ATM প্রতারণার ফাঁদ থেকে কীভাবে বাঁচবেন? জানুন সহজ কিছু উপায়

গত এক সপ্তাহের মধ্যে আমাদের রাজ্যে প্রায় ২০ লক্ষ টাকার মতো এ টি এম প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। এই প্রতারণার বেশিরভাগই বা প্রায় সবটাই কিন্তু ঘটেছে আপনার কোন তথ্য হাতিয়ে নিয়ে। প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে তত তার মধ্যে বিভিন্ন ফাঁকফোকর দেখা যাচ্ছে, আর এই ফাঁকফোকর বা আপনার অসতর্কতা এই দুই জিনিসকেই কাজে লাগিয়ে প্রতারকরা আপনার এটিএম কার্ডের গোপন তথ্য হাতিয়ে নিয়ে আপনার একাউন্টে থাকা আপনার বহু কষ্টের জমানো টাকা হাতিয়ে আপনাকে সর্বস্বান্ত করে তুলছে।ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক সম্প্রতি এক নির্দেশনামা জারি করেছে সকল সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের উদ্দেশ্যে। এই নির্দেশনামায় স্পষ্ট বলা হয়েছে দেশজুড়ে এটিএম প্রতারণার  বাড়বাড়ন্ত বন্ধ করার জন্য সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা লক্ষ লক্ষ এ টি এম কাউন্টার গুলির আপগ্রেডেশন করতে হবে।এর সঙ্গে গ্রাহকদের নিরাপত্তা ও এটিএমের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ করতেও নির্দেশ দিয়েছে।কিন্তু আমরা যারা এ টি এম কার্ড ব্যবহার করি তারা প্রায় সকলেই এক বাক্যে স্বীকার করে নেব যে প্রায় দশটি এটিএম কাউন্টারের মধ্যে দুটি বা একটি কাউন্টারে নিরাপত্তা কর্মী থাকে বাকি সবগুলিই ঈশ্বরের ভরসায় ছেড়ে দেওয়া হয়।যার ফল ভুগতে হয় আমাদের সকলকেই।তাই আমাদের প্রত্যেককেই  মনে রাখতে হবে নিজের টাকার নিরাপত্তা নিজেকেই দিতে হবে,এর জন্য আমাদের অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে বসে থাকলে চলবে না।আর তাই আমাদের সবসময় চোখ কান খোলা  রাখতে হবে এবং মেনে চলতে হবে বেশ কিছু সতর্কতা।আর এইসব সতর্কতা অবলম্বন করলে আমরা অনেকটা নিরাপদে কোন রূপ প্রতারনা ছাড়াই আমাদের এটিএম কার্ড ব্যবহার করতে পারবো। আসুন জেনে নি সেই সব সতর্কতাগুলি

 

কাউন্টারের ভেতরে আপনি একা থাকবেন

অনেকসময় আমরা দেখেছি এটিএম  কাউন্টারে লম্বা লাইন থাকে। আর সেই লাইন শুরু হয় কাউন্টারের ভিতর থেকেই।এটা কিন্তু একদম বেআইনি।ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের স্পষ্ট নির্দেশ যে কাউন্টারে আপনি যখন টাকা তুলবেন তখন আপনার চারপাশে যেন কেউ না থাকে।অর্থাৎ কেউ যেন পেছন থেকে উঁকি মেরে আপনার টাইপ করা পিন নাম্বার কোন অবস্থায় দেখতে না পারে।তাই সবার প্রথমে নিশ্চিত করুন আপনি যখন1 কাউন্টারের ভিতরে টাকা তোলার জন্য ঢুকছেন তখন বাকি সব ব্যক্তি যারা আপনার পেছনে আছে তারা যেন কাউন্টারের বাইরে থাকে।যদি কেউ ভেতরে থাকার জন্য জোরাজুরি করে তাহলে তাকে শান্ত ভাবে বাইরে বেরিয়ে যেতে বলুন।এরপরও যদি আপনার কথা না শোনে তাহলে আপনার ওই কাউন্টারের নিরাপত্তায় থাকা কর্মীকে ডেকে এনে তাকে বার করে দিন।আর যদি কোন কর্মী না থাকে তাহলে ওই ব্যক্তিকে আপনার আগে যাওয়ার সুযোগ দিন বা তাকে নিয়ম বুঝিয়ে বাইরে বের করে দিন।এইভাবে আপনার পিন নাম্বারের নিরাপত্তা বজায় থাকবে।

কাউন্টারের ভিতর সময় নিন

প্রথমেই বলে রাখি আমরা যারা এটিএম কাউন্টারে যায় তারা সঙ্গে নিয়ে যায় হাজার কাজ বা ব্যস্ততা।কিন্তু এই ব্যস্ততায় আমাদের বিপদ ডেকে আনে শান্ত মনে একটু ভাবুন আপনার ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে কেউ যদি কোন লুকানো ক্যামেরা বা স্কিমিং মেশিন কাউন্টারে বসিয়ে রাখে তাহলে আপনি তা জানতেও পারবেন না।তাই সময় নিয়ে কাউন্টারে এ টি এম কার্ড ঢোকানোর আগে ভাল করে দেখে নিন কার্ড সোয়াইপ করার জায়গাটি।যদি লুজ কানেকশন বা কোনো বাড়তি কিছু লেগে থাকে তাহলে অবশ্যই নিরাপত্তাকর্মীকে জানান বা তা সরিয়ে ফেলুন তৎক্ষনাৎ।এইসব যন্ত্র ব্যবহার করে সহজেই আপনার তথ্য হাতিয়ে নিয়ে আপনার এটিএম কার্ডের ডুপ্লিকেট কার্ড তৈরি করে আপনার একাউন্টে থাকা সকল টাকা  নিমেষেই হাতিয়ে নেওয়া যায়।তাই আপনার সতর্কতা আপনাকে আপনার টাকা ও অন্যদের বিরাট প্রতারণা থেকে বাঁচাবে তাই সময় নিয়ে কাউন্টারের সকল জিনিস  ভালো করে দেখে নিন।পারলে ফটো কপি করে রাখুন আপনার স্মার্টফোনে।পরে কিছু প্রতারণার শিকার হলে আপনি তা প্রমান হিসাবে দেখাতেও পারবেন।তাই সময় নিন কাউন্টারের ভিতর।একদম ব্যস্ততা দেখিয়ে টাকা তুলবেন না।আপনার মুহূর্তের ভুল বড় কিছু বিপর্যয় নিয়ে আসতে পারে।

কিছু কিছু ব্যাঙ্কের এটিএম কাউন্টারে পিন নাম্বার আড়াল করার জন্য  পিন দেওয়ার জায়গায় একটা শিল্ড বা বর্ম দেওয়া থাকে ,এতে আপনি যে পিন টিপছেন তা অন্য কেউ জানতে পারবে না যদি কেউ আপনার পেছনে থাকে।তবে প্রতারকরা অনেকসময় এই ‘PIN shield’ এর ভিতরের দিকে লুকানো ক্যামেরা দিয়ে রাখে। তাই যদি দেখেন এটিএম কাউন্টারে ‘PIN shield’  দেওয়া আছে তাহলে তার উপর নীচে হাত দিয়ে ভালো করে দেখে নিন কোন লুকানো তারবিহীন ক্যামেরা বা অন্য কিছু যন্ত্র রয়েছে কি না।যদি থাকে তাহলে তা তৎক্ষনাৎ বের করে দিন এবং  নিকটবর্তী পুলিশকে জানান।

কম ব্যবহার হওয়া এটিএম কাউন্টার এড়িয়ে চলুন

আমরা সাধারণত এমন কাউন্টার পছন্দ করি যেখানে ভিড় থাকে কারণ ভিড় থাকলে টাকা তোলার সম্ভাবনা কম থাকে।তবে এই চিন্তাধারা একদমই ভুল এবং বিপদজনক।সাধারণত যেসব এটিএন কাউন্টার ভিড় কম থাকে সেগুলি প্রতারণা করার জন্য আদর্শ এটিএম কাউন্টার।যত লোকের ভিড় কম থাকবে ততো প্রতারকরা প্রতারণা করার সুযোগ বেশি পাবে।আর এর ফলে স্কিমিং মেশিন, বা ক্যামেরা বসানো বা লাগানোর সম্ভাবনা অনেক বেশি হয়।তাই এইসব কম ভিড় হওয়া কাউন্টারগুলো এড়িয়ে চলুন।আর যদি একান্তই ব্যবহার করতে হয় এইসব কাউন্টার তাহলে সময় নিয়ে ভালো করে দেখে নিন সব কিছু।যদি সন্দেহজনক কিছু আছে বলে মনে হয় তাহলে নিকটবর্তী থানা বা যে ব্যাংকের এটিএম কাউন্টারটি বটে  তাদের তৎক্ষনাৎ জানান।

আরও পড়ুন : এটিএম কার্ডের পিন কেন চার সংখ্যার হয় ? জানুন কিছু মজার তথ্য

 এটিএম পাসওয়ার্ড ঘন ঘন বদলান

সাইবার ও ব্যাংকিং শাখার এক্সপার্টদের মতে ব্যাংকিং প্রতারণা ঘটার পিছনে যত না প্রতারকের ভূমিকা থাকে তার থেকে আমাদের ভুল বেশি দায়ী।আমাদের মধ্যে খুব কম জনই আছি যারা এটিএম কাউন্টার থেকে টাকা তোলার আগে বা পরে পিন কোড বদলায়।আর তার ফলে প্রতারকদের কাছে প্রতারণার সুযোগ করে দেয়।কিন্তু আমাদের উচিত ঘন ঘন আমাদের এটিএম কার্ডের পিন বা পাসওয়ার্ড বদলানো।সাধারণত একটি পাসওয়ার্ড একমাস  পর্যন্তই রাখা উচিত।যদি আপনি এটিএম কার্ড বেশি ব্যবহার করেন তাহলে অবশ্যই পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করা উচিত।আর যারা মাসের পর মাস বা এক বছরেও পাসওয়ার্ড পাল্টান না তারা কিন্তু সহজেই প্রতারণার শিকার হতে পারেন।তাই সবারই উচিত পাসওয়ার্ড পাল্টানো।

আরও পড়ুন : ATM থেকে নকল নোট পেলে কি করা উচিত ?

নিজের ব্যালেন্স আপ টু ডেট রাখুন এবং SMS এলার্ট পরিষেবা নিন

আমরা সাধারণত ব্যাঙ্কের একাউন্ট বই আপ টু ডেট রাখি না।কিন্তু আমাদের অবশ্যই ব্যাঙ্কের পাশ বই আপ টু ডেট রাখা উচিত।আর নিয়মিত নিজের ব্যালেন্স চেক করুন।যদি অস্বাভাবিক কিছু দেখেন তাহলে তৎক্ষনাৎ ব্যাংকের যে শাখায় আপনার একাউন্ট আছে তা জানান।এছাড়াও SMS এর মাধ্যমে আপনার একাউন্টে টাকা ঢুকছে বা টাকা তোলা হলে তা আপনাকে জানানো হচ্ছে কী না তা ভালো করে লক্ষ্য রাখুন।যদি না জানানো হয় টাকা একাউন্টে ঢুকলে বা বের করে নেওয়ার সময় তা আপনার ব্যাঙ্কে জানান এবং SMS এলার্টের সুবিধা সবসময় গ্রহণ করুন।যা কিন্তু খুবই উপকারী এবং প্রয়োজনীয় বটে।

অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন এলে যদি কোন তথ্য বিশেষ করে আপনার ব্যাঙ্ক একাউন্ট বা এটিএমের পাসওয়ার্ড বা সিরিয়াল নাম্বার সম্পর্কিত কোন কোন তথ্য জানতে চাইলে তা কখনোই জানাবেন না।এমনকি যদি বলে যে আপনার ব্যাঙ্ক থেকে বলা হচ্ছে তবুও না।ব্যাঙ্ক কিন্তু কখনোই আপনার ব্যক্তিগত তথ্য জানতে চাইবে না।আপনার এটিএম কার্ড  ব্লক করা হয়েছে বা অন্য কিছু বলা হলেও তা কিন্তু সম্পূর্ন ফাঁদ ,তাই এরকম কোন ফাঁদে পা দেবেন না।

আরও পড়ুন : সিম জালিয়াতিতে ১৩ লাখ টাকা খোয়ালেন এক ব্যক্তি, আপনিও হতে পারেন এর শিকার

অপরিচিত সাহায্যকারীকে এড়িয়ে চলুন

অনেক সময় আমাদের মধ্যে অনেক মানুষ যারা প্রথমবার এটিএম কার্ড ব্যবহার করছি তারা এটিএম কাউন্টারে এটিএম কার্ড ঠিক করে ব্যবহার করতে পারি না।তখন আমাদের সাহায্য করার নাম করে অনেক অপরিচিত মানুষ এগিয়ে আসেন।এরা কিন্তু প্রতারক হতে পারেন।তাই কখনোই অপরিচিত ব্যক্তিদের সাহায্য নেবেন না এটিএম কার্ড ব্যবহার করার সময়।আপনি না পারলে বাড়ি ফিরে চলে আসুন।কিন্তু নিজের এটিএম কার্ড অন্য কাউকেই দেবেন না।অনেকসময় আমাদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে এইসব ভন্ড সাহায্যকারীরা আমাদের এটিএম কার্ডের তথ্য সংগ্রহ করে আমাদের প্রতারিত করে।তাই এইসব সাহায্যকারীদের এড়িয়ে চলুন।

এটিএম কাউন্টার থেকে টাকা বের করার পর বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার আগে অবশ্যই ক্যানসেল সুইচ টিপে আপনার পুরো প্রক্রিয়া শেষ করুন।ভুলেও তাড়াতাড়ি করে বেরিয়ে আসবেন না।সবসময় আপনার টাকা তোলার পর ক্যানসেল সুইচ টিপে ভালো করে দেখে নিন ।এটিএম স্ক্রিন আগের অবস্থায় এসেছে কী না।যদি না এসে থাকে তাহলে ক্যানসেল সুইচ ভালো করে টিপে আগের অবস্থায় নিয়ে আসুন।স্ক্রিনে ওয়েলকাম লেখা উঠলে তবেই বের হন কাউন্টার থেকে।

রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নির্দেশাবলী

গ্রাহকরা যেন এটিএম কার্ড বা কাউন্টার থেকে কোন রকম ভাবেই প্রতারিত না হয় তার জন্য ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বেশ কিছু নির্দেশাবলী জারি করেছে সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের উদ্দেশ্যে।এই নির্দেশাবলীতে  যা কিছু স্পষ্ট বলা হয়েছে  তা হল নিম্নরূপ

  • সকল ব্যাঙ্কের এটিএম কাউন্টার নতুন করে আপগ্রেডেশন করতে হবে এবং নতুন অপারেটিং সিস্টেম সফটওয়ার ব্যবহার করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী ২০১৯ সালের জুন মাসের মধ্যেই তা করতে হবে।
  • কাউন্টারে আন্টি স্কিমিং মেশিন লাগাতে হবে বা যাতে করে স্কিমিং কোনো মতেই করা যায় না তার ব্যবস্থা করতে হবে।
  • এছাড়াও এটিএম কাউন্টারে নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ করার কথাও বলা হয়েছে।

সচেতনতা বাড়াতে এগিয়ে এসেছে কলকাতা পুলিশও। কী বলছে পুলিশ দেখে নিন