বাঙালি পদ রেঁধে চিন-আমেরিকাকে আঙুল চাটিয়ে রাতারাতি লাখপতি বীরভুমের এই ঠাকুমা

Villfood

বাঙালির রান্নার জয়জয়কার সর্বত্র। ভোজন রসিক বাঙ্গালি বরাবর খেতে এবং খাওয়াতে ভালোবাসে। মাছে-ভাতে বাঙালি যেমন একই মাছের বিভিন্ন পদ রাঁধতে পারে, তেমনই মা-ঠাকুমাদের হাতের জাদুতে নিতান্তই সাধারণ সবজিও অসাধারণ পদ হয়ে উঠতে পারে। বাঙালি ক্যুইজিনের কার্যত কোনও সীমা-পরিসীমা নেই। রান্না নিয়ে নিত্য নতুন এক্সপেরিমেন্ট করতে এক্সপার্ট বাঙালিকে টেক্কা দেবে! সারা ভূ-ভারতে এমন সাধ্যি কার?

আধুনিক প্রজন্মকে প্রকৃত অর্থেই অনলাইন প্রজন্ম বলা চলে! প্রযুক্তির এই উন্নততর যুগে কার্যত চাঁদেও পৌঁছে গিয়েছে মানুষ। তাহলে বাঙালি রান্নার গরিমাই বা চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ থাকে কেন? বাঙ্গালির চিরন্তন মা-ঠাকুমাদের হাতের সেই রান্না, যেগুলির স্বাদ আধুনিক পিৎজা-বার্গারের প্রজন্ম প্রায় ভুলতে বসেছে বা হয়তো কোনও দিনও সেসবের স্বাদও পায়নি, তাদের জন্যেই নেটদুনিয়ায় হাজির বাংলার ঠাকুমা পুষ্পরানি সরকার।

সময়টা ছিল ২০১৭ সাল। বীরভূমের ইলামবাজারে বনভিলার বাসিন্দা পুষ্পরানি সরকারের নাতি সুদীপ সরকার ঠাকুমার হাতের রান্নার জাদু সকলের সামনে তুলে ধরার পরিকল্পনা করেন। আর পাঁচটা বাঙালির মতো ঠাকুমার হাতের রান্না ছিল তার ভীষণ প্রিয়। বিশেষত পুষ্পরানি গ্রাম-বাংলার মানুষ হওয়াতে বহু অজানা পদ রাঁধতে জানতেন। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যে পদগুলিকে প্রায় ভুলতে বসেছে বাঙালির হেঁশেল।

Villfood

এই চিন্তাভাবনা থেকেই তিনি ইউটিউবে একটি রান্নার চ্যানেল খুলে ফেলেন। গ্রাম-বাংলার রান্না সেখানে তুলে ধরার জন্য তিনি তার চ্যানেলের নাম রাখেন “ভিলফুড” (villfood)। ইউটিউব চ্যানেলে পুষ্পরানির প্রথম রান্না ছিল কুমড়োফুলের বড়া। ইউটিউবের প্ল্যাটফর্মে তার জয়যাত্রা সেই থেকেই শুরু। খড়ের ছাউনি দিয়ে ঘেরা রান্নাঘরে, মাটির উনুনের আঁচে, শীল-নোড়ায় পেষা মশলা আর বাগানের সবজি, নিজের পুকুরের মাছ দিয়ে রান্না করেই কার্যত কিস্তিমাত করছেন ৮২ বছর বয়সী এই বিধবা ঠাকুমা।

বিগত প্রায় ৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে গোটা ভূ-ভারতের মানুষকে যত্নসহকারে রান্না শিখিয়ে চলেছেন পুষ্পরানি। তার হাতে তৈরি থানকুনি পাতা দিয়ে কৈ মাছ, সরষে ইলিশ, মুরগি কিংবা পাঁঠার মাংস রান্নার খ্যাতি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের মাটিতেও ছড়িয়ে পড়েছে। চীন, বাংলাদেশ,আফ্রিকা, তুরস্ক, ইংল্যান্ড, আমেরিকার রাঁধুনীরাও হেঁশেলে যাওয়ার আগে পুষ্পরানি রান্নার ভিডিও দেখে নিতে ভোলেন না।

Villfood

বাংলার নানা হারিয়ে যাওয়া রান্না নিয়ে ভিডিয়ো বানান তিনি। বীরভূমের ইলামবাজারে বনভিলার বাসিন্দা, সাদা শাড়ির এই ছাপোষা মহিলাই মন জয় করে ফেলেছেন নেটিজেনদের। বর্তমানে ইউটিউবে তাঁর ফলোয়ার্সের সংখ্যা ১.৫৪ মিলিয়ান। ইউটিউব সংস্থা ২০২০ সালে তাঁর চ্যানেল ভিলফুড ব্লগকে দিয়েছে গোল্ড প্লে সম্মান।

ইউটিউবে রান্নার ভিডিওর অভাব নেই। তাহলে পুষ্পারানি সরকারের ‘ভিলফুড’ চ্যানেলের ভিডিওয় এমন কী আছে? আছে ভরপুর বাঙালিয়ানা। গ্রামের মুক্ত পরিবেশে মাটির উনুনে হয় যাবতীয় রান্না। চেনা রান্নার পাশাপাশি মা-ঠাকুমাদের এমন কিছু পুরনো রেসিপি যা আজকের প্রজন্মের বেশিরভাগেরই অজানা। চাষের জমি থেকেই তুলে আনা হয় বেশিরভাগ উপকরণ, তা দিয়েই হয় সমস্ত কিছু। নিপাট এই বাঙালি খাবার তৈরি দেখেই মুগ্ধ হন দেশ-বিদেশের অনুরাগীরা।

Villfood

জানলে অবাক হবেন, শুধু চীন থেকেই প্রায় ৪৬ হাজার মানুষ পুষ্পরানির রান্নার চ্যানেলটিকে অনুসরণ করছেন! বাংলার এই বিধবা ঠাকুমা প্রায় ৩ বছর ধরে কার্যত সারা বিশ্বের নিরিখে রান্নার জগতে একাই রাজত্ব করছেন! তার এই রান্নার কৃতিত্বকে সম্মান জানাতে ভোলেননি ইউটিউব। ইউটিউবের সেরা রাঁধুনি হিসেবে ইতিমধ্যেই গোল্ড প্লে বাটন পেয়ে গিয়েছেন পুষ্পরানি। গ্রাম-বাংলার চিরন্তন রান্নাগুলিকে আরও একবার বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার জন্য ইউটিউব তার পরিবারকে বছরে প্রায় ৮-১০ লক্ষ টাকা পারিশ্রমিক দেয়!