গরিবের ভগবান “মেডিসিন বাবা”, ওষুধ ভিক্ষা করে বাঁচিয়েছেন হাজার হাজার প্রাণ

ইনি প্রতিদিন ওষুধের একটি ব্যাগ নিয়ে দিল্লির রাস্তায় বেরোন৷ তারপর অব্যবহৃত ওষুধ সংগ্রহ করে সেইসব মানুষদের মধ্যে দান করেন যারা মূল্যবান চিকিৎসা বহন করতে অক্ষম৷ এমন মানুষদেরই তিনি ওষুধ দিয়ে সাহায্য করেন যাদের সবচেয়ে বেশি পরিমাণে ওষুধের প্রয়োজন হয় তাদের৷ এনার নাম ওঙ্কার নাথ শর্মা ওরফে "মেডিসিন বাবা"

সারা বছর ধরেই আমরা ভুগি নানা রকম রোগে। বাড়িতে জড়ো হয় হরেকরকমের ওষুধ।সময়ের সাথে সাথে এইসব ওষুধ পড়েই থাকে আলমারির অন্ধকার ড্রয়ারে। তারপর এক্সপায়ারি ডেট পেরিয়ে গেলে তাদের জায়গা হয় ডাস্টবিনে।আর এইভাবেই আমরা প্রতি বছর কত নষ্ট করে দিই অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কতো ওষুধ। সেইসব ওষুধই কোনো গরিব দুঃস্থ  মানুষের প্রাণ বাঁচাতে পারতো। আর এই চিন্তা ধারায় তার সমস্ত জীবনকে উৎসর্গ করেছেন বছর ৮০এর একজন কর্মযোগী।নাম ওঙ্কার নাথ শর্মা। মেডিসিন বাবা নামেই সুপরিচিত।

সংসার বলতে আছে স্ত্রী এবং এক মানসিক ভারসাম্যহীন ছেলে। কর্মজীবনে তিনি একজন ছিলেন উত্তর প্রদেশের গ্রেটার নইডার কৈলাস হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকের একজন টেকনিশিয়ান। চেষ্টা করলে তিনি তার বার্ধক্য জীবন খুব আনন্দেই পরিবারের সঙ্গে কাটাতে পারতেন। কিন্তু তবুও এই বয়সেও যিনি সারাদিনে ৫ থেকে ৬কিমি অনায়াসে হেঁটে বেড়ান।এক মহল্লা থেকে আরেক মহল্লা।যার লক্ষ্য একটাই,প্রত্যেক বাড়িতে পড়ে থাকা অব্যবহৃত ওষুধ যাদের এখনও নষ্ট হওয়ার সময়সীমা অতিক্রম হয় নি তা জোগাড় করা এবং তা প্রয়োজনীয় গরিব লোকেদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করা।

আর এই কাজ তিনি করে আসছেন গত ১০ বছর ধরেই।তার কথায়,”আমি এই কাজে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম যখন ২০০৮ সালে দিল্লি মেট্রোর একটা নির্মীয়মান ব্রিজ ভেঙে পড়েছিল, এবং সেইসময় দুইজন শ্রমিকের মৃত্যু হয় এবং অনেকেই আহত হয়েছিল।কিন্তু স্থানীয় হাসপাতালে শুধু প্রাথমিক চিকিৎসা করে আহতদের ছেড়ে দিয়েছিল। তাদের ক্ষত স্থান ঠিক করার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধও তারা আহত লোকেদের দেয় নি।আর তখন থেকেই আমি মনে মনে ঠিক করে নি, এইসব গরিব মানুষদের  জন্য দরকারি ওষুধের ব্যবস্থা আমাকে করতেই হবে।আর তারপর থেকেই আমার পথ চলা।

গেরুয়া কুর্তা  পরে তিনি রোজ সকাল ৬টায় বেরিয়ে পরেন কাঁধে এক ঝোলা নিয়ে তার দিল্লির মঙ্গলপুরী বস্তি এলাকার ভাড়া বাড়ি থেকে। তারপর প্রত্যেক বাড়ি বাড়ি ঘুরে সংগ্রহ করেন অব্যবহৃত ওষুধ। উচ্চ স্বরে হাঁকেন “যো দাওয়াইয়া আপকে কামমে নেহি আ রাহি হ্যাঁয় দান কিজিয়ে/ কৈ বেকার কে দাওয়াইয়া দান করেঙ্গে।’ তারপর সেইসব জোগাড় করা ওষুধ তিনি দরকারি হাসপাতালে বা বিভিন্ন এন জি ও তে বা ক্লিনিকে বিনামূল্যে বিতরণ করেন। তার ১২বছর বয়সে একবার গাড়িতে দুর্ঘটনা ঘটায় পায়ে আঘাত পেয়েছিলেন তিনি তবুও তিনি সামনাসামনি পথ পায়ে হেঁটে যাতায়াত করেন।তিনি টাকা জমানোর জন্য অনেক সময়  দিল্লি মেট্রো ব্যবহার করেন না।আর দূরের জায়গা যাওয়ার জন্য ব্যবহার করেন বাসের যেখানে সে বয়স্ক কার্ডে ভাড়ার উপর পান ছাড়।তিনি ওষুধ নেওয়ার পর তার নাম, নষ্ট হওয়ার সময়সীমা, ওষুধ প্রাপ্তির স্থান সবসময় লিখে রাখেন তার কাছে থাকা খাতায়।

তার এই কাজের স্বীকৃতি তিনি নানা ভাবেই পেয়েছেন। ২০১৬ সালে দিল্লি সরকারের কাছ থেকে তিনি “দিল্লি গৌরব” পুরস্কার পান। এই মহান মানুষটির মহান কাজের প্রতি আমরা তখনই সম্মান জানাতে পারবো যখন আমাদের বাড়িতে নষ্ট হতে বসা অনেক অন্যের প্রয়োজনীয় ওষুধ আমরা যখন দুঃস্থ গরিব যাদের এইসব ওষুধ প্রয়োজন তাদের দান করতে পারবো বা দান করবো।আমাদের সবার মিলিত প্রয়াসের ফলে সকল মানুষ পাক উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবা।মানবতার বন্ধন হোক আরও দৃঢ় ।এইসব মানুষ আমাদের করুক আরও অনুপ্রাণিত।

মেডিসিন বাবার স্বপ্ন এক মেডিসিন ব্যাঙ্ক তৈরি করার। চ্যারিটি হাসপাতালে দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা তো হয় কিন্তু ঔষধ কেউই দেয় না। ওংকার নাথের কাজ ভিক্ষা করে সংগৃহীত ঔষধ সেই সব হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া। হাসপাতালের ডাক্তার পরিক্ষা করেন ওংকার নাথের আনা ঔষধ। ঔষধ গুলোকে এনে খাতায় লেখা,  হিসাব রাখা, আলাদা করা সবই করেন ওঙ্কার নাথ। অনেক ডাক্তারের ক্লিনিকে ওঙ্কার নাথের নাম লেখা আছে ঔষধ ডোনার হিসাবে। জীবন দায়ী ঔষধে আজ কতো মানুষের প্রান বাঁচছে ওঙ্কার নাথের জন্যে, পৌঁছে যাচ্ছে দরকারি ঔষধ যেখানে পৌঁছনোর দরকার।