কলকাতার এই কালী মন্দিরে ৩৪ বছর ধরে মহিলাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ

অনেক বছর ধরেই কালী পুজো হয় প্রদীপ সঙ্ঘ ক্লাবে। কিন্তু কোনও বাড়েই প্রবেশাধিকার থাকে না মহিলাদের। পুজোর কাজ থেকে শুরু করে সমস্তটাই করে পুরুষরা। বহুকাল থেকেই এই পুজোয় ব্রাত্য মহিলারা।

গত দুই মাস ধরেই যেখানে আমরা দেখছি শবরীমালা মন্দির নিয়ে এক প্রকার রাজনৈতিক এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে অদ্ভুত এক টানাপোড়েন। যেখানে সরকার এবং আইন ব্যবস্থা নারীদের মন্দিরে প্রবেশে অনুমতি দেওয়া সত্ত্বেও কিছু ধার্মিক গোঁড়ামি মানসিকতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের বিরোধিতার ফলে বার বার বাধা পাচ্ছে মহিলাদের এই বিশেষ মন্দিরে প্রবেশের অধিকার। আর এই নিয়ে সমগ্র কেরল রাজ্য জুড়ে দেখা দিয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর ।প্রশাসন দক্ষভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করুক তা যেমন চাইছে জনগণের একটা অংশ তেমনি আরেক অংশের জনগণ যারা ধর্মীয় ভাবাবেগকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে তাদের কাছে আবার এটা ধার্মিক বিশ্বাস এর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তারা কোন মতেই চাইছেন না এই মন্দিরের বহু প্রাচীন প্রথাকে আধুনিকতার নামে বা অধিকারের দোহাই দিয়ে নারীদের হাতে সেই ক্ষমতা তুলে দেওয়া হোক যা আজও পর্যন্ত তাদের তুলে দেওয়া হয়নি সর্বসম্মতভাবে। এমন এক পরিস্থিতিতে সারা দেশজুড়ে পাওয়া গিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। তবে শুধুমাত্র এই মন্দির জুড়ে এরকম শতাব্দীপ্রাচীন প্রথা ছড়িয়ে আছে তা কিন্তু নয়। আমাদের এক প্রতিবেদনে আমরা দেখিয়েছিলাম সারা ভারত জুড়ে এমন বিশেষ কিছু মন্দির আছে যেখানে মহিলাদের রজস্বলা অবস্থায় বা সাধারণ অবস্থাতেই প্রবেশ নিষিদ্ধ করা আছে বহু প্রাচীন সময় থেকেই।

কিন্তু আমাদের রাজ্য খাস পশ্চিমবঙ্গেই এমন এক মন্দিরের সন্ধান পাওয়া গেছে যেখানে মহিলাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ।আর এই মন্দির আদ্যশক্তি মা কালীর অত্যন্ত জাগ্রত মন্দির নামে পরিচিত ।সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এই মন্দিরের অবস্থান পশ্চিমবঙ্গের প্রাণকেন্দ্র কলকাতাতেই। যেখানে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা হার কেরলের মতো না হলেও উদার মনের মানসিকতা এবং মুক্ত চিন্তাধারার মানুষ খুব দেখা যায় । যদিও ধর্মপ্রাণ হিন্দু বাঙালিরা নানা দেবদেবীর পূজা অত্যন্ত নিষ্ঠা সহকারে ও ভক্তিভরে করে থাকেন ।এখানে ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন জাগ্রত সতীপীঠ এবং এইসব সতীপীঠ এ লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হয় সারা বছর ধরে। এখানেই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে ভক্তিভরে আরাধ্য দেবীদের পূজা দেন এবং নিজেদের মনস্কামনা পূরণের জন্য কামনা করেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বুকে এমন এক মন্দির যেখানে আজও  মন্দির গর্ভে নারীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ।

আর এই প্রথা চলে আসছে গত ৩৪ বছর ধরে। মন্দিরটি হল “পঞ্চমুন্ড কালী মন্দির”।এই জাগ্রত কালী মন্দিরে গত ৩৪বছর ধরে তান্ত্রিক মতে কালী পূজা হয়ে থাকে। তাই এই মন্দির গর্ভে মহিলাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, এমনই জানিয়েছেন মন্দিরের পূজা কমিটি। চেতলা প্রদীপ সংঘের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য গঙ্গারাম সাউ জানান,” আমাদের এই জাগ্রত কালী মন্দিরে পূজা ব্রাহ্মণ মতে হয়ে থাকে না, পূজা হয় তান্ত্রিক মতে কঠোরভাবে সকল নিয়ম নিষ্ঠার সঙ্গে। আর এজন্য পূজার পুরোহিত নিয়ে আসা হয় তারাপীঠের অভিজ্ঞ তান্ত্রিক পুরোহিতদের। তাদের তত্ত্বাবধানে সারা রাত ধরে পূজা চলে। আর তাই এই মন্দিরে মহিলাদের প্রবেশের ক্ষেত্রে এই বিশেষ নিয়ম গত ৩৪ বছর ধরেই আমরা মেনে আসছি। আমরা আমাদের পূর্বতন সদস্যদের এই প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করলে, তারাও জানান এই মন্দিরের পূজার সঙ্গে মহিলাদের কোনভাবেই জড়িত রাখা যাবে না। এমনকি তাদের বিগ্রহ দর্শন পর্যন্ত করানোর অনুমতি দেওয়া হয় না। তাই মন্দির গর্ভে মহিলাদের প্রবেশ গত তিন দশক ধরে একপ্রকার নিষিদ্ধ।”

আরও পড়ুন : মা কালীর জিভ বেরিয়ে থাকে কেন? কালীর পায়ের নীচে শিব থাকে কেন?

খাস কলকাতার বুকে এরকম ধর্মীয় গোঁড়ামির ঘটনা আমাদের মুক্তচিন্তার ধারণাকে গোড়াতেই আঘাত করে।  তাহলে কি এবারও কলকাতার বুকে এই বিশেষ মায়ের মন্দির ঘিরে নারীদের প্রবেশের অধিকার নিয়ে নতুন করে আন্দোলন শুরু হবে? উত্তর দেবে সময়।