স্ত্রীর স্মৃতিতে “মিনি তাজমহল” গড়েছেন ‘আজকের শাহজাহান’ ৮৩ বছরের বৃদ্ধ পোষ্টমাস্টার

স্ত্রীর প্রতি প্রেম অনেকেই করেছেন, কিন্তু শাহজাহানের মতো নয়। তিনি তার প্রেমকে অমর করেছিলেন এক এবং অদ্বিতীয় স্মৃতিসৌধের মাধ্যমে, যা সারা বিশ্বে পরিচিত তাজমহল পরিচিত নামে। আর এটি বর্তমানে বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্য স্থাপত্যের মধ্যে একটি এবং ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় স্থাপত্য ও পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিবছর ১০ লক্ষের বেশি পর্যটক এই স্মৃতিসৌধ দেখতে আসেন এবং মুগ্ধ হয়ে যান অপরূপ স্থাপত্যের নিদর্শন দেখে।

স্ত্রীর স্মৃতিতে "মিনি তাজমহল" গড়েছেন 'আজকের শাহজাহান' ৮৩ বছরের বৃদ্ধ পোষ্টমাস্টার

মুঘল সম্রাট শাহজাহান  হয়তো একজন একছত্র রাজা বা সম্রাট হওয়ার সুবাদে এই কাজটি করতে পেরেছিলেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে, যেখানে তার চিন্তা ছিল না এই অপরূপ এই অপরূপ স্থাপত্য নির্মাণের খরচ নিয়ে।আর তাই বিশ্বের দক্ষতম শিল্পী এবং মূল্যবান পাথর,মনি ,মুক্তা দিয়ে তৈরি হয়েছে এই অপরূপ সৃষ্টি। আর তাই এইরকম অন্য আরেক স্থাপত্য সারা বিশ্বজুড়ে খুঁজে পাওয়া যায় না যেখানে ভালোবাসার এরকম চরম নিদর্শন দেখা যায়। ইতিহাসের এই প্রেমের কাহিনী যেভাবে ছড়িয়েছে তাতে অনেক প্রেমিক যুগল  তাদের প্রেমকে অমর করার জন্য এইরকম কোন স্থাপত্য নির্মাণ এ চেষ্টা করেছেন তা আমরা ইতিহাস পড়ে হয়তো পাই না না।

স্ত্রীর স্মৃতিতে "মিনি তাজমহল" গড়েছেন 'আজকের শাহজাহান' ৮৩ বছরের বৃদ্ধ পোষ্টমাস্টার

কিন্তু বর্তমান সময়ে এমনই এক অদ্ভুত প্রেমের নিদর্শন সৃষ্টি করে নিজেকে সকলের সামনে তুলে ধরেছেন আর এক মহান প্রেমিক। তিনিও তাঁর স্বর্গীয় স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনে নির্মাণ করেছেন একটি “মিনি তাজমহল”। যদিও এই তাজমহল ইট বালি সিমেন্টের যা  কিন্তু শাহজাহানের নির্মিত তাজমহলের সামনে এর কোন তুলনা চলে না ।কিন্তু তিনি দেখিয়েছেন প্রত্যেক মানুষই ভালবাসতে জানে ।আর নিজের সাধ্যমত চেষ্টা করে সে ভালোবাসাকে প্রদর্শন করতে।  একজন সামান্য পোস্টমাস্টার হয়ে এই মানুষটি যা করেছিলেন তা একপ্রকার অসম্ভব বলে মনে হয় অনেকেরই। কিন্তু প্রেম মানুষকে সবকিছু করতে শেখায় আর তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ এই মানুষটির তৈরি” মিনি তাজমহল”।

Loading...

ফাইজল হাসান কাদেরী যিনি তার সামান্য পোস্ট মাষ্টার চাকরির সঞ্চয়ের অর্থ থেকে নিজের স্বর্গীয় স্ত্রীর প্রতি প্রেম প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে “মিনি তাজমহল” নির্মাণ করে পরিচিতি পেয়েছিলেন।তারও শেষ ইচ্ছে মতো তাকেও কবরস্থ করা হয়েছে তার স্ত্রীর সমাধি ক্ষেত্র” মিনি তাজমহলেই”।গত বৃহস্পতিবার এই বছর ৮৩ এর বৃদ্ধ মানুষটি এক পথ দুর্ঘটনায় মারাত্নক ভাবে জখম হয়েছিলেন পশ্চিম উত্তর প্রদেশের  বুলন্দশহর জেলায় নিজের গ্রামে কসার কালনে।তারপর তাকে এক বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যেখানে তিনি তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন ।

তার  ভাইপো মোহাম্মদ আসলাম সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন,”গত বৃহস্পতিবার রাত্রি ১০.৩০টার সময় কাকা তার বাড়ির বাইরে ঘুরতে বেড়িয়েছিল, তখনই একটি অপরিচিত গাড়ি তাকে পেছন থেকে ধাক্কা মারে এবং কাকা গুরুতর জখম হয়ে যায়।আমি তখন বাড়ির বাইরে ছিলাম এবং আমাকে এই খবর জানানোর পর আমি ঘটনাস্থলে ছুটে আসি এবং প্রথমে কাকাকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যায়, সেখানে থেকে আলিগড় এ নিয়ে যায়। সেখানে এক বেসরকারি হাসপাতালে শুক্রবার বেলা ১১টার সময় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। যদিও গত ২বছর আগে কাকা সাইকেল থেকে পড়ে একবার আঘাত পেয়েছিল। তারপর থেকে যখনই বাইরে বের হত তখনই তার সঙ্গে কেউ সঙ্গী হিসেবে থাকত। কিন্তু কিভাবে এই দুর্ঘটনা ঘটে গেল তা আমাদের কাছে এক রহস্যের বিষয়।আমার কাকিমা তাজাম্মুলী বেগম ২০১১সালে গলায় ক্যান্সারের কারণে মারা যায়। তখন আমার কাকা তার স্বর্গীয় স্ত্রীর উদ্দেশ্যে এক “মিনি তাজমহল” তৈরি করেছিল এবং সেই তাজমহলের ভেতরে কাকিমাকে সমাধিস্থ করা হয় ।

কাকাও নিজের জন্য একটু জায়গা  রেখেছিল নিজেকে সমাধিস্থ করার জন্য কাকিমার কবরের পাশে। আর এবার কাকার কথা মত সেই জায়গাতে তাকে সমাধিস্থ করা হয়েছে। কারণ দুই প্রেমীকে আলাদা করে রাখার মত কোন মানসিক ইচ্ছা আমাদের নেই ।এই দুই অভিন্নহৃদয় তাদের মৃত্যুর পরেও যেন পাশাপাশি ঠাঁই পায়, সেই দিকে তারা যেমন বিশেষ ব্যবস্থা করে গিয়েছেন ,সে রকম আমরাও সেটাই করেছি। আর এইখানেই হয়েছে ভালবাসার জয়। কাকার বিয়ে হয়েছিল ১৯৫৩ সালে ।কিন্তু তাদের কোন সন্তান-সন্ততি হয়নি ,তাই কাকিমার প্রতি ভালোবাসা ছিল গাঢ়। আর সেই ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে তৈরি করেছিল এই “মিনি তাজমহল” যা সে সম্পূর্ণভাবে নিজের টাকাতেই তৈরি করেছিল। আজও সেই তাজমহলকে দেখলে তার প্রেমের এবং ভালোবাসার নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যাবে। যেখানে আজও কাকা লাগাতে পারেননি মার্বেল পাথর, কারণ কাকার কাছে সেই রকম টাকার সংস্থান হয়ে ওঠেনি।

ইট, বালি, পাথর ও সিমেন্ট দিয়ে তৈরি তাজমহলের রেপ্লিকা যেন সাধারণ মানুষের ভালোবাসাকে আরো বেশি উজ্জ্বল করে তোলে। ভালোবাসা যে অকৃত্রিম সেখানে এতটুকুও খাদ নেই। তার এরকম ভালোবাসার খবর যখন ছড়িয়ে পড়েছিল সারা রাজ্যে ,তখন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ সিং যাদব কাকাকে  তার “মিনি তাজমহল “গড়ার জন্য আর্থিক রূপে সাহায্য করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু কাকা সে প্রস্তাব সম্মানের সহিত প্রত্যাখ্যান করে। তবে কাকা তার সাহায্য করা  মানসিকতাকে সম্মান জানায়। তার বদলে মহিলাদের কলেজ খোলার জন্য আর্থিক সাহায্যের অনুরোধ জানায়  কাকা তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে।

আরও পড়ুন : এক নতুন শাহজাহানের দ্বিতীয় তাজমহল তৈরির গল্প

পরবর্তী সময়ে মেয়েদের ইন্টার কলেজ খুলতে ৪ বিঘা জমিও কাকা দান করেছিল। এখন সেই কলেজ বর্তমানে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছে। কাকার উদার মানসিকতার পরিচয় অঞ্চলের প্রতিটি মানুষই পেয়েছে ।কাকা যতটুকু সাহায্য করত তা মন থেকেই করত, তাতে ছিল না কোনো বাধ্যবাধকতা ।কাকা মানুষকে ভালবাসতে জানত আর তারই নিদর্শন তার “মিনি তাজমহল”। এই কীর্তি তাকে সম্রাট শাহজাহান এর মতো ইতিহাসের পাতায় অমর করে না রাখলেও আমাদের হৃদয়ে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখবে।”

‘আজকের শাহজাহান’ এর মুখে শুনে নিন “মিনি তাজমহল” বানানোর গল্প

Loading...