ফুটপাতে শুয়ে ভিক্ষা করে দিন কেটেছে, ভারতের প্রথম কিন্নর বিচারপতির জীবন যেন সিনেমা

যুগ বদলাচ্ছে, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সমাজের চিন্তাধারারও পরিবর্তন আসছে। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ জয়িতা মন্ডল (Jayita Mondal)। এখন তার পরিচয় শুধু এটা নয় যে তিনি একজন বৃহন্নলা (Transgender), বরং রাজ্য তথা সমগ্র দেশের প্রথম কিন্নর বিচারপতি হিসেবেই তিনি আজ সমগ্র দেশে পরিচিতি পেয়েছেন। সমাজের বাঁকা নজর, তির্যক মন্তব্য উপেক্ষা করে আজ তিনি নিজের অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছেন। সমাজ আজ সমীহের চোখে দেখে তাকে।

তবে একটা সময় ছিল যখন উঠতে বসতে কটাক্ষের সম্মুখীন হতে হয়েছে তাকে। ঠিক যেমনভাবে আর পাঁচটা বৃহন্নলার সঙ্গে হয়ে থাকে। একবিংশ শতাব্দীর এই যুগেও তথাকথিত আধুনিক মনস্করা বৃহন্নলাদের সমাজে আলাদা জায়গা করে দিতে চান না। উপেক্ষা, অপমান, কটাক্ষ তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। জয়িতাকেও একসময় সেই কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল। তবে তিনি ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। সমাজের চোখে চোখ রেখে আজ সারা দেশের প্রথম কিন্নর বিচারপতি হয়েছেন তিনি। তাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছেন হাজার হাজার কিন্নর।

Transgender-activist-Joyita-Mondal

কলকাতার এক হিন্দু বাঙালি পরিবারে জন্মেছিলেন জয়িতা। আর পাঁচটা ছেলে মেয়ের মতোই বড় হয়ে উঠছিলেন তিনি। তবে একটু বড় হতেই তার অস্তিত্ব, পরিচয় নিয়ে উঠতে লাগলো প্রশ্ন। স্কুলে তাকে নিয়ে কটাক্ষ করতেন সহপাঠীরা। সমাজের নিত্য গঞ্জনা এমনকি পরিবারের সদস্যদের উপেক্ষা ছিল তার নিত্যসঙ্গী। আর পাঁচটা সাধারণ পরিবারের মতো জয়িতাকে বুঝতে চাননি তার পরিবারের একান্ত আপনজনেরাও।

স্কুলে থাকাকালীন মেয়েদের মতো হাবভাব, সাজগোজ করা নিয়ে স্কুলের অন্যান্য ছেলেরা তাকে নিয়ে মজা করতো। যে কারণে এক সময় বাধ্য হয়ে স্কুলে যাওয়াই ছেড়ে দেন তিনি। দশম শ্রেণীতে পড়াকালীনই স্কুল থেকে ড্রপ আউট হয়ে যান জয়িতা। সমাজের উপেক্ষা, কটাক্ষ তো ছিলই, পরিবারের সদস্যরাও তাকে ঘৃণা করতে শুরু করেন। এই সমাজে তিনি যেন ব্রাত্য! তার জন্য কোনও আলাদা জায়গা যেন থাকতেই নেই। তাইতো বাড়িতেও টিকে থাকতে পারেননি তিনি।

স্কুল ছেড়ে বাড়িতে থাকাও তার পক্ষে সম্ভবপর হয়নি। তাই শেষমেষ বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসার আগে তিনি তার মাকে বলে এসেছিলেন তিনি উত্তর দিনাজপুর যাচ্ছেন কাজের খোঁজে। সেই যে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন, আর ঘরে ফেরেননি জয়িতা। তখন থেকে পথই হয়েছিল তার চলার সঙ্গী। কখনও বাসস্ট্যান্ডে, কখনও বা ফুটপাতেই রাত কাটিয়েছেন তিনি। দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন জোগাড়ের জন্য রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ভিক্ষাও করতে হয়েছিল।

JAYITA TRANSGENDER JUDGE

এইভাবে রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করতে করতেই একসময় ইসলামপুরে পৌঁছে যান জয়িতা। ইসলামপুরের ট্রান্সজেন্ডার কমিউনিটির সদস্য হয়েছিলেন তিনি। সেই কমিউনিটির সদস্য হিসেবেই কাজ করতেন। তবে মনে মনে সমাজের মুখোমুখি দাঁড়ানোর প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন তিনি। তাইতো আবার নতুন করে পড়াশোনা শুরু করেন জয়িতা। কারণ তিনি জানতেন, পড়াশোনা ছাড়া নিজের অধিকার পাওয়া সম্ভব হবে না। তাই আবার মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসেন তিনি। উত্তীর্ণ হয়ে ল’তে ভর্তি হন।

২০১০ সালে তিনি ল-এর ডিগ্রি অর্জন করে নেন জয়িতা। এরপর শুরু হয় তার আরেক লড়াই। বহু বাধা-বিপত্তি, ঝড়ঝাপটা উপেক্ষা করে শেষমেষ ২০১৭ সালের ৮-ই জুলাই থেকে উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুর লোক আদালতের বিচারপতির আসনে বসেন জয়িতা। ছোট থেকেই সংগ্রাম করতে শিখেছিলেন। সমাজসৃষ্ট বাধা-বিপত্তির মধ্য দিয়েই কাটিয়েছেন কৈশোর, যৌবন। তাই তো যখন সমাজের থেকে নিজের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার সময় এলো, তখন কোনও বাধাই তাকে ফেরাতে পারেনি। দিনাজপুর নতুন আলো নামের একটি সংস্থা রয়েছে তার। সেই সংস্থার ২২০০জন বৃহন্নলার জীবনেও আলোর পরশ পৌঁছে দিয়েছেন যিনি, তিনি তো প্রকৃত অর্থেই জয়ী।