সত্যজিৎ রায়ের ১০০তম জন্মদিবসে জেনে নিন তাঁর সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্য

সত্যজিৎ রায়ের ১০০তম জন্মদিবসে জেনে নিন তাঁর সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্য

“Khoka Born Last Night . ALL is Well.” শোনা যায় ১৯২১ সালের ৩রা মে এই টেলগ্রামটি দাড়ভাঙায় পাঠান সুকুমার রায়। তিনি তখন বুঝতে পারেননি তাঁর ছোট্টো খোকা পরবর্তীতে মহীরুহ হয়ে উঠবেন। সত্যজিৎ রায়, আর চার পাঁচটা সাধারণ ঘরের ছেলের মতোই জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়ে নিজেকে আবিষ্কার করতে করতে প্রাণ খুঁজে পান “লাইট- ক্যামেরা- অ্যাকশনে”। তাঁর হাত ধরেই শুরু হয় বাংলা চলচ্চিত্র জগতের নতুন অধ্যায়। সত্যজিৎ রায় আসার আগে যে ভালো ছবি তৈরী হতো না তা নয়। বা তাঁর সমসাময়িক ভালো পরিচালক ছিলেন না তাও নয় তবে সত্যজিৎ রায় যে বাংলা চলচ্চিত্র জগতকে এক অন্য মাত্রা দেন তা একবাক্যে স্বীকার করেন সকলে।

শুধুমাত্র পরিচালক নয় সত্যজিৎ রায় একাধারে ছিলেন চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, শিল্প নিদর্শক, সঙ্গীত পরিচালক এবং লেখক। কিন্তু সর্বোপরি তিনি ছিলেন একজন শ্রষ্ঠা। তিনি এমন কিছু চরিত্রের সৃষ্টি করেছেন যা আমরণ বাঙালীর স্মৃতির মণিকোঠায় রয়ে যাবে। চলচ্চিত্র তৈরীর ক্ষেত্রে তাঁর কোনো নির্দিষ্ট ধরন ছিল কিনা তা বিতর্কের বিষয়।

তবে তাঁর সৃষ্টি চরিত্রের পিছনে বা চলচ্চিত্রের পিছনে লুকিয়ে থাকতো সমাজের কঠিন সত্য। তিনি চলে গিয়েছেন কবেই তবে আজও যখন সমাজে ঝড় ওঠে তখন মনে পড়ে ‘মহারাজা’কে। আজও বাঙালীর বিশ্বাস তিনি থাকলে সমাজের কঠিন সত্যগুলো সিনেমার মাধ্যমে তুলে ধরতেন। এখনও অনেকে বলছেন তিনি যদি আজ বেঁচে থাকতেন তাহলে লকডাউনও তাঁর ভাবনাকে প্রভাবিত করত।

সত্যজিৎ রায়ের জন্ম ২রা এপ্রিল ১৯২১ সালে। তাঁর পৈত্রিক ভিটে বর্তমানে বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার কাটিয়াদি উপজেলার মসূয়া গ্রামে। তাঁর মায়ের ইচ্ছায় অর্থনীতি নিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। তবে তাঁর মন পড়ে ছিল চারুকলার দিকে। প্রেসিডেন্সিতে পড়াশোনা শেষ করে আবারও মায়ের ইচ্ছায় শান্তিনিকেতনে যান।

যদিও সত্যজিৎ রায় শান্তিনিকেতন যেতে চাননি তবে রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধায় সেখানে যেতে রাজি হন। শান্তিনিকেতনে বিখ্যাত চিত্রশিল্পী নন্দলাল বসুর কাছে আঁকা শেখেন। এবং পরবর্তীতে স্বীকার করেন যে নন্দলাল বসু ও বিনোদ বিহারী মুখোপাধ্যায় এর কাছ থেকে তিনি অনেক কিছু শেখেন। তবে যেই শিক্ষা অসম্পূর্ণ রেখেই ফিরে আসেন বাড়িতে।

কলকাতা ফিরে যোগ দেন ‘ডিজে কিমারে’ নামক ব্রিটিশ বিজ্ঞাপন সংস্থায় “ জুনিয়ার ভিজুয়ালাইজার” হিসেবে যোগ দেন। তাঁর মাইনে ছিল ৮০ টাকা। এরপর ১৯৪৩ সালের দিকে ডি কে গুপ্তর প্রকাশনা সংস্থা ‘সিগনেট প্রেস’ এ যোগ দেন। ডি কে গুপ্ত তাঁকে প্রেসের হয়ে বইগুলির প্রচ্ছপদ আঁকার অনুরোধ করেন। বিভূতিভূষন বন্দ্যোপাধ্যায় এর লেখা উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’ এর আর একটি সংস্করন ‘আমআটির ভেঁপু’ এর প্রচ্ছদের কাজও তিনি করেন।

কর্মসূত্রে লন্ডনে যাওয়ার সুযোগ পান। সেখানেই ভিত্তারিও ডি সিকার পরিচালিত ইতালিয়ান ছবি ‘দ্য বাইসাইকেল থিভ্‌স’ দেখেন। ৬ মাসে ১১ টি সিনেমা দেখে অনুপ্রাণিত হন ও চলচ্চিত্র নির্মানে উদ্বুদ্ধ হন। এরপর তিন বছর ধরে ‘পথের পাঁচালী’ সিনেমার শ্যুটিং হয় ও অবশেষে ১৯৫৫ সালে তা মুক্তি পায়। সত্যজিৎ রায় ছবি বানিয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু তা ইতিহাস হয়ে ওঠে।

তারপরেই ‘অপরাজিত’, ও ‘অপুর সংসার’ ছবি দুটি করেন। এই দুটি সিনেমার সাথে চলচ্চিত্র জগত পায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে। সত্যজিৎ রায় ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় একসঙ্গে মোট ১৪টি সিনেমায় কাজ করেছেন। তাদের এই জুটি সিনেমা ইতিহাসে বিখ্যাত। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এর বিপরীতে মাত্র ১৪ বছর বয়সে অভিনয় করেন শর্মিলা ঠাকুর। এরপর মহানগর, চারুলতা, জনঅরণ্য, গুপি গাইন বাঘা বাইন, হীরক রাজার দেশে, ঘরে বাইরে, আগন্তুক মতো চলচ্চিত্রের সৃষ্টি। এর সাথেই সৃষ্টি গোয়েন্দা চরিত্র ফেলুদার। ১৯৬২ সালে প্রথম রঙীন বাংলা ছবি ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ তৈরি করেছিলেন সত্যজিৎ।

চলচ্চিত্র জগতে তাঁর অবদানের জন্য জীবদ্দশায় প্রচুর পুরষ্কার পান। ‘দাদাসাহেব ফালকে’ সহ আজীবন সম্মাননা স্বরুপ ‘ অ্যাকাডেমি সম্মানসূচক পুরষ্কার (অস্কার)’ পান। সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা মোট ৩২টি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিল। এর মধ্যে ৬টি ছিল সেরা পরিচালকের পুরস্কার। এছাড়া ফরাসি সরকারের তরফে ১৯৮৭ সালে সেদেশের অন্যতম অসামরিক সম্মান ‘লিজিয়ঁন দ্য অনার’ দেওয়া হয় সত্যজিৎ রায়কে।

সত্যজিৎ রায়কে সাম্মানিক ডক্টরেট দেয় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। চার্লি চ্যাপলিনের পর দ্বিতীয় ফিল্ম ব্যক্তিত্ব হিসাবে এই সম্মান পান তিনি। সত্যজিৎ রায় সাম্মানিক অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড পান। তবে তার কোনও সিনেমাই অস্কার জেতেনি। মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন আগে তাঁকে ভারত রত্ন পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। আজ ১০০ বছরেও বাঙালি সত্যজিৎ রায়ের উদ্দ্যেশ্যে একটাই কথা বলছেন, মহারাজা তোমারে সেলাম।