শিব ঠাকুর কি সত্যিই গাঁজা খায়, কি বলছে হিন্দু শাস্ত্র

মহাদেবের কথা স্মরণে এলেই, আমাদের মাথায় প্রথম ছবিটাই আসে ধোঁয়া ওঠা গাঁজার কলকে আর ত্রিশূল হাতে বাঘছাল পড়ে একজন তাণ্ডব নৃত্য করছেন। তাঁর সুঠাম শরীর। দূরে পড়ে আছে ডমরু। মাথার জটাজুটে আটকে ভাঙা চাঁদ। কানে ধুতরো ফুল। গলায় পাকানো সাপ। নৃত্যের তালে তালে কেঁপে উঠছে ধরিত্রী।
হাজার হাজার বছর ধরে গাঁজার ব্যবহার। হিন্দু মতে, গাঁজা ভগবান শিবের প্রসাদ। কোথা থেকে এল এই ধারণা? শিবের সঙ্গে কেন জুড়ে দেওয়া হল গাঁজাকে? আলোচনার আগে দেখে নেওয়া যাক বৈদিক ধর্মগ্রন্থগুলি গাঁজাকে নিয়ে কী বলছে।

পাঁচটি পবিত্র গাছের একটি গাঁজা। অথর্ব বেদ অনুযায়ী, গাঁজা উদ্বেগ দূর করে। সুতরাং এটি পবিত্র উদ্ভিদ। আধ্যাত্মিক উপাদান হিসাবে এটি ব্যবহৃত হয়।

কিংবদন্তী অনুযায়ী, সমুদ্র মন্থনে ওঠে অমৃত। লোভে পড়ে দেবতা ও রাক্ষস তা নিতে দৌড়য়। মন্থনে ওঠে  ‘হলাহল’ বিষও। যা এত শক্তিশালী পৃথিবী ধ্বংস করতে পারে। তাই সৃষ্টি রক্ষা করতে সেই বিষ কন্ঠে ধারণ করেন মহাদেব। বিষের প্রভাবে নীল হয়ে যায় তাঁর কন্ঠদেশ। তাই তাঁর নাম ‘নীলকণ্ঠ’। এরপর শিবকে আপ্যায়ন করা হয় ভাঙ দিয়ে।

 আসল কারণ নীচে দেওয়া হল –

শিব কোনও ব্যক্তি নয়। প্রথমেই মহাদেবকে মানুষ-রূপী দেবতা হিসাবে দেখা বন্ধ করতে হবে। এটা ভুল ব্যাখ্যা। শিব হলেন নির্গুণ ব্রক্ষ্মের স্বরূপ। শ্বেতাশ্বেত উপনিষদে বলা হয়েছে,
১) নির্গুন (অর্থাৎ, তাঁর কোনও রূপ নেই। সমগ্র বিশ্বজুড়ে তিনি বিস্তৃত)।
২) সগুন (অর্থাৎ, সৃষ্টির মধ্যে মিশে আছেন তিনি। উদ্ভিদ, প্রাণী, জড়বস্তু, সজীববস্তু-সহ সব কিছুই তাঁর ‘অংশ’। তিনি ব্যাখ্যার অতীত। অকারণের কারণ)।
৩) নির্গুন-সগুন (অর্থাৎ, আমরা জ্ঞান-বুদ্ধি-ইন্দ্রিয় দিয়ে গুণ ও বস্তুর রূপের ওপর ভিত্তি করে শিবের ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু সেটা ভুল। কারণ তিনি সব কিছু ব্যাখ্যা করলেও তিনি সব নন। তাই চিন্তা-বুদ্ধি ও ইন্দ্রিয় দিয়ে তাঁকে বোঝা অসম্ভব)।

এই নির্গুন-সগুন অবস্থাতে মহাদেব পূজিত হন শিবলিঙ্গ রূপে (কিছু মানুষ এটাকে পুরুষ যৌনাঙ্গের প্রতীক হিসাবে ব্যাখ্যা করলেও শিবলিঙ্গের একটি গভীর এবং বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও দর্শন রয়েছে। শিবালিঙ্গম শব্দটি সংস্কৃত শব্দ শিব (প্রভু) + লিঙ্গম (মার্ক / চিহ্ন / প্রতীক) থেকে উদ্ভূত হয়েছে। অতএব, শিবালিঙ্গম হল সৃষ্টির মধ্যে পালনকর্তার চিহ্ন। পৃথিবীর সবকিছুই একটি গম্বুজ / একটি বল / একটি পিন্ড থেকে সৃষ্টি হয়েছে। একটি বড় গাছের সৃষ্টি হয় একটি গোলাকার বীজ থেকে। একটি শিশু বৃত্তাকার কোষ থেকে জন্ম নেয়। গোল বা বৃত্ত একটি পবিত্র চিহ্ন। আবার আমাদের পৃথিবীও গোল। সমস্ত রকম বৃত্ত চিহ্নই ব্রক্ষ্ম বা শিবের চিহ্ন। যেহেতু তাঁর কোনও রূপ নেই তাই আমরা তাঁর চিহ্নকে পূজা করি)।

শিবলিঙ্গমের দার্শনিক ব্যাখ্যার পাশাপাশি একটি গভীর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে। এটি পারমাণবিক এবং সেলুলার তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে (এটি বিশাল বিষয়। পরে কোনোদিন এই নিয়ে আলোচনা করা যাবে)।
যাইহোক, আমরা শিব এবং তাঁর সঙ্গে গাঁজার যোগসূত্রে ফিরি। মহাদেবকে ছিলিম হাতে দেখা যায় – এমন কোনও কিছু পুরাণে লেখা নেই। এটা ভিত্তিহীন ফালতু কথা। পুরোটাই মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত। অনেকেই ‘ভাঙ’ নেন শিবের প্রসাদ হিসাবে। ভুল ধারণা। এর গভীর দর্শন আছে।

ভাঙ

শিবকে ভাঙ অর্পণ করার মধ্যে ‘ওহ মহাদেব’ কথাটা লুকিয়ে আছে। একজন সনাতন হিন্দু তার উন্মাদনা, মত্ততা ভাঙের আকারে শিবকে নিবেদন করেন। আমাদের বদভ্যাস, মায়া, মোহ, খ্যাতি এবং কাম তুমি নাও মহাদেব। যেভাবে সমুদ্রমন্থনের হলাহল কন্ঠে ধারণ করেছিলে সেইভাবে আমার সমস্ত পাপ নিয়ে আমাকে পবিত্র করো, জ্ঞানী কর, আমায় আশীর্বাদ দাও – শিবের প্রতি থাকে এই নিবেদন।
স্মরণে রাখতে হবে, শিব-শাস্ত্র সবসময় তামসিক ও রাজসিক খাদ্য ও পানীয়ের বিরুদ্ধে। মহাদেবের প্রকৃত ভক্ত হবেন নিরামিষাশী। প্রাণী হত্যা বর্জন করবে সে। কোনওমতেই পেঁয়াজ, রসুন খাবে না। বিশেষত নাগাদের জন্য ধূমপান ও মদ্যপান কঠোর ভাবে বর্জনীয়। অঘোরী শাস্ত্র সম্পর্কে আমাদের অনেক ভুল ধারণা আছে (পরে কোনওসময় এই নিয়ে আলোচনা করা যাবে)। মহাবিশ্বের সঙ্গে মিশে আছে মহাদেব। এর সঙ্গে ভাঙ জুড়ে আছে অত্যন্ত কার্যকরী আয়ুর্বেদীয় বৈশিষ্ট্যগুলির কারণে। মৃগী, ত্বকের সমস্যা, হজম, বিষণ্নতা, মানসিক সমস্যা, পেশী ব্যথা প্রভৃতির জন্য ভাঙের ব্যবহার চালু আছে। কিন্তু আয়ুর্বেদে এর অত্যধিক প্রয়োগ নিষিদ্ধ। আমাদের সমাজও ভাঙ ব্যবহারের বিরুদ্ধে। ভেবে দেখলে সামান্য কাশির সিরাপেও অ্যালকোহল থাকে। কিন্তু ভাঙে নয়। দক্ষিণ ভারতে একে বলা হয়, ‘ভোলে কা প্রসাদ’। বেশি মাত্রায় কোনও কিছুই ভালো নয়, সে ভাঙ হোক কিংবা নুন, চিনি বা অত্যধিক প্রেম।

ধুতরো :- মহাদেবের চরণে নিবেদন করা হল পার্থিব বিষ। মহাদেব তুমি বিষধারী। তাই আমার হিংসা, দ্বন্দ্ব, দ্বেষের মতো বিষ তুমি নিয়ে আমায় শুদ্ধ, দয়ালু করো।

দুধ :- দুধ অর্পণ করা হয় শুদ্ধ চরিত্র পেতে। মন ও আত্মা দুধের মতো শ্বেত ও পরিষ্কার হোক।

দই :- দুধ থেকে দই হয়। একবার দই হয়ে গেলে তাকে আগের অবস্থায় ফেরানো যায় না। এই সংসারের মায়া বা অবিদ্যায় যেন জড়িয়ে না যাই। মহাদেবের প্রতি ভক্তিবান থাকতে পারি, এই প্রার্থনা। শিবের প্রতি ভক্তি যেন মানুষের আধ্যাত্মিক বিকাশ ঘটায়।

ঘি :- ঘি অর্পণ করা হয় স্বাস্থ্য, জ্ঞান এবং সম্পদের শ্রীবৃদ্ধি যেন অন্যের উপকারে আসে এই আশায়।

মধু :- যাতে হৃদয় এবং জিহ্বা অন্যকে আঘাত না করে মিষ্টি ব্যবহার করে। মনযোগী হবার চেষ্টায় ও আত্মার ডাক অনুভব করার শক্তি পেতে অর্পণ করা হয় মধু।

চিনি :- শরীরের প্রতিটা কোষ যেন চিনির দানার মতো স্বচ্ছ হয়,তাতে যেন তিক্ততা না থাকে এই আশায় মহাদেবকে অর্পণ করা হয় চিনি।
আত্মার এক তূরীয় অবস্থা শিব…নেশার উপাদানের কোনও যোগ নেই। হর হর মহাদেব।