লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর অজানা জীবন ও রহস্যে মোড়া মৃত্যু

আজ  সারাদেশ যখন যখন জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিন পালন করছে তখন এই দিনে ভারতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন আরেক ভারত মাতার বীর সন্তান। আমরা হয়তো তার কথা খুব একটা জানি না বা খুব একটা শুনি নি, কিন্তু তিনি যে কোন অংশে ভারতের উন্নতি এবং উৎকর্ষতার পেছনে ছিলেন না তা তার কর্মকান্ড থেকেই বোঝা যায়। আজ ভারত মাতার বীর সন্তান লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর জন্মদিন। আমরা খুব কম জনই জানি তিনিও একজন দেশপ্রেমিক ছিলেন এবং দেশকে স্বাধীন করার লড়াইয়ে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন। আসুন আজকের প্রতিবেদনে আমরা সেসব তথ্য আপনাদের সামনে তুলে ধরবো।

লাল বাহাদুর শাস্ত্রী শাস্ত্রী ছিলেন ভারতের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী। জওহরলাল নেহেরুর মৃত্যুর পর তিনি দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন এক প্রকৃত অর্থে জনদরদী নেতা। তিনি তার “জয় জওয়ান, জয় কিষান” ডাকের মাধ্যমে নিজেকে সকলের কাছে দিয়েছিলেন এক বিশেষ পরিচয়।

Source

শাস্ত্রীজির জন্ম

১৯০৪ সালে ২রা অক্টোবর উত্তরপ্রদেশের বারাণসীর কাছে মুঘলসরাই রেল শহরে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মের ১ বছরের পরই তার পিতা সারদা প্রসাদ শ্রীবাস্তব এর মৃত্যু হয়। তিনি একজন বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। তখন তার মা রামদুলারী দেবী তাকে এবং আরো দুই ভাই-বোনকে সঙ্গে নিয়ে তার মামার বাড়িতে চলে যান। অর্থাৎ লাল বাহাদুর শাস্ত্রী বড় হয়ে ওঠেন মামার বাড়ি থেকে থেকেই।

মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে তার মনোভাব স্পষ্ট করেন এবং তিনি তাঁর পদবি “শ্রীবাস্তব” লিখতে অস্বীকার করেন। পরবর্তী সময়ে তার গ্রাজুয়েশন শেষ হওয়ার পর কাশি বিদ্যাপীঠ থেকে তাঁকে “শাস্ত্রী” পদবি দেওয়া হয়। শাস্ত্রী কথার অর্থ যিনি জ্ঞানী অর্থাৎ তিনি তাঁর পদবি জ্ঞানের মাধ্যমে অর্জন করেছেন।জন্মগত বা জাতপ্রথার মাধ্যমে পাওয়া পদবী তিনি ত্যাগ করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি একবার বলেছিলেন,” ভারত তখনই লজ্জায় মুখ ঢাকবে, যদি ভারতের একজনও নাগরিক অস্পৃশ্য হিসাবে গণ্য হয়”।

লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর পারিবারিক অবস্থা খুব একটা সচ্ছল ছিল না। ছোটবেলায় তিনি যখন পড়াশোনা করতেন তখন তাকে গঙ্গা নদী পেরিয়ে স্কুলে যেতে হতো। কিন্তু নদীতে নৌকায় পর হওয়ার মতো তার কাছে সবসময় টাকা থাকতো না। তাই মাঝেমধ্যেই তাকে নদী সাঁতার কেটে পার হতে হতো।

Source

স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ

অল্প বয়স থেকে তিনি দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রত্যক্ষ ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তিনি মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করেন, যখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। দেশকে স্বাধীন করার আন্দোলনে তিনি এতটাই প্রত্যক্ষ ভূমিকা নিয়েছিলেন যে, তিনি তার পড়াশোনা মাঝপথে ছেড়ে দেন। যদিও এই পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে তার মায়ের সঙ্গে তার মত এক ছিল না। কিন্তু তিনি আর পিছনে ফিরে তাকাননি।

Source

সবুজ বিপ্লব

১৯৬২ সালে ভারত চীন যুদ্ধে ভারতের পরাজয়ের পর তিনি ভারতকে শুধুমাত্র সঠিক পথে পরিচালিত করেন নি, তিনিই ভারতে সবুজ বিপ্লব এবং দুধের উৎপাদন বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। তাঁর আমলেই ভারত খাদ্য স্বনির্ভর দেশে পরিণত হয়।

Source

ভারতে প্রথম জলকামানের ব্যবহার

স্বাধীন ভারতের অঙ্গরাজ্য উত্তরপ্রদেশের পুলিশ মন্ত্রী থাকার সময় তিনি প্রথম উত্তেজিত জনতা কে ছত্রভঙ্গ করার জন্য লাঠিচার্জ এর বদলে জলকামান ব্যবহার এর নির্দেশ দেন। অর্থাৎ তিনিই প্রথম ভারতীয় মন্ত্রী হিসেবে ভারতে প্রথম জলকামান ব্যবহার এর সূচনা করেন।

Source

ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ

১৯৬৫ সালে তারই নেতৃত্বে ভারত পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধে জয়লাভ করে। তিনি ভারতীয় সেনাকে তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বের পরিচয় দিয়ে উৎসাহিত করতে পেরেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে ভারতীয় সেনা তাদের কাজে সফলতা লাভ করে।

এক জনসভায় বক্তৃতা রাখতে গিয়ে তিনি পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন,” পাকিস্তান যদি মনে করে ক্ষমতার জোরে ভারতীয় কোন ভূখণ্ড দখল করে নেবে, তাহলে পাকিস্তানের দ্বিতীয়বার ভাবা উচিত। ভারতের বিরুদ্ধে যে সব দেশ ক্ষমতা প্রদর্শন করবে, তাদের বিরুদ্ধে ভারতও ক্ষমতা প্রদর্শন করবে।আগ্রাসনের মাধ্যমে ভারতীয় ভূখণ্ড দখলের স্বপ্ন কোনদিনই সফল করতে পারবে না পাকিস্তান।”

Source

১৯৯৬ সালের ১১ জানুয়ারি তিনি রাশিয়ার তাসখন্দে,ভারত সরকারের পক্ষ থেকে” তাসখন্দ”চুক্তি করার কিছু ঘন্টার মধ্যেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পরলোক গমন করেন। মৃত্যুর কারণ হিসেবে হৃদরোগে মারা গেছেন বলা হয় ,কিন্তু সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি কিছু প্রমাণ সাপেক্ষে এটাকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে মনে করে।

তাঁর পুত্র, অনিল শাস্ত্রী সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, ‘‘বাবার দেহ যখন দিল্লি বিমানবন্দরে নামানো হয় তখন গোটা শরীরটা নীল হয়ে গিয়েছিল। দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। বাবার মুখটা পর্যন্ত নীল। কপালের দু’পাশে স্পষ্ট সাদা ছোপও দেখেছিলাম। ওই অবস্থা দেখে মা তখনই বলেছিলেন, এটা স্বাভাবিক মৃত্যু নয়।’’

আরও পড়ুন : পিঠে গুলি খেয়ে নেতাজিকে বাঁচিয়েছিলেন কর্নেল নিজ়ামুদ্দিন

Source

তিনি আরও বলেন, ‘‘বাবা নিয়মিত ডায়েরি লিখতেন। সেখানে অনেক খুঁটিনাটি কথা লেখা থাকত। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর থেকে ওই ডায়রিরও কোনও হদিস মেলেনি। যেমন খোঁজ পাওয়া যায়নি তাঁর সঙ্গে যে ফ্লাস্কটি ছিল সেটিরও। ‘ওই ঘটনার পর তাসখন্দের হোটেলে বাবার যে খানসামা ছিল, তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। সে ছাড়াও পেয়ে যায়। পরে আমার মা তাসখন্দে গিয়ে সেই খানসামার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু, আমার মাকে জানানো হয়, ওই খানসামাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। হোটেলে বাবা যে-ঘরে ছিলেন, সেই ঘরে বাবার খাটের পাশেই একটা ছোট্ট টেবিলে সেই রাতে রাখা ছিল একটা থার্মোফ্লাস্কও। বাবার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডাক্তার আর এন চুঘ রাতে বাবাকে দেখতে গিয়ে টেবিলে ওই থার্মোফ্লাস্কটি দেখেছিলেন। বাবার রাতে গরম দুধ খেয়ে ঘুমোনোর অভ্যাস ছিল। হয়তো সেই জন্যই ওই থার্মোফ্লাস্কটি রাখা হয়েছিল। কিন্তু, ওই থার্মোফ্লাস্কটিরও আর হদিশ পাওয়া যায়নি। তাই, ওই থার্মোফ্লাস্কে দুধই ছিল নাকি অন্য কিছু, এখনও পর্যন্ত আমরা তা জানতে পারিনি। আমার তো মনে হয়, বাবার মৃত্যু-রহস্যের কারণ লুকিয়ে রয়েছে ওই থার্মোফ্লাস্কেই! ’

আরও পড়ুন : কতটুকু জানেন মহাত্মা গান্ধী সম্পর্কে? জেনে নিন গান্ধীজির জীবনের অজানা অধ্যায়

Source

তবে, লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যুর ময়না তদন্তের রিপোর্ট কখনই সামনে আনা হয়নি। তবে, জর্জ কাউলি নামে এক সাংবাদিক তার অন্তর্তদন্তমূলক একটি বইয়ে দাবি করেছিলেন ভারতের প্রথম পরমাণু বিজ্ঞানী হোমি ভাবাকে যে ভাবে পয়জনিং করে হত্যা করা হয়েছিল লাল বাহাদুরকেও সেভাবে খুন করা হয়েছিল। কারণ, হোমি  ভাবার মতোই লাল বাহাদুরও ভারতের পরমাণু পরীক্ষা:নিরিক্ষা এগিয়ে নিয়ে যেতে পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছিলেন। হোমি ভাবা এবং লাল বাহাদুরের মৃত্যুর পিছনে সিআইএ:এর হাত ছিল বলেও দাবি করেছিলেন কাউলি।