ভারতের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রীম কোর্ট নিয়ে কিছু অজানা তথ্য

ভারতের সর্বোচ্চ আদালত হল সুপ্রীম কোর্ট, যা ১৯৫০ সালের ২৬ শে জানুয়ারি থেকে ভারতের রাজধানী নিউ দিল্লীর তিলক মার্গ থেকে কার্যকলাপ সম্পন্ন করে আসছে। ভারতীয় সংবিধানের ৫ নাম্বার অধ্যায়ের ৫ নাম্বার খন্ডের আর্টিকেল ১২৪ থেকে ১৪৭ অনুযায়ী ইহা স্থাপন করা হয়েছে এবং  সকল প্রকার সাংবিধানিক ক্ষমতা দান করা হয়েছে।
ভারতীয় সর্বোচ্চ আদালতের কাজ হলো ইহা সংবিধানের রক্ষাকর্তা । এখানে রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে সাংবিধানিক ক্ষমতার যে সংঘাত ঘটে বা দুই রাজ্যের মধ্যে বা কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের  সাথে কেন্দ্রের যখন কোন সাংবিধানিক বা অন্য কোন বিষয় নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয় তখন তার মীমাংসা করা।বা হাই কোর্টের কোন রায়ের বিরুদ্ধে পুনরায় আবেদন করা যায় সর্বোচ্চ আদালতে।এছাড়াও সংবিধানের কোন ধারা বা উপধারার সঠিক ব্যাখ্যা করার জন্য কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার শরণাপন্ন হয় সর্বোচ্চ আদালতের।এই সর্বোচ্চ আদালতের বিচার ব্যবস্থা পরিচালনা করেন একজন প্রধান বিচারপতি এবং বাকি ৩০ জন সহকারী বিচারপতি যারা সবাই ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্বারা নির্বাচিত হয়ে থাকেন।

ভারতীয় সর্বোচ্চ আদালতের কিছু অজানা তথ্য

১৯৩৫সালের গভর্মেন্ট অফ ইন্ডিয়া আইন এবং প্রিভি কাউন্সিল দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ভারতের সর্বোচ্চ বিচারালয় হিসাবে প্রতিষ্ঠিত ফেডারেল কোর্টের পরিবর্তে ২৮ শে জানুয়ারি ১৯৫০ সালে ভারতের সর্বোচ্চ বিচারালয় হিসাবে ক্ষমতায় আসে সুপ্রিম কোর্ট।তাৎকালীন ইংরেজ শাসনাধীন ভারতের সর্বোচ্চ বিচারালয় ছিল ফেডারেল কোর্ট।
ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান প্রথম সংগঠিত হয়েছিল ভারতীয় সংসদের মহারানীর চেম্বারে। ১৯৩৭ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত এই পুরো সময় ধরে সংসদের চেম্বার্স অফ প্রিন্সেস ব্যবহার করা হত বিচারক মন্ডলীর কক্ষ হিসাবে এবং এখানেই সুপ্রিম কোর্টের কার্যকলাপ চলত ১৯৫৮সালের আগে পর্যন্ত যতদিন না সর্বোচ্চ আদালতের জন্য বর্তমান ভবনটি তৈরি না হয়েছিল।
সর্বোচ্চ আদালত স্থাপনের প্রথম দিকে সারা বছরের মধ্যে ২৮দিন এর কার্যকলাপ চলত। আর এর কাজের সময় ছিল সকালের দিকে ১০ টা থেকে ১২ টা পর্যন্ত এবং তারপর  দুপুর ২টো থেকে ৪টা পর্যন্ত।বর্তমানে সারা বছরে ১৯০ দিন সর্বোচ্চ আদালতের কাজকর্ম হয়ে থাকে।
১৯৫৪ সালের ২৯ এ অক্টোবর বর্তমান ভারতের সর্বোচ্চ আদালত ভবনের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছিলেন ভারতের প্ৰথম রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ।
১৭একর ত্রিভুজাকৃতি জমির উপর স্থাপিত আধুনিক সর্বোচ্চ আদালতের ভবনটি যা হার্ডিঞ্জ আভিনিউ এর মধ্যে অবস্থিত এবং হার্ডিঞ্জ সেতুর বিপরীতে অবস্থিত।ভবনটি  ভারত – ব্রিটিশ স্থাপত্যের আদলে তৈরি হয়।ভবনটির নকশা করেছিলেন ভারতীয় স্থপতি গনেশ বিকাজি দেওলালিকর যিনি প্রথম ভারতীয় CPWD এর প্রধান ছিলেন।
ভবনটি এমন অদ্ভুতভাবে স্থাপন করা হয়েছিল যা বিচার ব্যবস্থার ধাপকে নির্দেশ করে।এর একদিকে যেমন আছে মুখ্য বিচারকের বিচার কক্ষ তেমনি অন্য দিকে আছে দুটি বড় বড় বিচার কক্ষ যা বিচার ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় স্তরকে নির্দেশ করে।
ভবনটির ডানদিকের কক্ষে আছে ভারতীয় এটর্নি জেনারেলের অফিস সহ অন্যান্য প্রধান আইন অফিসারদের অফিস সহ আছে বার রুম এবং লাইব্রেরি ।আবার বাম দিকে আছে  বিচারের কক্ষ।
১৯৭৯সালে মূল ভবনটির সাথে পূর্ব এবং পশ্চিম দিকে নতুন কক্ষ তৈরি করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে আরও কিছু নতুন কক্ষ সংযোজন করা হয়।
মূল ভবনটির প্রাঙ্গণে ১৯৮০ সালে একটি ২১০ সেন্টিমিটার লম্বা কালো ব্রোঞ্চের স্ট্যাচু  স্থাপন করা হয়েছিল যা শিল্পী চিন্তামনি কর দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল। এই স্ট্যাচুটিতে আছে  একটি মহিলা এবং তার কাছে আছে একটি শিশু যা তাকে আশ্রয় দিয়েছে।শিশুটির হাতে আছে একটি বই যার কিছু পাতা খোলা অবস্থায় আছে।মহিলাটি’ ভারত মাতা ‘কে নির্দেশ করছে ,আর শিশুটি স্বাধীন দেশের সকল নাগরিককে নির্দেশ করছে।শিশুর হাতে খোলা বইয়ের মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করার কথা বোঝানো হয়েছে এবং শিশুটির বইটিকে খোলা অবস্থায় ধরার মাধ্যমে  আইনের চোখে সবাই সমান তার ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
ভারতীয় সর্বোচ্চ আদালতের প্রথম মহিলা বিচারপতি ছিলেন কেরালার মিসেস আন্না চান্ডি। যিনি ১৯২৭সালে প্রথম ল স্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯২৯ সালে বার কাউন্সিলে নাম নথিভুক্ত করেন। ১৯৩৭ সালে তিনি প্রথম গ্রেডের জেলা মুন্সিফ হয়েছিলেন এবং ১৯৪৮ সালে প্রথম জেলা আদালতের বিচারক হয়েছিলেন।তিনি সম্ভবত দ্বিতীয় মহিলা সারা বিশ্বের মধ্যে যিনি প্রথম রাজ্য হাই কোর্টের বিচারপতি হিসাবে যোগদান করেন।
প্রথম ভারতীয় তথা এশিয়ার মহিলাদের মধ্যে সর্বোচ্চ আদালতের  বিচারকের পদ অলংকৃত করেছেন ফতিমা বিবি।তিনি ১৯৫৯ সালে প্রথম সর্বোচ্চ আদালতের বিচারক হিসাবে নিযুক্ত হন।
বর্তমানে সর্বোচ্চ আদালতের মোট বিচারকের সংখ্যা ৩১ যাদের মধ্যে ১জন প্রধান বিচারপতি এবং ৩০ জন সহ বিচারপতি।তবে প্রথম যখন সর্বোচ্চ আদালত তার কাজকর্ম শুরু করে   তখন মোট বিচারপতির সংখ্যা ছিল ৮ টি।পরবর্তীতে সংসদ বিভিন্ন বছরে বিচারের সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব দেন।সেই প্রস্তাব অনুযায়ী  ১৯৬০ সালে ১১ টি ,১৯৬৮ সালে ১৪টি ,১৯৭৮ সালে ১৮ টি ,১৯৮৬ সালে ২৬টি এবং ২০০৯ সাল থেকে ৩১ টি বিচারপতি হয়।
সর্বোচ্চ আদালতের সিলমোহর নকশাটি নেওয়া হয়েছে সারনাথে পাওয়া অশোক স্তম্ভ থেকে যেখানে অশোক চক্রের উপর ২৪ টি দন্ডের সারি আছে।

কীভাবে সর্বোচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগ করা হয় ?

১২৪ ধারার ২ উপধারা অনুযায়ী ভারতের রাষ্ট্রপতি সর্বোচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগ করেন।তবে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তিনি  সর্বোচ্চ আদালতের  এবং রাজ্যের হাই কোর্টের বিচারকের অভিজ্ঞ বিচারকের পরামর্শ অবশ্যই নেবেন।
১৯৯৩ সাল পর্যন্ত প্রধান বিচারপতির পরামর্শ নিয়ে রাষ্ট্রপতি বিচারক নিয়োগ করতেন।কিন্তু বর্তমানে ৫জন অত্যন্ত অভিজ্ঞ বিচারকের কলোজিয়াম দ্বারা গঠিত একটি কমিটি সর্বোচ্চ আদালতের সম্ভাব্য বিচারকদের একটি তালিকা ভারতের আইন মন্ত্রকে সুপারিশ করে।তারপর আইন মন্ত্রক থেকে সবকিছু বিচার বিশ্লেষণ করে সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের নামের তালিকা রাষ্ট্রপতি মহাশয়ের কাছে পাঠান।আর সেই অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মহাশয় বিচারপতি নিয়োগ করেন।তবে রাষ্ট্রপতি চাইলে সেই তালিকা পুনর্বিবেচনা করার জন্য পুনরায় আইন মন্ত্রকের কাছে পাঠাতে পারে।আইন মন্ত্রক তা আবার কলোজিয়ামে পাঠিয়ে দেন। কলোজিয়াম যদি মনে করে তাদের পাঠানো সম্ভাব্য বিচারকের তালিকায় কোন পরিবর্তনের দরকার নেই ,তাহলে তা পুনরায় আইন মন্ত্রকে পাঠিয়ে দেবে ,এই অবস্থায় রাষ্ট্রপতিকে পুরানো তালিকা স্বীকৃতি দিতে হবে।

সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতি  হওয়ার জন্য যোগ্যতা

সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতি হওয়ার জন্য আপনাকে অবশ্যই ভারতের স্থায়ী নাগরিক হতে হবে।

সর্বোচ্চ আদালতের বিচারক হতে গেলে তাকে কমপক্ষে ভারতের যেকোন হাই কোর্টের ৫বছরের জন্য বিচারপতি থাকতে হবে।বা হাই কোর্টে ১০ বছরের জন্য ওকালতির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকের সময়কাল

সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারপতিদের অবসরের সময়কাল হল ৬৫ বৎসর বয়স পর্যন্ত।হাইকোর্টের বিচারপতিদের ক্ষেত্রে এই সময়কাল ৬২ বৎসর।

সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকদের বেতন

সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতির বেতন ১,০০,০০০টাকা এবং অন্যান্য বিচারপতিদের বেতন ৯০,০০০টাকা।

সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতির অনুপস্থিতিতে কী হয় ?

সংবিধানের  ১২৬ নাম্বার ধারা অনুযায়ী  প্রধান বিচারপতির অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি সর্বোচ্চ আদালতের অন্যান্য বিচারকদের মধ্য থেকে অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি নির্বাচন করেন।

সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকদের অবসরের পর ভবিষ্যৎ জীবন

সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারপতিদের অবসর গ্রহণের পর তারা ভারত সরকারের অধীনস্থ কোন বিচারালয়ে বিচারপতি হতে পারেন না।তবে সরকার তাদের বিভিন্ন সরকারি তদন্ত কমিশনের  প্রধান হিসাবে নিযুক্ত করতে পারেন।

আরও পড়ুন : হঠাৎ গ্রেফতার হলে কী করবেন ? জেনে নিন কিছু আইনি পরামর্শ

সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকদের কী তাদের পদ থেকে অপসারণ করা যায়?

সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি বা অন্যান্য বিচারপতিদের বিরুদ্ধে যদি কোন আচরণমূলক অভিযোগ বা তাদের পদের অদক্ষতা নিয়ে কোন রূপ অভিযোগ প্রমাণিত হয় তখন ভারতের রাষ্ট্রপতি সংসদের সদস্যদের সাহায্য নিয়ে অভিযুক্ত বিচারপতিকে তার পদ থেকে অপসারিত করতে পারেন।তবে এই অপসারন করার জন্য সংসদের উভয় কক্ষের মোট সদস্য সংখ্যার মধ্যে ২/৩ অংশের সদস্যদের সম্মতি থাকতে হবে।তাদের মিলিত সম্মতি বা রেজুলেশন নিয়ে একজন সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণ করা যায়।