“আমূল গার্লের” নেপথ্যে কারা ? জানুন “আমূল গার্লের” অজানা ইতিহাস

লাল পোলকা ডটের ফ্রক পরা এক মেয়ে। নীল চুল। মাথায় রিবন। সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে ছোট্ট মেয়েটির মুচকি হাসি। বিজ্ঞাপ্নের ইতিহাসে এক দিকচিহ্ন। ১৯৬২ সাল থেকে একটানা মানুষকে সঙ্গ দিয়ে এসেছে। রঙ্গ রসিকতায় মাতিয়ে এসেছে। এতে অনেকে খুশি হয়েছেন, অনেকে রেগে গিয়েছেন। তাতে আমুল গার্লের থোড়াই কেয়ার। এবার আমুল গার্ল ৫২ বছর পূর্ণ করল। যা এককথায়, ‘আটারলি বাটারলি ডেলিশিয়াস’। পঞ্চাশেও শিশুই রয়ে গেল আমুলকন্যা।

Source

সবাইকে নিয়ে মজা করার এই ‘ইররেভারেন্ট’ মানসিকতাটাই আমুলের বিজ্ঞাপনী জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ। নেতা, চিত্রতারকা, ক্রীড়াবিদদের আর পাঁচ জনের মতো একই সমতলে দাঁড় করিয়ে দেওয়া, তাঁদের সাম্প্রতিক উক্তি বা ঘটনা নিয়ে মজা করাই তো সাধারণ মানুষের চোখ টেনেছে। বেশ কিছু বিজ্ঞাপন তো সুপার ডুপার হিট। যেমন ‘দিওয়ার’ ছবির ঢঙে আমুলের বিজ্ঞাপন। এক দিকে মুকেশ অম্বানী, অন্য দিকে অনিল। মাঝে তাঁদের মা কোকিলাবেন। নীচে ক্যাচলাইন, ‘মেরে পাস মাস্কা হ্যায়।’ তখন জরুরি অবস্থা। সঞ্জয় গাঁধীর নাসবন্দি প্রকল্প জোর কদমে। আমুল-কন্যা বিজ্ঞাপনে এল হাসপাতালের সেবিকার বেশে। হাতের ট্রে-তে বড় মাখনের প্যাকেট। সঙ্গে স্লোগানঃ  ‘বাধ্যতামূলক স্টেরিলাইজেশন আমরা সবসময়েই পালন করি।’

আরও পড়ুন : রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডারে আর কতটা গ্যাস বেঁচে আছে বুঝবেন কীভাবে

আমুল গার্ল বিজ্ঞাপনের পেছনে কারা ?

দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে অ্যাড এজেন্সি ডিকুনহা কমিউনিকেশনসের প্রধান রাহুল ডিকুনহা, কপিরাইটার মনীষ জাভেরি এবং জয়ন্ত রানে আমজনতার সামনে এনেছেন আমুল গার্লকে। ১৯৫৭ সালে ব্র্যান্ড আমুল রেজিস্টার্ড হয়। আমুলের কর্ণধার এবং ভারতে শ্বেত বিপ্লবের জনক ভার্গিস কুরিয়েন আমুল মাখনের বিজ্ঞাপনের দায়িত্ব দেন মুম্বইয়ের ‘অ্যাডভার্টাইজিং অ্যান্ড সেলস প্রোমোশন কোম্পানি’। সংস্থার আর্ট ডিরেক্টর ইউস্টাসে ফার্নান্ডেজ ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর সিলভেস্টার ডি কুনহাকে ডেকে কুরিয়েন বলেন, এমন একটা ম্যাসকট তৈরি করতে হবে, যা দেশের প্রতিটি গৃহবধূর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। কুরিয়েন নিজেই তারপর বুদ্ধি দেন, একটা দুষ্টুমিষ্টি বাচ্চা মেয়েকে ম্যাসকট বানালে কেমন হয়? ফার্নান্ডেজের ওপর দায়িত্ব পড়ে সেই মেয়ের ছবিটি আঁকার। কুরিয়েন বলে দিয়েছিলেন, ম্যাসকটটা এমন হওয়া চাই যা সহজেই মনে রাখা যায় আর মন থেকে আঁকা যায়। কারণ তখনকার দিনে হোর্ডিং-এ প্রত্যেকবার রঙ-তুলি দিয়ে এঁকেই দিতে হত বিজ্ঞাপন।

আরও পড়ুন : ট্রাফিক লাইট লাল, সবুজ ও হলুদ কেন ?

Source

কুরিয়েনের সমস্ত শর্ত মাথায় রেখেই ফার্নান্ডেজ তৈরি করেন আমুল গার্লকে— পলকা ডট পোশাক পরা এক ছোট্ট মেয়ে, যার মাথায় ঝুঁটি আর মুখে দুষ্টু হাসি। দেশবাসীর হৃদয় জয় করতে এই ম্যাসকটের সময় লাগেনি। ভারতের বিজ্ঞাপনের জগতের সবচেয়ে বিখ্যাত ম্যাসকট হয়ে উঠেছে সে।

আরও পড়ুন : কেন অটলবিহারী বাজপেয়ী দেশের জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী?

Source

প্রথমবার বড় বিলবোর্ডে এসেছিল আমুলের বিজ্ঞাপন। প্রার্থনার ভঙ্গিতে হাটুমুড়ে বসে আছে ছোট্ট মেয়েটি। এক চোখ বন্ধ। অন্য চোখ মাখনে নিবদ্ধ। তাতে লেখা, ‘প্রতিদিন আমাদের জন্য রুটি আর আমুল মাখন রেখ’। প্রথম বিজ্ঞাপনই হিট। মানুষের থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ায় বোঝা গেল, এই মেয়ে অনেক দূর যাবে।

ইংরেজি শিক্ষিতদের বাইরেও তো রয়ে গিয়েছেন উপভোক্তাদের বড় অংশ। ১৯৬০ সালে রোমান হরফে বাংলা ভাষা মিশিয়ে বিজ্ঞাপন বেরোল কলকাতা শহরে। ‘আমূল ছাড়া টোস্ট? চলবে না। চলবে না।’ কলকাতায় তখন কথায় কথায় ‘চলছে না, চলবে না’ স্লোগান।

আরও পড়ুন : জামাই ষষ্ঠী কেন পালন করা হয় ? জেনে নিন জমাই ষষ্ঠীর ইতিহাস


তার পর পঞ্চাশ বছর ধরে বহু জল গড়িয়েছে। নেহরু-অর্থনীতি থেকে ভারত পৌঁছে গিয়েছে মনমোহনী অর্থনীতিতে। ব্রেকফাস্টের টেবিলে মাখন- টোস্টের পাশে এসেছে পিত্জা, হটডগ, বার্গার। বিজ্ঞাপনের জগতেও বহু বদল। এয়ার ইন্ডিয়ার ‘মহারাজা’ বিদায় নিয়েছে। ওনিডার দুই শিংওয়ালা ‘শয়তান’ হারিয়ে গিয়েছে স্মৃতির নরকে। কিন্তু হাতে-আঁকা মেয়ে আর তার মুচকি হাসি আজও অম্লান।

কীভাবে কাজ করেন তাঁরা?

রাহুল এবং জাভেরি দুজনে প্রতিদিনের সংবাদপত্র খুঁটিয়ে পড়েন। বুঝে নেন, এই সময়ের হট টপিক কী চলছে! খোঁজেন বিতর্ক। এইভাবে ঠিক হয় বিজ্ঞাপনের বিষয়।
এরপর জয়ন্ত রানে শুরু করেন স্কেচ আঁকার কাজ। জাভেরি তৈরি করেন ক্যাপশন। আমুল গার্লের চাহিদা বেড়েছে দ্রুত। কিন্তু বদলায়নি কিছু। আগে সপ্তাহে ১টি থেকে ২টি বিজ্ঞাপন আঁকা হত। এখন সেটা ৫টি থেকে ৬টি বিজ্ঞাপনে দাঁড়িয়েছে।

আরও পড়ুন : ১৯৫০ সালে ফুটবল বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েও ভারত খেলেনি কেন জানেন ?

Source

কে বানালেন আমুল গার্ল?

আমুল গার্ল বানানোর কৃতিত্ব সিলভেস্টার ডিকুনহার। ছোট্ট মেয়েটি তাঁরই তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত। আর ইউস্টাস ফার্নান্ডেজ আর্ট ডিরেক্টর। তিনিই পরিকল্পনা করেন, এমন কিছু বানাতে হবে যা এক লহমায় গৃহবধূদের মন জয় করবে। ব্যস, ইউস্টাস ফার্নান্ডেজ এঁকে ফেললেন লাল পোলকা ডটের ফ্রক পরা এক মেয়ে। মাথায় রিবন। নীল চুল। সেই হাতে-আঁকা মেয়ে আর তার মুচকি হাসি আজও অম্লান।