পাকিস্তানে ৫৮ ঘণ্টা! কীভাবে কাটালেন অভিনন্দন? শুনে নিন ওনার মুখেই

3633

২৭শে ফেব্রুয়ারি সকাল ১১ টা থেকে শুরু হয় রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা ভারতবর্ষজুড়ে। সেই রুদ্ধশ্বাসের পরিসমাপ্তি ঘটে ১লা মার্চ রাত্রি সাড়ে ন’টায়। ৫৮ ঘন্টা শত্রুপক্ষ পাক শিবিরে কাটিয়ে এলেন ভারতীয় মিগ-২১ এর পাইলট অভিনন্দন। এই দীর্ঘ সময় ভারতের আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু অভিনন্দন। এই মুহূর্তে তিনি রয়েছেন ভারতেই। কিভাবে কাটালেন এই দীর্ঘ সময়? সূত্র মারফত পাওয়া খবর অনুযায়ী কি বললেন অভিনন্দন?

২৭ শে ফেব্রুয়ারি হঠাৎ খবর আসে পুঞ্চ ও রজৌরি সেক্টরে হামলা চালিয়েছে পাক বায়ুসেনা। নিয়ন্ত্রণ রেখার পাশে পাদ বায়ু সেনা দেখি হামলা চালায় ভারতীয় বায়ুসেনা। পাক এফ ১৬ –কে তাড়া করে ভারতের মিগ ২১ বাইসন। তারপর?

before-being-captured-abhinandan-fired-into-air-swallowed-documents-demands-pak-media

পাক যুদ্ধবিমানকে তাড়া করে অভিনন্দনের মিগ -২১। উইং কমান্ডার অভিনন্দন গুলি করে নামায় পাকিস্তানের এফ-১৬। কিন্তু ততক্ষণে এসে পৌঁছে গেছে পাক আকাশসীমায়। ফেরত আসার সময় পাক রাডারে ধরা পড়ে যায় তার মিগ-২১। পাক সেনারা গুলি করে নামায় তার যুদ্ধবিমান। যুদ্ধ বিমানের পরিস্থিতি খারাপ বুঝে সঠিক সময়ে প্যারাসুট ধরে মাটিতে নেমে আসে।

এরপর পরপর তিনটি ভিডিও প্রকাশ করে পাকিস্তান। প্রথম ভিডিওতে দেখা যায় অভিনন্দন জঙ্গলে ঘেরা একটি নালার মধ্যে পড়ে আছে। তাকে ঘিরে রয়েছে অজস্র মানুষ। দ্বিতীয় ভিডিওতে দেখা যায়, অভিনন্দনের চোখ কাপড় দিয়ে ঢাকা, হাত পিছনে মোড়া, পাশে পাকিস্তানি সেনারা। এই ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পরই চাঞ্চল্য ছড়ায় দেশ জুড়ে। কারণ ভিডিওতে স্পষ্ট অভিনন্দনের চোখেমুখে রক্তের ছোঁয়া।

পাক সংবাদ মাধ্যম ডন পত্রিকার খবর অনুযায়ী, অভিনন্দন বিপদের মাঝেও ভেঙে পড়েননি। শত্রুদের মাঝে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন এটা কোন দেশ? ভারত না পাকিস্তান? তার পেট থেকে কথা বের করার জন্য মিথ্যা উত্তর দেওয়া হল বিপদের গন্ধ পেয়ে তিনি আবার জিজ্ঞাসা করেন ভারতের কোন জায়গা?

উত্তরে উত্তেজিত জনতা জানাই এটা কিলান। তখন অভিনন্দন জানাই, আমার কোমরে খুব ব্যথা ও জল তেষ্টা পেয়েছে। সেখানকার উত্তেজিত জনতা তার ব্যথা এবং জল তেষ্টা তে আমল না দিয়ে পাকিস্তান এবং পাকসেনার জয়ধ্বনি দিতে শুরু করে।

এরপরই উত্তেজিত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য অভিনন্দন সার্ভিস রিভলবার থেকে শূন্যে গুলি ছোড়ে। বারবার পাকিস্তানি সেনারা তার নাম ও পরিচয় জানতে চাইলে জেনেভা কনভেনশনকে শত্রু পক্ষকে মনে করিয়ে চোখে চোখ রেখে সার্ভিস নাম্বার এবং পদমর্যাদা ছাড়া আর কিছুই বলতে চাননি তিনি।

এরপর পাকিস্তানি সেনাদের সামনে তার ওপর মুহুর্মুহু ইটপাটকেল ছোড়া হয়। নিজেকে বাঁচাতে জলাশয়ে ঝাঁপ দেন এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি, ম্যাপ জলে ভিজিয়ে গিলে খেয়ে নষ্ট করে দেন।

এরপর উত্তেজিত জনতার ভিড় থেকে গুলি ছুটে আসে তার পায়ে। তার পরেও তিনি কোন রকম ভেঙে পড়েননি। বারবার প্রশ্ন করা হলে তিনি শুধু দৃঢ়তার সাথে একটাই উত্তর দেন “আ’য়াম নট সাপোজড টু টেল ইউ স্যার।” তারপর অবশেষে পাকিস্তানি সেনা তাকে হেফাজতে নেয়।

এরপর পাকিস্তানের তরফ থেকে অভিনন্দনের তৃতীয় ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়। সেই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে অভিনন্দনের আঘাতের জায়গাগুলি পরিষ্কার করা হলেও চোখমুখে কালশিটে দাগ। চা খেতে খেতে অভিনন্দন তখন বলছেন এখন ভালো আছি। দেশে ফেরার পরে ও তার গান বদলাবে না এমনটা জানিয়েদেন অভিনন্দন। শত্রুপক্ষের শিবিরে দাঁড়িয়ে এমন সৌজন্য সকলকে মুগ্ধ করে।

এরপর বীর সৈনিককে দেশে ফেরানোর জন্য ভারত সরকার তৎপর হয়ে ওঠে। পাক হাইকমিশনারকে ডেকে জেনেভা চুক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনায় ভারতের পাশে দাঁড়ায় আমেরিকা ফ্রান্সের মত তাবড় তাবড় দেশ।

অভিনন্দনকে দেশে ফেরানোর জন্য দেশজুড়ে শুরু হয় প্রার্থনা। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে অভিনন্দনের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে সমস্ত রকম আশ্বাস দেওয়া হয় তাকে ফেরানো বিষয়ে। নিঃশর্ত মুক্তির জন্য চাপ দিতে শুরু করা হয় পাকিস্তানকে।

ঘরে বাইরে চাপের পর ইমরান খান শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার ঘোষণা করেন শান্তির বার্তা নিয়ে অভিনন্দনকে শুক্রবার ওয়াঘা ওটারী বর্ডারে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হবে।

শুক্রবার অর্থাৎ পয়লা মার্চ সারাদেশের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ কতক্ষণ এসে ফিরে আসবে। সকলেই টিভির পর্দায় চোখ রাখে, ওয়াঘা বর্ডারে পৌঁছে যায় ভারতীয় বায়ুসেনার একটি বিশেষ দল। পৌঁছায় উচ্ছ্বসিত জনতা। দুপুরের মধ্যেই তাকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলা হলেও বিলম্বিত হতে থাকে সময়। পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে উদ্বেগ। তার মাঝেই খবর আসে রাওয়ালপিন্ডি থেকে লাহোরে বিমানে করে নিয়ে আসা হয়েছে অভিনন্দনকে।

সেখানে অভিনন্দনকে দেওয়া হয় ভিসা। ইমিগ্রেশনের পরে কাস্টমসের কাজ সেরে শুরু হয় নানান শারীরিক পরীক্ষা। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে তাঁকে সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দেন ইসলামাবাদে ভারতীয় দূতাবাসের এয়ার অ্যাটাাশে গ্রুপ ক্যাপ্টেন জে ডি কুরিয়েন ও পাক বিদেশ মন্ত্রকের ডিরেক্টর ফারেহা বুগতি।

Read More : বিশ্বের প্রথম পাইলট হিসেবে মিগ-২১ নিয়ে ধ্বংস করলেন এফ-১৬কে! দেখুন কীভাবে

সীমান্তের এপারে দাঁড়িয়ে ভারতের বিএসএফ দল। কমান্ডার অফিসার কে হাতের কাছে পেয়ে বিহ্বল সকলেই। এক অফিসার তাকে জড়িয়ে ধরলেন। স্যালুট করে ফেললে অটারির দিকে। বন্ধ হয়েগেল গেট।

Read More : অভিনন্দনকে মার খাইছে পাক সেনারাই : প্রকাশ্যে এলো চাঞ্চল্যকর ভিডিও

সীমান্ত এলাকায় ঘেরাটোপের মধ্যেই ভিড় জমিয়েছিলেন কয়েক হাজার মানুষ। কনভয়ের দেখা পেতেই ভিড় চাঙ্গা! অভিনন্দনকে দেখতে না পেলেও কনভয়ের ছবিই ক্যামেরাবন্দি করলেন তাঁরা। সঙ্গে দেশাত্মবোধক স্লোগান।

এরপর কনভয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় অমৃতসর বিমান বন্দরে। সেখান থেকে তাকে দিল্লী সেনা হাসপাতালে নিয়ে আসা হয় শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা জন্য।