সর্বকালের সেরা ১৩ বাংলা সিরিয়াল, যা আজীবন দর্শকদের মনে থাকবে

সিনে অনুরাগীদের কাছে ধারাবাহিক মানেই এক আলাদা সেনসেশন। আট থেকে আশি, পরিবারের সঙ্গে বসে ধারাবাহিক দেখার মজাই আলাদা। বলা ভালো, ধারাবাহিক যেন এক পরিবারের সকল সদস্যকে এক সঙ্গে বেঁধে রাখতে পারে। ধারাবাহিক যেন আর শুধুই মা-ঠাকুমাদের জন্য নির্দিষ্ট নয়, পরিবারের পুরুষ সদস্যদেরও আকর্ষণ করার ক্ষমতা রাখে। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকেই বিভিন্ন টেলিমিডিয়া দর্শকদের জন্য নতুন নতুন ধারণা নিয়ে নতুন নতুন ধারাবাহিক উপহার দিয়ে এসেছে। তার আগে অবশ্য শুধু দূরদর্শনই ছিল মানুষের একমাত্র বিনোদনের ক্ষেত্র। তবে ধীরে ধীরে টিভি চ্যানেলের প্রসার ঘটেছে। “স্টার জলসা”, “জি বাংলা”র মতো টিভি চ্যানেলগুলির সঙ্গে দর্শকের পরিচয় ঘটেছে। বাঙালি দর্শকের একটি বড় অংশের মনোযোগ কেড়েছে এই দুই টেলিমিডিয়ার এভারগ্রীন ধারাবাহিকগুলি।

বিগত প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই ধারাবাহিক গুলি দর্শকের বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। ধারাবাহিকের সম্প্রচারণ অবশ্য শেষ হয়েছে বহু আগেই, তবে দর্শকের মনের মধ্যে থেকে গিয়েছে ধারাবাহিকের গল্প এবং চরিত্রগুলি। তাই তো সম্প্রচারণ বন্ধ হওয়ার পর বহু বছর কেটে গেলেও এই ধারাবাহিকগুলি আজও সিনে অনুরাগীদের কাছে চর্চার বিষয়বস্তু। “স্টার জলসা” এবং “জি বাংলা”র এমনই কিছু এভারগ্রীন বাংলা ধারাবাহিক নিয়েই আজকের এই প্রতিবেদন।

গোয়েন্দা গিন্নি : “ইন্দ্রানী হালদার” অভিনীত “গোয়েন্দা গিন্নি” জি বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় ধারাবাহিক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। প্রচলিত শাশুড়ি-বৌমার সাংসারিক কুটকাচালিমূলক ধারাবাহিকের বাইরে গিয়ে এক গৃহবধুর গোয়েন্দা হয়ে ওঠার কাহিনী স্বভাবতই দর্শক ভীষণ পছন্দ করতে শুরু করেন। এই ধারাবাহিকের জনপ্রিয়তাও ভীষণ ভাবে বেড়ে যায়, যে কারণে লকডাউন পর্বে ধারাবাহিকটিকে পুনরায় সম্প্রচার করার সিদ্ধান্ত নেয় চ্যানেল কর্তৃপক্ষ।

ভুতু : ছোটদের নিয়ে বানানো ধারাবাহিক “ভুতু” “জি বাংলা” চ্যানেলের এক অন্যতম নিবেদন। ছোট্ট এক বাচ্চা ভূত এবং তার কর্মকাণ্ড নিয়ে কার্যত এগিয়ে চলে ধারাবাহিকের গল্প। এই ধারাবাহিকটি অনেকাংশে বাংলা টেলিমিডিয়ার কমেডি হরর ক্যাটাগরির ধারাবাহিক ছিল। “ভুতু” ধারাবাহিকের দৌলতে সিনে ইন্ডাস্ট্রির খুদে প্রতিভা আরশিয়া মুখার্জিও মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই দর্শকদের অত্যন্ত পছন্দের শিশুশিল্পী হয়ে ওঠে। ধারাবাহিকটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে হিন্দিতেও এর রিমেক করা হয়। সেখানেও “ভুতু”র চরিত্রে অভিনয় করেছে আরশিয়া।

কুসুম দোলা : এক ত্রিকোণ প্রেমের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে “স্টার জলসা”য় শুরু হয়েছিল “কুসুমদোলা” ধারাবাহিকটি। মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ঋষি কৌশিক (রনো) , মধুমিতা সরকার (ইমন) এবং অপরাজিতা ঘোষ দাস (রূপকথা)। “রনো“, “ইমন” এবং “রূপকথা”র জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতের গল্প নিয়েই দুই বছর ধরে স্টার জলসায় রমরমিয়ে চলছে “কুসুমদোলা” ধারাবাহিকটি। ২০১৬-২০১৮ সাল পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে সমকালীন অন্যান্য ধারাবাহিক টেক্কা দিয়ে টিআরপির দৌড়ে বেশ এগিয়ে গিয়েছিল “কুসুম দোলা”।

ওগো বধূ সুন্দরী : “স্টার জলসা”র এভারগ্রীণ বাংলা ধারাবাহিকের মধ্যে বহুল চর্চিত ধারাবাহিক “ওগো বধূ সুন্দরী”। শুধু স্টার কেন, “জি বাংলা” এবং তৎসহ অন্যান্য যেকোনো টেলিমিডিয়ার সমকালীন সকল ধারাবাহিককে পেছনে ফেলে দিয়ে দর্শকের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল “ললিতা-ঈশান” জুটি। যৌথ পরিবারের মোড়কে মোড়া ধারাবাহিকের প্রেক্ষাপট বাঙালির বরাবরের প্রিয়। যে মেয়েটা কোনদিনও মায়ের ভালোবাসা পায়নি, যে মেয়েটা ভীষণ মুডি, অভিমানী, বদমেজাজি, এককথায় অবাধ্য, সে কেমন ভাবে শ্বশুরবাড়ির সকল সদস্যের ভালোবাসা পেয়ে একটি যৌথ পরিবারের “বধূ” হিসেবে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে, সেই নিয়েই ঘটেছিল গল্পের বিস্তৃতি। “ললিতা-ঈশান” জুটিতে অভিনয় করেছিলেন ঋতাভরী চক্রবর্তী এবং রাজদীপ গুপ্ত। এছাড়াও ধারাবাহিকের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন তুলিকা বসু, যিনি শাশুড়িরাও কিভাবে মা হয়ে উঠতে পারেন সেই বার্তা দিয়েছিলেন সমাজকে। ধারাবাহিকটি আজও সিনে অনুরাগীদের নস্টালজিক করে তোলে।

ইরাবতীর চুপকথা : “স্টার জলসার”ই অপর এক জনপ্রিয় ধারাবাহিক ছিল “ইরাবতীর চুপ কথা”। পরোপকারী, নিঃস্বার্থ, ভালো মনের মেয়ে “ইরাবতী” মা বাবাকে হারানোর পর নিজেই নিজের বোনেদের দায়িত্ব নিয়েছে। এরপর তার জীবনে আসে “আকাশ”। স্বভাবে রাগী, একরোখা, জেদী “আকাশ” এর সঙ্গে একেবারেই বিপরীত স্বভাবের “ইরাবতী”র অনস্ক্রিন কেমিস্ট্রি দর্শক বেশ উপভোগ করেছেন।

পটল কুমার গানওয়ালা : ছোটদের নিয়ে নির্মিত এই ধারাবাহিকটিও দর্শকের বেশ পছন্দের ধারাবাহিক ছিল। গ্রামের একটি ছোট্ট মেয়ে “পটল” শহরে নিজের বাবাকে খুঁজতে আসে। শহরের প্রতিষ্ঠিত গায়কের মেয়ে “পটল” নিজেও খুব ভালো গান করতে পারে। ছোট্ট মেয়েটি নিজের পরিচয় গোপন করে কিভাবে শেষমেষ নিজের বাবার খোঁজ পায় এবং তার পরবর্তী সময়ে শহরে তাকে যে ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তা দর্শকের চোখে কার্যত জল এনে দেয়।

কিরণমালা : “স্টার জলসা”র রূপকথা মূলক ধারাবাহিক “কিরণমালা”ও ছোট থেকে বড় সকলেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অচিনপুরের রাজকুমারী “কিরনমালা”র জীবন কাহিনী, “কটকটি”, “প্যাকাটি”র মতো অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে তার লড়াই নিয়েই কার্যত রূপকথা মূলক এই ধারাবাহিকটির সম্প্রচারণ শুরু হয় ছোটপর্দায়। এই ধারাবাহিকে অভিনয় করার দৌলতে অভিনেত্রী রুকমা রায় “কিরণমালা” হিসেবে দর্শকের কাছে প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেন।

বোঝে না সে বোঝে না : ধারাবাহিকপ্রেমীদের অন্যতম পছন্দের সিরিয়াল ছিল “বোঝে না সে বোঝে না”। “অরণ্য-পাখি”র জুটি দর্শকের কাছে আজও এভারগ্রীন জুটি হয়ে রয়েছে। সহজ-সরল, হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল স্বভাবের “পাখি” এবং রাগী বদমেজাজী অহংকারী “অ্যাংরি ইয়ং ম্যান” “অরণ্য সিংহ রায়” এর অনস্ক্রিন কেমিস্ট্রি দর্শকের ভীষণ পছন্দের ছিল। ধারাবাহিকে “পাখি”র চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অভিনেত্রী মধুমিতা সরকার। “অরন্যের” চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অভিনেতা যশ দাশগুপ্ত।

তুমি আসবে বলে : “স্টার জলসা”র অন্যতম জনপ্রিয় ধারাবাহিক ছিল “তুমি আসবে বলে”। গতানুগতিক ধারাবাহিকের গল্পের বাইরে গিয়ে এক নতুন আঙ্গিকে অনবদ্য এক প্রেম কাহিনীকে কেন্দ্র করে “তুমি আসবে বলে” ধারাবাহিকের গল্প নির্বাচন করা হয়েছিল। ধারাবাহিকের প্রধান দুই চরিত্র “রাহুল” এবং “নন্দিনী” কিভাবে সংসারের সকল ষড়যন্ত্র কাটিয়ে নিজেদের সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, তাই ছিল এই গল্পের মূল প্রতিপাদ্য।

ভালোবাসা ডট কম : “স্টার জলসা”র জনপ্রিয় ধারাবাহিকগুলির মধ্যে স্কুল জীবনের প্রেম নির্ভর ধারাবাহিক “ভালোবাসার ডট কম” দর্শকের অত্যন্ত পছন্দের ধারাবাহিক হয়ে ওঠে। ধারাবাহিকের “ওম-তোড়া” জুটিকে আজও মনে রেখেছেন দর্শক। স্কুল জীবনের প্রেম, প্রতিশ্রুতি, বন্ধুত্ব, ভালোবাসার গল্প নিয়েই ধারাবাহিকের গল্প নির্বাচন করা হয়েছিল।

বিন্নি ধানের খই : ২০০৯ সালে “ইটিভি বাংলা” চ্যানেলে সম্প্রচারণ শুরু হয় এই ধারাবাহিকের। বাংলার বিখ্যাত চিত্রনাট্যকার লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখনীতে ধারাবাহিকের গল্পে উঠে আসে গ্রামের সহজ-সরল অথচ বুদ্ধিমতী মেয়ে “মোহর” বিয়ের পর শহরে গিয়ে শহুরে পরিবেশের সঙ্গে কেমন ভাবে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে এবং শ্বশুর বাড়িতে তাকে কত ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করতে হয়। মোহরের সঙ্গে তার স্বামী “রোহন”র সম্পর্ক, ভুল বোঝাবুঝি এবং বিচ্ছেদ নিয়েই কার্যত ধারাবাহিকের গল্পের রথ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছিল। “মোহর”র চরিত্রে অভিনয় করেছেন অভিনেত্রী মনামি ঘোষ এবং তার স্বামী “রোহন”র চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন মনোজ ওঝা। এই ধারাবাহিকটিও তৎকালীন সময়ে দর্শকদের থেকেই বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছিল।

বয়েই গেল : বাংলায় ঘটি-বাঙালের সংঘাত এক অন্যতম চর্চার বিষয়বস্তু। মোহনবাগান বড় না ইস্টবেঙ্গল! ইলিশের পাতুরি বড় নাকি চিংড়ির মালাইকারি! এই নিয়ে ঘটি-বাঙালের মনোমালিন্য কখনো শেষ হওয়ার নয়। সেই আঙ্গিক থেকেই “জি বাংলা” দুই ঘটি এবং বাঙাল পরিবারের খুনসুটি, অশান্তি, নিত্য নৈমিত্তিক ঝগড়া থেকেই কার্যত কমেডি ধারাবাহিক বয়েই গেল এর সম্প্রচার করতে শুরু করে।

সুবর্ণলতা : আশাপূর্ণা দেবীর ট্রিলজি উপন্যাসের দ্বিতীয় খন্ড সুবর্ণলতা অবলম্বনে “জি বাংলা” ২০১০ সালে নারী জীবন কেন্দ্রিক এই ধারাবাহিকটিকে লঞ্চ করে। সংসারের যাঁতাকলে পিষ্ট মুক্তমনা, স্বাধীনতাকামী, বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের এক বঙ্গবধূর গল্প শোনায় “সুবর্ণলতা”, যে সংসারের যেকোনো বিষয়কে নির্দ্বিধায় মেনে নেওয়ার বদলে তার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার সাহস রাখতো। এই ধারাবাহিকে সঙ্গে বাংলার প্রত্যেক গৃহবধূই যেন তৎকালীন সময়ে নিজের জীবনের মিল খুঁজে পেতেন। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রেক্ষাপটের নারী চরিত্র “সুবর্ণলতা” জীবনের সঙ্গে অনেকাংশে নিজের জীবনের মিল খুঁজে পেয়েছিলেন তৎকালীন মহিলারা। ধারাবাহিকের জনপ্রিয়তা বিবেচনা করে গতবছর লকডাউন কালে “সুবর্ণলতা” ধারাবাহিকটি জি বাংলা পুনরায় সম্প্রচারণ শুরু করে।