বিশ্ব সিনেমার ইতিহাসে বিরল, সত্যজিৎ রায়ের এই ৩৪টি সিনেমার ১৪টিতে সৌমিত্র

বিশ্ব সিনেমায় পরিচালক – অভিনেতার সফল জুটির প্রসঙ্গ উঠলে নিঃসন্দেহে নাম উঠবে সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray) এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের (Soumitra Chatterjee)। সত্যজিৎ রায়ের (Satyajit Ray) নিখুঁত পরিচালনায় একের পর এক চরিত্রকে দক্ষতার সাথে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chatterjee), তৈরি হয়েছে সিনেমা জগতের একের পর এক মাইলস্টোন।

প্রথমবার সত্যজিৎ রায়ের (Satyajit Ray) পরিচালনায় পর্দায় অপুর ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল সৌমিত্রকে। ছবির নাম, “অপুর সংসার”, যা মুক্তি পেয়েছিল ১৯৫৯ সালে। এরপর দেবী (১৯৬০), তিন কন্যা (১৯৬১), অভিযান (১৯৬২), চারুলতা (১৯৬৪), কাপুরুষ (১৯৬৫), অরণ্যের দিনরাত্রি (১৯৭০), অশনি সংকেত (১৯৭৩), সোনার কেল্লা (১৯৭৪), জয় বাবা ফেলুনাথ (১৯৭৯), হীরক রাজার দেশে (১৯৮০), ঘরে বাইরে (১৯৮৪), গণশত্রু (১৯৮৯), শাখা প্রশাখা (১৯৯০)। এই ৩১ বছরের সময়ে একসাথে ১৪টি ছবিতে কাজ করেন তারা,সবকটি ছবিই মন ছুঁয়ে যায় দর্শকদের।

বিশ্বের সিনেমার ইতিহাসে এই জুটির সাথে কেবলমাত্র জাপানি অভিনেতা তোশিরো মিফুনে (Toshiro Mifune) এবং আকিরা কুরোসাওয়ার (Akira Kurosawa) জুটির তুলনা করা যায় যারা ১৬টি ছবিতে কাজ করেছিলেন একসাথে।এছাড়া আর কোনও তৃতীয় জুটির সাথে তাদের তুলনা করা চলেনা।

পরিচালক এবং অভিনেতার বন্ধুত্বের উদাহরণ দিলে অবশ্য সুইডিশ পরিচালক বার্গম্যানের সঙ্গে ম্যাক্স ভন সিয়েডো, লিভ উলমান অথবা পোলিশ পরিচালক ওয়াইডার সঙ্গে সিবুলসকির উদাহরণ দেওয়া যায়, তবে তারা একসাথে এতগুলো ছবিতে কাজ করেননি।

কিছুদিন আগে একটি সাক্ষাৎকারে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে (Soumitra Chatterjee) তার চরিত্রের বিষয় প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray) তাকে দিয়ে ১৪টি ছবিতে এতরকম আলাদা আলাদা চরিত্র করিয়েছেন যে তার আর কোনও অপূর্ন ইচ্ছা বা অভিযোগ, কোনোটাই নেই। জীবৎকালে সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray) স্বীকার করেছিলেন যে বেশ কিছু এমন চরিত্র ছিল যেগুলো তিনি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে (Soumitra Chatterjee) কল্পনা করেই সৃষ্টি করেছিলেন।

এই চরিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘শাখা প্রশাখা’র প্রশান্ত, ‘গণশত্রু’র ডাক্তার অশোক গুপ্ত, ‘হীরক রাজার দেশে’র মাষ্টারমশাই উদয়ন, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’র অসীম ইত্যাদি চরিত্রগুলো। এই চরিত্রগুলো আজও বাঙালির মননের সাথে মিশে আছে।অন্যদিকে আকিরা কুরোসাওয়া (Akira Kurosawa) ‘সেভেন সামুরাই’-এর কিকুচিও বা ‘রেড বিয়ার্ড’ ছবির ডাক্তার কিওজোর চরিত্রটি সৃষ্টি করেছিলেন অভিনেতাকে কল্পনা করেই।

সত্যজিৎ রায়ের (Satyajit Ray) সাথে এতগুলো ছবিতে অভিনয় করেও কোনও ছবির জন্য বিশেষ ভাবে দেশ বা বিদেশ থেকে পুরষ্কার পাননি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chatterjee)। অন্যদিকে,‘ওয়াজিম্বু’ ছবিতে কুয়াবাতাকের চরিত্রে অভিনয় করে  ভেনিস থেকে সেরা অভিনেতার খেতাব পান মীফুনে (Mifune)। এর ঠিক চার বছর বাদে  ‘রেড বিয়ার্ড’ ছবির জন্য আবারও ভেনিস থেকে তাকে সেরা অভিনেতা হিসেবে সন্মান দেওয়া হয়।

অবশ্য জাপানি ছবির পৌরাণিক কাহিনীতে যেহেতু সামুরাই জীবনের ঘটনা প্রাধান্য পায়,সেহেতু সেইসব ছবিতে উচ্চ মানের অভিনয়টাই ছবির মূল কেন্দ্র হয়। অন্যদিকে বাংলা ছবি মূলত প্লট কেন্দ্রিক হয়েই গড়ে ওঠায় সিনেমার পর্দায় সেরকম বিশেষ সুযোগ পাননি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chatterjee)। তবে একবার তিনি মঞ্চে ‘রাজা লিয়র’ এ অভিনয় করেছিলেন যেখানে তার অভিনয় দর্শকদের মনে দাগ কেটে দিয়েছিল। আজও সেই অভিনয়কে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের (Soumitra Chatterjee) অন্যতম সেরা অভিনয় বলে মনে করা হয়।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chatterjee) নিজের সুদীর্ঘ কেরিয়ারে তপন সিংহের ‘অন্তর্ধান’ এবং সুমন ঘোষের ‘দেখা’ ছবির জন্য দুবার জাতীয় পুরষ্কার পেয়েছিলেন।সেরা অভিনেতার মুকুট মাথায় উঠেছিল ‘পদক্ষেপ’ ছবির জন্য।পরবর্তীকালে ভারত সরকার তাকে দাদাসাহেব ফালকে আর পদ্মভূষণ সম্মানে সম্মানিত করেন।যদিও তার আগে একাধিকবার পদ্মশ্রী ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। ফ্রান্স সরকারের থেকে Legion d’Honneur এবং Commandeur de l’Ordre des Arts et des Lettres সন্মানেও সন্মানিত করা হয় তাকে।

তবে ব্যাক্তিগত জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায় ১৯৬৪ সালের পর থেকে কোনও অজ্ঞাত কারণে কুরোসাওয়ার (Kurosawa) সাথে আর ছবি করেননি মিফুনে (Mifune)। নিজের আত্মজীবনীতে এই বিষয় কিছুই লিখে যাননি কুরোসাওয়া। অন্যদিকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chatterjee) এবং সত্যজিৎ রায়ের (Satyajit Ray) সখ্যতা ছিল আমৃত্যু। কোনওদিন এই দুই বাঙালিকে পৃথক করা যায়নি।

১৯৯২ সালে সত্যজিৎ রায়ের (Satyajit Ray) মৃত্যুর পর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় “মানিক দার সঙ্গে” (Manik Da and I) বইতে তার এবং সত্যজিৎ রায়ের বিভিন্ন স্মৃতি তুলে ধরেছেন। এই বইতেই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chatterjee) তুলে ধরেছেন কিভাবে একটু একটু করে তাকে অভিনেতা হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray)। সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray) এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chatterjee) বরাবরই অবিচ্ছেদ্য।তারাই বুঝিয়ে দেয় কিছু সম্পর্ককে ভাঙার ক্ষমতা খোদ মৃত্যুরও থাকেনা।