বাংলার মাটিতে ফুংসুক ওয়াংড়ুর মতো একটি স্কুল খুলেছেন এক বাঙালি

‘থ্রি ইডিয়টস’-এর ফুংসুক ওয়াংড়ুকে মনে আছে? যে শেখার আনন্দে শিখতে বলত! পাহাড়ের কোলে শিশুদের জন্য চালাতেন এক অন্য ধারার স্কুল। যেখানে পড়ুয়ারা অর্জিত বিদ্যা হাতেকলমে প্রয়োগ করত। নিজের মতো করে ভাবার সুযোগ পেত তারা। বাস্তবে তেমনই একটি স্কুল খুলেছেন বীরভূমের সিউড়ির ভূমিপুত্র অর্ঘ্য বন্দ্যোপাধ্যায়। গতানুগতিক শিক্ষা শিশুদের কচি মনকে কিছু না বুঝে মুখস্থ বিদ্যা এবং একঘেঁয়েমির দিকে টেনে নিয়ে যায়। শিক্ষার এই পথকেই চ্যালেঞ্জ করেন অর্ঘ্য। অর্ঘ্যের স্কুলের নাম ‘লেভেলফিল্ড স্কুল’। জাতীয় স্তরে অ্যাসেট টেস্টের ফল অনুযায়ী বীরভূমের এই স্কুল দেশের সেরা দশটি স্কুলের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। উপনগরীর একটা নতুন স্কুল যেখানে বাচ্চাদের মধ্যে ইংরেজির নুন্যতম জ্ঞানও নেই, সেখানে এই ফল একটা বিরাট পাওনা। শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১১য় ‘সংকল্প’ পুরস্কার পায় লেভেলফিল্ড স্কুল।


শহর এবং গ্রামের স্থানীয় বাচ্চাগুলিকে সাধ্যের মধ্যে উচ্চমানের শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে লেভেলফিল্ড স্কুলের পথচলা শুরু হয়। অর্ঘ্যর মনে পড়ে, ‘ইকুইটি রিসার্চ আউটসোর্সিং সংস্থা ইরেভনার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে আমি সংস্থার নিয়োগ এবং ট্রেনিংয়ের দিকটা দেখছিলাম। ৫ বছরে ইরেভনা ১০০ কোটির সংস্থায় গিয়ে দাঁড়ায়, কর্মী সংখ্যা ছিল ৫০০। যেটা দেখে অবাক হয়েছিলাম সেটা হল বেশিরভাগ গ্র্যাজুয়েটই চাকরির জন্য মোটেও তৈরি নন। তাদের ভাবনাচিন্তা, লেখা এবং কথাবার্তা বলার জন্য প্রাথমিক ধারণাগুলি শেখাতে হয়েছিল। ২৫-২৬ বছরে চাকরি করতে আসা ছেলে মেয়েদের এই সব শেখানো মানে ততদিনে অনেকটাই দেরি হয়ে গিয়েছে। স্কুলে থাকতেই যা শিখে নেওয়া উচিত।’ অর্ঘ্যর উপলব্ধি, ‘বেশিরভাগ চাকরিপ্রার্থীই খুব বেশি পড়াশোনা করে না। পড়াশোনা না থাকলে কোনও কিছু সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানও থাকে না।’

২০০৭ সালে একমাত্র মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করতে গিয়ে হল বিচিত্র অভিজ্ঞতা হল অর্ঘ্যের। দেখলেন বেশির ভাগ স্কুলেই ফলাও করে বলা হয়েছে তাদের অত্যাধুনিক ইনফ্রাস্ট্রাকচারের কথা। কিন্তু টিচিং ফিলোসফি নিয়ে কোনও উচ্যবাচ্যই নেই! এই বিরক্তি থেকেই নিলেন একটি সিদ্ধান্ত। কর্মক্ষেত্রে একটি প্রতিষ্ঠিত চাকরিকে বিদায় জানিয়ে নতুন পথে পা বাড়ালেন আইআইটি খড়গপুর এবং আইআইএম আমদাবাদের প্রাক্তনী। তাঁর কথায়, ‘আমি এমন একটি স্কুল তৈরি করতে চেয়েছিলাম যেখানে পড়াশোনার প্রতি একটি প্র্যাক্টিকাল অ্যাপ্রোচ থাকবে।

meet-arghya-banerjee-the-real-life-phunsukh-wangdu

আচ্ছা বলুন তো তৃতীয় পানিপতের যুদ্ধের ঘটনা বিবরণী জেনে এখন আমরা কী করব! না বুঝে শুধুমাত্র পাশ করে ক্লাসে ওঠার জন্যে পড়াশোনা নয়, সহজ সরল ভাষায় সত্যি জ্ঞান অর্জনে উত্‍‌সাহ দেওয়াতেই আমি বিশ্বাসী। বাচ্চাদের বেশ কয়েকটি ক্লাসিকস যেমন গালিভার্স ট্র্যাভেল, দ্য প্রিন্স অ্যান্ড দ্য পপার-এর মতো বইকে নতুনভাবে লিখেছি এবং শেষে যোগ করেছি বেশ কিছু ওপেন এন্ডেড প্রশ্ন যাতে বাচ্চাদের মনে জিজ্ঞাসা তৈরি হয়। এবং সেই জিজ্ঞাসার হাত ধরে তারা পেয়ে যায় নতুন কিছুর সন্ধান। গত তিন বছর ধরে আমি এবং আমার স্ত্রী এই স্বপ্নকে সত্যি করার জন্যে কষ্ট করেছি। নতুন সিলেবাস তৈরি করেছি।যা স্বয়ংসম্পূর্ণ। আপাতত লোয়ার কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে ক্লাস সিক্স পর্যন্ত পড়ানো হয়। মাসিক মাইনে ১৬০০ থেকে ৩০০০।’

meet-arghya-banerjee-the-real-life-phunsukh-wangdu
এই স্কুল পড়ুয়াদের মধ্যে থিংকিং ওরিয়েন্টেশন বাড়ানোর জন্যে বিভিন্ন অ্যানালেটিকাল পাজলও যোগ করা হয়েছে সিলেবাসে। এই সবের মধ্যে যেমন রয়েছে সুদোকু, ন্যানোগ্রাম এবং শিকাকু তেমনই রয়েছে জাপানি স্ট্র্যাটেজি গেমস গো এবং গোমোকু।
আগামী দিনে অন্য জেলা এবং কলকাতাতেও লেভেলফিল্ডের শাখা খোলার পরিকল্পনা রয়েছে। একবার এই মডেল সফল প্রমাণিত হলে বিভিন্ন ব্যবসায়ীক সংস্থার সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় শাখা খোলার ইচ্ছে আছে অর্ঘ্যর। বিভিন্ন পাঠ্য এবং নানা ধরনের অংকের জন্য প্রযুক্তির মাধ্যমে অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করতে চান অর্ঘ্য এবং আইফোন ও অ্যানড্রয়েডের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর।

meet-arghya-banerjee-the-real-life-phunsukh-wangduআইআইটি খড়গপুর এবং আইআইএম আমদাবাদের এই প্রাক্তনী বলেন, ‘পরীক্ষা পদ্ধতিতে সবচেয়ে বড় বদল দরকার। পরীক্ষা পদ্ধতি বদলানো গেলে, সবকিছু আপনা আপনি বদলে যাবে। মুখস্থ বিদ্যার ওপর নির্ভর করে যদি পরীক্ষায় বসা হয় তাহলে যতই শেখানো হোক না কেন বোঝার সঙ্গে সঙ্গে শেখা কখনই হবে না। আমরা ভারতীয়রা বড্ড বেশি পরীক্ষা নির্ভর। পরীক্ষাটাকে যদি চিন্তা নির্ভর করে দিতে পারি, তাহলেই তরুণ প্রতিভার সম্পূর্ণ বিকাশ ঘটবে।’