ভারতের প্রথম মহিলা চিকিৎসক কাদম্বিনী গাঙ্গুলীকে চেনেন?

69

আজ থেকে বছর দুয়েক আগেও বাংলার সব মানুষ তার নাম জানতেন না। সাধারণ জ্ঞান এবং বাংলার ইতিহাসের বইয়ের পাতাতেই আটকা পড়েছিলেন তিনি। তিনি আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রে পাশ করা বাংলার প্রথম মেয়ে কাদম্বিনী গাঙ্গুলি (Kadambini Ganguly)। এককালে সমাজে আর পাঁচ জনের থেকে ভিন্ন ধরনের স্বপ্ন দেখার জন্য অনেক নিন্দা সহ্য করতে হয়েছে তাকে। আজ তারই নাম উঠে আসছে বাংলার ভোটের প্রতিশ্রুতিতে।

কয়েকদিন আগে নির্বাচনী ইশতেহার পেশ করেছে বিজেপি। ‘কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় স্বাস্থ্য পরিকাঠামো তহবিল’-নামে ১০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের কথা বলেছে গেরুয়া শিবির। তাদের আশ্বাস, জিতলে প্রতিটি জেলায় মেডিকেল কলেজ এবং জেলা হাসপাতাল তৈরি করা হবে। পাশাপাশি প্রত্যেকটা ব্লকে থাকবে স্বাস্থ্য কেন্দ্র, গ্রাম পঞ্চায়েতের থাকবে প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র। এই পুরো প্রকল্পের নাম থাকবে কাদম্বিনী গাঙ্গুলীর। কিন্তু হঠাৎ কাদম্বিনী গাঙ্গুলী কে মনে পড়া কেন?

গত বছর যখন পুরো বিশ্ব লড়াই করছিল করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে ঠিক সেই সময়ে বাংলার টেলিভিশন সিরিয়ালগুলিতে তুলে ধরা হয় বাংলার চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসের প্রথম নারীর জীবনের গল্প। এরপর থেকেই প্রত্যেকটি বাঙালির কাছে খুব পরিচিত হয়ে ওঠে কাদম্বিনী গাঙ্গুলীর (Kadambini Ganguly) নাম।

শুধু একটা নয় বরং দুটো চ্যানেলে দুটো সিরিয়াল একই সময়ে শুরু হয় তার নামে। একটি সিরিয়ালের নাম দেওয়া হয় “”কাদম্বিনী” (Kadambini) যার নাম চরিত্রে অভিনয় করেছেন উষসী (Ushasi Ray)। আবার অন্যটির নাম দেওয়া হয় “প্রথমা কাদম্বিনী” (Prothoma Kadambini) যেখানে মূল চরিত্রে দেখা গিয়েছে সোলাঙ্কিকে (Solanki Roy) ।

সেই সময় মেয়েদের ঘরের গণ্ডি পেরিয়ে বাইরে যাওয়া রীতিমতো অলীক কল্পনা ছিল, সে সময়েই কলকাতা শহরের বুকে ডাক্তারি প্র্যাকটিস করছিলেন গুরুপ্রসাদ চৌধুরী লেনের কাদম্বিনী গাঙ্গুলী। অবশ্য একসময় প্রাচীনপন্থী গোড়াদের তুমুল প্রতিরোধের সম্মুখিন হতে হয়েছিল তাকে,ডাক্তারি ডিগ্রির বদলে তাঁকে দেওয়া হয়েছিল ‘গ্র্যাজুয়েট অফ দ্য মেডিক্যাল কলেজ অব বেঙ্গল’ বা জিএমসিবি উপাধি দেওয়া হয়েছিল তাকে। অবশ্য তাতে তিনি দমে যাননি, রাতবিরেতে রোগী দেখতে যাওয়া একটার পর একটা অস্ত্রোপচার করে যাওয়া সবই করেছেন তিনি।

প্রাচীন পন্থীদের বুড়ো আংগুল দেখিয়ে আট সন্তানকে বাড়িতে রেখে ১৮৯৩ সালে ডাক্তারির ডিপ্লোমা নিতে জাহাজে করে লন্ডনে পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। মাত্র তিন মাসের মধ্যেই ডিগ্রি নিয়ে তিনি ফিরে আসেন। অসম্ভবের বেড়া টপকে তিনি এ দেশের প্রথম মহিলা গ্র্যাজুয়েটের শিরোপা পান ১৮৮২ সালে। শুধু তা-ই নয়, দক্ষিণ এশিয়ায় তিনিই প্রথম মহিলা ডাক্তার, যিনি ডাক্তারি শাস্ত্রের তিন-তিনটি বিলিতি ডিগ্রি লাভ করেন!

কাদম্বিনী ডাক্তারি পাশ করেন ১৮৮৬ সালে। তিনি প্রথম ভারতীয় মহিলা ডাক্তার যিনি ওয়েস্টার্ন মেডিসিন নিয়ে প্র্যাকটিস করার যোগ্যতা অর্জন করেন। এর পর কাদম্বিনী ইংল্যান্ডে পাড়ি দেন এবং এলআরসিএস এবং জিএফপিএস ডিগ্রি লাভ করেন। তিনিই ছিলেন ভারতের প্রথম মহিলা চিকিৎসক, যিনি ডাক্তারি শাস্ত্রের একাধিক বিদেশি ডিগ্রি অর্জনের দুর্লভ দক্ষতা দেখান।বিলেত থেকে ফিরে জনসেবায় মন দেন। চিকিৎসা করার জন্য ছুটে যেতেন গ্রামান্তরে। পাশাপাশি যোগ দেন রাজনীতিতেও। যোগ দিয়েছিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনেও। কিন্তু অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে ১৯২৩ সালের ৩ অক্টোবর, সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়। আর চোখ খোলেননি কাদম্বিনী!

কখনোই সংসারকে তার ক্যারিয়ারের পথের কাঁটা হয়ে উঠতে দেননি কাদম্বিনী। কিন্তু ভোটের পূর্বে বাঙালির আবেগকে জাগিয়ে কাদম্বিনী গাঙ্গুলীর নামে প্রকল্প শুরু করার পেছনে কি কাজ করেছে সিরিয়ালের প্রভাব? গেরুয়া শিবিরের সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসুর কথায়, ‘‘ধারাবাহিক দেখে নয়। বিজেপি-র স্মরণে, মননে সব সময়ে মণীষীরা থাকেন।’’ অবশ্য এই ঘটনায় বেজায় খুশি টলি পারা। নাম চরিত্রে অভিনয় করা ঊষসী রায় বললেন, ‘‘যে দলই ঘোষণা করুক না কেন, কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়কে যে অবশেষে সামনে আনা হচ্ছে, তা জেনেই ভাল লাগছে।’’