। তাই এসময় খাওয়া ও পান করা থেকে বিরত থাকার আদৌ কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই।

চিকিৎসকদের মতে, বর্তমানে খাবার বেশিরভাগ সময় রেফ্রিজারেটরে থাকে। এর ফলে ক্ষতির কোনও ভয় থাকে না এবং গ্রহণের জন্য গর্ভস্থ শিশুর কোনও ক্ষতি হয়েছে কি না, তাও সঠিকভাবে বলা যায় না।

গর্ভবতী নারীরা গ্রহণ চলাকালে ছুরি, কাঁচি ব্যবহার করতে পারে না কেন?

এসব নিষেধাজ্ঞা না মানলে গর্ভস্থ শিশু ঠোঁটকাটা বা তালুকাটা অবস্থায় জন্মগ্রহণ করবে, এমন একটি কুসংস্কার ভারতে প্রচলিত রয়েছে। আবার মেক্সিকোতে ঠিক উল্টোটা ঘটে। সেখানে গ্রহণের কুপ্রভাব থেকে শিশুকে রক্ষা করার জন্য গর্ভবতী নারীরা ধাতব অনুষঙ্গ (যেমন- সেফটিপিন) পরা, পেটের কাছে ছুরি ধরে রাখা, লাল রঙের অন্তর্বাস পরা- এসব নিয়ম পালন করে থাকেন।

বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা :-  প্রকৃতপক্ষে জন্মগত ঠোঁট বা তালু কাটার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ না পাওয়া গেলেও, বংশগত, পরিবেশগত কারণ কিংবা কিছু ঔষধ বা রাসায়নিক পদার্থের প্রভাবে এটি হতে পারে বলে জানা যায়। তবে সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণের সাথে শিশুর এ ধরনের ত্রুটি নিয়ে জন্মানোর ঘটনার সম্পর্ক নিয়ে কোনো বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

মানব ভ্রূণের ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম সপ্তাহ বয়সে তার নাক, মুখের তালু এবং ঠোঁট তৈরি হয়। কোনো কারণে দু’পাশের অংশগুলো মাঝে এসে মিলিত হতে বাধা পেলে ঐ অংশে ফাঁকা থেকে যায়। তখন একে আমরা ঠোঁটকাটা বা তালুকাটা বলে থাকি। এর সঙ্গে গ্রহণের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।

গর্ভবতীদের গ্রহণ চলাকালে বিছানায় সোজা হয়ে শুয়ে থাকতে হয় কেন ?

বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা :- গর্ভে শিশুকে রেখে চিত হয়ে শোয়াটা মায়েদের জন্য বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার।তাই একজন গর্ভবতী মহিলা অন্য সময়ে যেভাবে চলাচল করেন বা শুয়ে থাকেন, গ্রহণের সময়েও ঠিক সেভাবেই চলতে পারবেন। তার শিশু তার জরায়ুর ভেতরেই সুরক্ষিত আছে। সুতরাং বিকলাঙ্গতা ঘটানোর মতো অন্য কোনো কারণ না থাকলে, শুধু গ্রহণের প্রভাবে শিশু বিকলাঙ্গ হয়ে জন্মগ্রহণ করবে- এমন আশঙ্কা অমূলক।

গর্ভস্থ শিশুর ওপর গ্রহণের প্রভাব সম্পর্কে প্রচলিত বিশ্বাসগুলোর পক্ষে বৈজ্ঞানিকভাবে শক্ত কোনো প্রমাণই নেই।এ ক্ষেত্রে কোনোরকম কুসংস্কার প্রশ্রয় দেওয়া নিছক বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়। সুতরাং গর্ভাবস্থায় গ্রহণ দেখা দিলে এ নিয়ে উৎকণ্ঠিত হওয়ার কিছু নেই।