২৭ জুলাই শতাব্দীর দীর্ঘতম পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ ; কোথায়, কখন এই চন্দ্রগ্রহণ দেখা যাবে?

একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে দীর্ঘতম চন্দ্রগ্রহণ হতে চলেছে আগামীকাল শুক্রবার। সেদিন চাঁদ ঘুরতে ঘুরতে প্রবেশ করবে একেবারে পৃথিবীর ছায়ার মধ্যে। যার স্থায়ীত্ব হবে ১ ঘণ্টা ৪৩ মিনিট। যা সময়ের দিক থেকে এই শতাব্দীর সবচেয়ে দীর্ঘতম চন্দ্রগ্রহণ। শুধু গ্রহণ হওয়াই নয়, চাঁদ সেদিন সূর্যের আলো বিকিরণ করে লাল হয়ে যাবে। অর্থাৎ ব্লাড মুনও দেখা যাবে একইসঙ্গে।

শুক্রবার রাত 11টা 44 মিনিট থেকে এই গ্রহণ শুরু হবে।

পৃথিবীর সব জায়গা থেকে এই চন্দ্রগ্রহণ দেখা যাবে না। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার মানুষ এই গ্রহণ দেখতে পাবেন না। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের কিছু দেশ থেকে চন্দ্রগ্রহণ দেখা যাবে। এর আগে এত বেশিক্ষণ ধরে চন্দ্রগ্রহণ এই শতাব্দীতে কোনও দিন হয়নি। দেড় ঘণ্টার বেশি সময় চন্দ্রগ্রহণ হয়েছে এমনটা নিশ্চয়ই দেখা গিয়েছে। এবার আরও বেশি সময় লাগবে। ফলে এবারের গ্রহণ নিঃসন্দেহে অভিনব ঘটনা হতে চলেছে। এর আগের চন্দ্রগ্রহণ হয় ২০১১ সালের ১৫ জুন । সেটা ১০০ মিনিট স্থায়ী হয়েছিল।

চন্দ্রগ্রহণ কী?

সৌরজগতে সূর্যের চারিদিকে প্রদক্ষিণ করছে পৃথিবী এবং অন্যান্য আরও গ্রহ।আবার অনেক গ্রহেরই আছে উপগ্রহ।তেমনই চন্দ্র হল পৃথিবীর উপগ্রহ।আর এই উপগ্রহ চন্দ্র পৃথিবীর চারিদিকে প্রদক্ষিণ করে।অর্থাৎ পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে এবং চন্দ্র পৃথিবীর চারিদিকে প্রদক্ষিণ করার সময় একটা বিশেষ সময় তারা এক সরলরেখায় অবস্থান করে যেখানে চন্দ্র ও সূর্যের মাঝে পৃথিবী চলে আসে ফলে সূর্যের আলো চন্দ্রের উপর পড়তে পারে না এবং পৃথিবীর ছায়া চন্দ্রের উপর পড়ে যার ফলে  পৃথিবী থেকে চন্দ্র দেখা যায় না।এই বিশেষ সময়কে বলে চন্দ্র গ্রহণ।চন্দ্র গ্রহণ দুই প্রকার ।এক আংশিক চন্দ্রগ্রহণ ,যেখানে চন্দ্রের কিছুটা অংশ পৃথিবী থেকে দৃশ্যমান হয় এবং বাকি অংশ অদৃশ্য থাকে।আরেকটা হয় পূর্ণগ্রাস  চন্দ্রগ্রহণ,যেখানে সম্পূর্ন চন্দ্র আমাদের দৃষ্টি গোচর হয় না।তবে পৃথিবীর সমগ্র অংশ থেকে পূর্ণগ্রাস চন্দ্র গ্রহণ দেখা যায় না।এটা পৃথিবীর একটা নির্দিষ্ট অংশ থেকেই  দেখা যায় এবং তা দীর্ঘ সময় ধরে হয় না।

“ব্লাড মুন “চন্দ্রগ্রহণ কেন বলা হয়?

আগামী কাল যে পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ হতে চলেছে, এই চন্দ্র গ্রহণ আবার হবে “ব্লাড মুন”। অর্থাৎ এই চন্দ্রগ্রহণ হওয়ার সময় পৃথিবীর বেশ কিছু অংশ থেকে চন্দ্রকে লাল রঙের দেখা যাবে। অর্থাৎ রক্তিম বর্ণের হবে চাঁদ।আসলে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের দ্বারা সূর্যের লাল বর্ণের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের  কম বিক্ষেপন ঘটার ফলে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে যে লাল আলোর আভা দেখা যায় তারই প্রতিফলন দেখা যাবে চন্দ্রের উপর। আর তাই এবার চন্দ্র দেখাবে লালাভ। যা ব্লাড মুন নামে পরিচিত।

চন্দ্র গ্রহণের সময়সূচী?

শতাব্দীর দীর্ঘতম সময় ধরে অর্থাৎ প্রায় ১ ঘন্টা ৪৩ মিনিট সময় বা ১০৩ মিনিট  ধরে পূর্ণগ্রাস অবস্থায় থাকবে চন্দ্র। এই গ্রহণ আনুমানিক ভারতীয় সময় অনুযায়ী শুরু হবে রাত্রি ১১টা ৪৪ মিনিট এ। পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ শুরু হবে গভীর রাত্রি ১টার পর। নির্দিষ্ট হিসাবে বললে রাত্রি ১ টা ১৫ থেকে রাত্রি ২ টো ৪৩ মিনিট পর্যন্ত। এই সময়কাল ধরে পৃথিবীর ছায়া পুরোটাই চন্দ্রের উপর গিয়ে পড়বে। অর্থাৎ চন্দ্র অদৃশ্য হয়ে যাবে এবং লালাভ আভাযুক্ত দেখাবে। এই গ্রহণ চলতে থাকবে ভোর রাত্রি ৪টা ৫৮ পর্যন্ত যদিও লালাভ চন্দ্র দেখার জন্য গভীর রাত্রি ১ টা ১৫ থেকে রাত্রি ৩ টার আগের সময় উপযুক্ত সময় বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ভারতের কোন জায়গা থেকে এই গ্রহণ দেখা যাবে ?

বায়ু দূষণের জন্য ভারতের অনেক মেট্রো শহরগুলিতে এই লালাভ চন্দ্রের শোভা ভালো ভাবে না দেখা গেলেও গ্রামীণ ভারতের অনেক মানুষ এই মহাজাগতিক দৃশ্য সুন্দরভাবে উপভোগ করতে পারবেন। তবে মেঘলা আকাশ থাকলে এই শতাব্দীর সেরা পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ দেখা থেকে বঞ্চিত হবেন অনেকেই। তবে যারা ভালো ভাবে এই ঘটনার সাক্ষী হতে চান তারা টেলিস্কোপ ব্যবহার করতে পারেন। ভারত ছাড়াও এই মহাজাগতিক ঘটনা ভালো ভাবে দেখতে পারবেন মধ্য প্রাচ্য, দক্ষিণ চীন এবং পূর্ব আফ্রিকার বাসিন্দারা।

এই চন্দ্রগ্রহণের বিশেষত্ব?

এই চন্দ্রগ্রহণ এই শতাব্দীর সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ  হতে চলেছে। এরপর আবার দীর্ঘ সময় ধরে পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ হবে ২১১৩ সালের জুন মাসের ৯ তারিখ। এছাড়াও আগামী কাল পূর্ণগ্রাস চাঁদগ্রহনের সময় চাঁদ তার পৃথিবী ঘূর্ণনের কক্ষপথে সবচেয়ে দূরতম বিন্দুতে অবস্থান করবে। আর এর ফলে চাঁদের স্বাভাবিক আকারের তুলনায় আগামী কালের চাঁদ একটু ছোট আকারের মনে হবে। আর “সুপার মুন”হওয়ার সময় চাঁদ যত বড় দেখায় এবার কিন্তু সেরকম দেখাবে না। এবারের চাঁদের আকার অনুযায়ী এই চাঁদকে “মাইক্রো মুন” বলা হবে।

যে দিন আর চন্দ্রগ্রহণ দেখা যাবে না পৃথিবীতে

এক দিন আসবে, যখন পৃথিবী থেকে আর দেখা যাবে না সূর্যগ্রহণ। না, পূর্ণগ্রাস, খণ্ডগ্রাস, বলয় গ্রাস বা সংকর গ্রাস, কোনওটাই নয়। চাঁদ দিয়ে সূর্যের মুখ ঢাকা-চাপা দেওয়া আর সম্ভব হবে না। মুখ লুকোতে পারবে না চাঁদও। তাই সে দিন চন্দ্রগ্রহণও আর দেখা যাবে না আমাদের এই গ্রহ থেকে।

আরও পড়ুন : ১৫০বছর পর আজ আকাশে রঙিন চাঁদ দেখতে পাবেন

কারণ চাঁদ যে আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে দূরে। উত্তরোত্তর। বছরে হাতের নখ যতটা বাড়ে, ফি বছর আমাদের ছেড়ে ততটাই দূরে চলে যাচ্ছে চাঁদ। ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে সূর্যের আরও কাছাকাছি। চাঁদ আছে বলেই তো যাবতীয় গ্রহণের আলো-আঁধারি। তাই সূর্য আর চন্দ্রগ্রহণ, যা নিয়ে আমাদের এত মাতামাতি, আর ৬৫ কোটি বছর পর পৃথিবী থেকে আর সে সব কিছুই দেখা যাবে না।

সাধারণত পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্ব তিন লক্ষ ৮৪ হাজার কিলোমিটার। চাঁদ যেহেতু একটি উপবৃত্তাকার কক্ষপথে ঘোরে, তাই ঘুরতে ঘুরতে কোনও সময় পৃথিবীর কাছে চলে আসে আবার দূরেও চলে যায়। চাঁদ পৃথিবীর সর্বাধিক কাছে তিন লাখ ৫৬ হাজার কিলোমিটারে চলে আসে। আবার দূরে গেলে সর্বাধিক চার লাখ ছয় হাজার কিলোমিটার দূরে চলে যায়। আগামী ২৭ জুলাই পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্বও প্রায় ৪ লাখ ৬ কিলোমিটারের কাছাকাছি থাকবে।

তাই সবাইকেই বলছি এবারের শতাব্দীর অন্যতম দীর্ঘ সময় ধরে হতে চলা পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণের সাক্ষী অবশ্যই হন সকলেই। কারণ কে বাঁচবেন আগামী ২১১৩ সাল পর্যন্ত তা বলা সত্যিই মুশকিল।

সাম্প্রতিক খবর জানতে লাইক করুন আমাদের Facebook পেজ অথবা ফলো করুন Twitter আর Instagram-এ।