শুন্য থেকে শুরু করে আজ কোটিপতি, বলিউডের প্রিয় নাপিতের সাফল্যের কাহিনী

সাফল্যের জন্য কোন শর্টকার্ট হতে পারে না, সাফল্য অর্জন করতে হলে তা কঠিন পথ দিয়েই অর্জন করতে হয়। ঠিক যেমন আগুনে গরম করে লোহাকে হাতিয়ারে পরিণত করা হয়, ঠিক তেমনি জীবনকে আগুনের উত্তাপের মতো প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে নিয়ে যাওয়ার পরও যদি লক্ষ্য স্থির থাকে তবে সাফল্য তাকে অবশ্যই  তার জীবনে নতুন রং ভরে দেবে। প্রত্যেক বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবন যদি আমরা একটু নজর দিয়ে দেখি তাহলে এই সত্য ঘটনাটা অবশ্যই দেখতে পাবো। কিন্তু কিছু কিছু ব্যক্তির জীবন যেন প্রতি মুহূর্তে  আমাদের নতুন করে বাঁচার প্রেরণা যোগায়। আমাদের যেন বারবার বলে নিজের ব্যর্থতা নিয়ে এক জায়গায় বসে থাকা জীবনের সবচেয়ে বড় মূর্খামি। জীবনকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে আর তারজন্য সব রকম প্রতিকূলতাকে সহজেই অতিক্রম করা যায়। চাই শুধু মনের বিশ্বাস আর নিজের সেরাটুকু দেওয়ার ক্ষমতা। তাহলেই জীবনের যা কিছু অসম্ভব বলে এক সময় যা মনে হতো তা যেন আজ হাতের মুঠোয় থাকবে। এইসব কিন্তু একদমই কথার কথা নয়। এইরকম অবাস্তবকে বাস্তবে পরিণত করেছে আমাদের আজকের বিশেষ ব্যক্তি। আসুন আজকের প্রতিবেদনে আমরা বিস্তারিতভাবে জানবো এই চূড়ান্ত সফল এক সাধারণ মানুষের কাহিনী।

শিবরাম ভান্ডারী আজ মুম্বাইয়ের সবচেয়ে আলোচিত হেয়ার স্টাইলিস্ট। যাকে আমরা গ্রাম বাংলার ভাষায় বলি নাপিত বা ভান্ডারী। আজ এই হেয়ার স্টাইলিস্ট তার কাজের জন্য এত বেশি প্রসিদ্ধ হয়েছেন যে আজ শুধু মুম্বাই জুড়ে তার বিশ্বমানের সালোন বা সেলুন যাই বলুন না কেন তার সংখ্যা ২০এর মতো। আজ তিনি একজন কোটিপতি হেয়ার স্টাইলিশ। মুম্বাইয়ের বিখ্যাত রাজনৈতিক চরিত্র প্রয়াত বাল ঠাকরে থেকে বর্তমানে বলিউড নায়িকা কারিনা কাপুর তার হাতের ছোঁয়ায় নিজেদের চুলে এনেছেন নতুন এক স্টাইল যা  পরবর্তীতে অনেকের কাছে এক ফ্যাশন স্টেটমেন্ট হয়েছে। আজ তার অবদান মহারাষ্ট্র সরকার দ্বারা স্বীকৃত হয়েছে। আজ তিনি একজন সেলিব্রেটি হেয়ার স্টাইলিস্ট যার হাতের ছোঁয়া নেবার জন্য বলিউড তারকাদের লাইন লেগে যায়। অর্থাৎ সাফল্যের একদম মধ্য গগনে। কিন্তু অতীত তার কী এইরূপ উজ্জ্বল ছিল?তাহলে চলুন অতীতের দিনে ।দেখি কেমন ছিল তার জীবন।

জীবন একটা মানুষকে যত রকম করে শিক্ষা দিতে পারে, ঠিক সেই রকম করেই শিক্ষা পেয়েছেন  শিবরাম বাবু। বয়স যখন মাত্র ৪ বছর বয়স তখন তিনি তার বাবাকে চিরদিনের জন্য হারান ভাগ্যের নিদারুণ পরিহাসে। তার বিধবা মায়ের তখন দুই ছেলেকে মানুষ করার মতো সামর্থ্য ছিল না যদি না মুম্বাইয়ের একজন সহৃদয় প্রতিবেশী তখন তার মা’কে সেই সময় ৩৬৫ টাকার মতো সাহায্য করতো। আর তার ফলেই তখনকার  শিবা তার মাকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামে ফিরে আসতে পারে পুনরায় ।

কিন্তু ভাগ্য যে তখনও তার জন্য কঠিন পরীক্ষা নিয়ে হাজির ছিল। বাড়ি ফিরে এসেও সে ও তার মা তাদের গ্রামের বাড়িতে থাকতে পারে নি কারন তা জবরদখল হয়ে গিয়েছে আবার মামার বাড়িও যেতে পারছিল না কারন মায়ের বাবা মা দুই জনেরই তখন মৃত্যু ঘটেছে। তাই একপ্রকার ভবঘুরে বা যাযাবর হয়ে তাদের দিন কাটতে থাকে এক আত্মীয়দের বাড়ি থেকে অন্য আত্মীয়দের বাড়িতে ঘুরে ঘুরে।

তারপর তার নিজের কথায়,”আমরা যেন সবার কাছেই বোঝা হয়ে যাচ্ছিলাম, আমাদের সবাই যেন অপরিচিত লোকের মতো আচরণ করতো। কিন্তু আমার মা ছিলেন একজন দৃঢ়চেতা মহিলা। তিনি কোনদিনই অন্যের সাহায্য নিয়ে জীবন কাটাতে  পছন্দ করেন নি। কিন্তু আমাদের সেই সময় কিছুই করার মতো ছিল না। তবুও আমরা একটা অস্থায়ী বাড়ি পেয়েছিলাম এক খ্রিষ্টান পরিবার আমাদের সাহায্য করেছিল। সেই অস্থায়ী বাড়িতে আমাদের না ছিল কোন বিদ্যুতের ব্যবস্থা না ছিল কোন প্রাকৃতিক কাজ করার কক্ষ বা শৌচাগার। একপ্রকার বলতে গেলে শুধু মাথা গোঁজার জন্য ঠাঁই পেয়েছিলাম তার বেশি নয়। কিন্তু সেই আশ্রয় টুকুই তখন অনেক কিছু ছিল আমাদের কাছে। একটা কন্নড় মিডিয়াম বিদ্যালয়ে আমি পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে আমি আমার  মা’কেসংসার চালানোয় সাহায্যের কথা ভাবতে থাকি।

আর তাই আমি পড়া ছেড়ে একটা সাইকেলে রিপেয়ারিং দোকানে কাজ করতে থাকি। এছাড়াও সপ্তাহের শেষে আমাদের ওখানে যে হাট বসত তাতে আমি সবজিও বেচতে থাকি। আমার এসব করতে ইচ্ছা না থাকলেও পরিস্থিতির চাপে পড়ে আমাকে এইসব করতে হয়েছে। তবে তারজন্য আমার কিছু খারাপ লাগতো না। কিন্তু মা আমাকে ছোট থেকেই শিখিয়েছিল কোন পরিস্থিতিতেই হার মানতে নেই। তাই আমি আমার মায়ের দেখানো পথে চলেছি সবরকম কষ্ট সহ্য করে।

আমার কাকা যে চিকমামঙ্গলোরে বাস করতেন তিনি আমাকে আরো ভালো কাজ দেবে বলে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমার জীবনের মোড় তখন ঘুরে গিয়েছিল যখন ১৯৭৯ সালের অক্টোবর মাসে যখন আমি মুম্বাই ফিরে এসে আমি আমার স্থানীয় এক সেলুন যার নাম আজও আমার মনে আছে অজন্তা সেলুনে মাসিক ৩০ টাকার বিনিময়ে কাজ শুরু করেছিলাম ভান্দুপে এসে।

তারপর ভান্দুপ থেকে ঘাটকোপার পর্যন্ত প্রায় সমস্ত সেলুনে আমার কাজ করেছি। কাজ শেষ করার পর আমি রামাবাই কোয়ার্টারে রাত টুকু কাটাতে আসতাম। তারপর জীবনের সবচেয়ে বড়ো সুযোগ আসে যখন আমার ১৯৮৪সালে কাতার যাওয়ার  একটা সুবর্ণ সুযোগ আসে। সেখানে আমি একটা স্পোর্টিং ক্লাবের সাথে আমার চুলের উপর পরীক্ষা নিরীক্ষা করার কাজ প্রায় সব দেশ থেকে আসা লোকের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করে। সেখান থেকেই আমি আস্তে আস্তে বুঝতে পারি বিভিন্ন চুলের ধরন মাথা অনুযায়ী পরিবর্তনশীল হয়। আমি বিভিন্নভাবে  চুল কাটার পদ্ধতি রপ্ত করতে থাকি।বিভিন্ন রকম চুল যেমন কোঁকড়ানো, সোজা, পাতলা, ঘন ইত্যাদি নানা রকমের চুলে নানা রকম নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে আপনার ব্যক্তিত্ব পরিবর্তন করার জন্য। চুল কাটার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে শিখি ব্লেডের ব্যবহারের উপর, অর্থাৎ প্রতিবার চুল কাটার পর নতুন ব্লেড ব্যবহার করা অর্থাৎ স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিকে। বিভিন্ন স্টাইলিশ লুক দেওয়ার জন্য আমি ব্যক্তি বিশেষে চুলের উপর বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করতাম। অনেক সময় প্রশংসা পেয়েছি আবার তিরস্কারও। এই সবই শেখার অঙ্গ হিসাবেই আমি ধরেছি। পরে বিভিন্ন দেশের চুলের আলাদা আলাদা স্টাইল দেখেছি এবং তা নিজের মতো করে করতে শিখেছিলাম। ব্রাজিল, কোরিয়া, সুদান প্রভৃতি দেশ থেকে আসা ফুটবল প্রেমীদের আমি তাদের পছন্দ মতো নানা স্টাইল  দিতে চেষ্টা করতাম। তারপর থেকে ধীরে ধীরে পরিচিত লাভ করতে থাকি।

আরও পড়ুন : কোটিপতি কুকুরের গ্রাম, সারমেয়র বার্ষিক আয় ১ কোটি 

পরবর্তীতে তিনি বিভিন্ন দেশের জাতীয় ফুটবল দলের সদস্যদের চুলেও নানা স্টাইল দিয়ে খ্যাতি লাভ করতে থাকি।অনেকে আমাকে নানা কিছু যেমন দামী ঘড়ি এবং আরও নানা জিনিস উপহার হিসেবে দিত। পরবর্তীতে যখন আমি আমার দেশ ফিরে আসবো বলে  ঠিক করি, তখন মনে মনে আমি ঠিক করি আমার জন্মস্থান মুম্বাইয়ে আমার একটা বিশ্বমানের সেলুন থাকবে।

কাতারে আমার জমানো টাকা থেকে আমি মুম্বাইয়ে ফিরে এসে একটি বাড়ি তৈরি করি। তখন আমার বোন শারীরিক অসুস্থতার জন্য মারা গিয়েছিল। আমার মা খুবই একা হয়ে গিয়েছিল। তারপর আমি থানেতে প্রথম আমার সেলুন খুলি।তখন আমি সব পুরানো ফার্নিচার কিনে দোকানে ব্যবহার করেছিলাম। কারন বাড়ি করার পর আমার সেরকম টাকা হাতে ছিল না। তারপর নিজের সেই সেলুনে নিজেই কাজ করতে থাকি। তারপর লোকের মুখে আস্তে আস্তে আমার করা চুলের স্টাইলিস্ট লুকের কথা সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। সময় এমন হয় যে আমি দুপরের খাবার খাওয়ার জন্য সময়ও পেতাম না ঠিক করে। আমার নিজের পক্ষে একা সেলুন চালানো মুশকিল হয়ে পড়ছিল, তাই ধীরে ধীরে অন্য লোকেদের নিয়োগ করতে থাকি আমার সেলুনে। ভগবানের কৃপায় আমার দোকান দারুন চলছিল সকাল ৫টায় সেলুন খুললেও লোকের ভিড় লেগে যেত আধ ঘন্টার মধ্যেই। তারপর কাজ প্রায় মাধ্যরাত্রি পর্যন্ত চলতে লাগত। তারপর আমার এক সহকারী আমাকে পশ্চিমের দিকে আমার সেলুনের আরও শাখা খুলতে পরামর্শ দিল। আর আমি তা নিয়েও নিলাম। আর আজ সারা মুম্বাই জুড়ে আমার ২০টির মতো বিশ্বমানের সেলুন আছে। আর তাই ধীরে ধীরে আমার নাম ছড়িয়ে পড়ে ।

আরও পড়ুন : বন্ধুদের টাকায় দেশে কাটা টিকিটে এক বেকার আজ বিদেশে কোটিপতি

তারপর তৎকালীন শিবসেনা প্রধান বাল ঠাকরে মহাশয় যখন আমাকে তার চুলের নতুন স্টাইল দেওয়ার জন্য ডেকেছিল সেটা ছিল আমার খুব গর্বের দিন। তিনি আমার হাতের কাজ দেখে আমাকে প্রশংসা করেছিলেন। আর বলেছিলেন আমার কাজ করা তার ভালো লেগেছে কারন কাজ করার সময় আমার হাত এতটুকু নড়বড়ে ছিল না। আমি আমার কাজ খুব নিষ্ঠার সঙ্গেই করি আর তাই আজ বলিউডের, জাতীয় ক্রিকেট দলের, ফুটবল দলের, নানা সেলিব্রিটি আমার কাছে তাদের চুলের নতুন স্টাইল করিয়ে যান। আমি আমার কাজ করতে ভালোবাসি। আমি কোনদিনই কাজকে ছোট করে দেখি নি। আর তাই ঈশ্বর আমার উপর সহায় হয়েছেন। আর তাই আমি সবাইকেই একটা কথায় বলতে চাই যে যেখানে যে কাজই করছো সেটা দক্ষতার সাথে করো। তাহলেই তোমার সাফল্য আসবে।”

একজন নাপিত যদি তার জীবন শুন্য থেকে শুরু করে আজ কোটিপতি এবং খ্যাতির চরম শিখরে পৌঁছাতে পারে তাহলে আমরা কেন পারবো না? অনুপ্রেরণা নয় আসুন শিক্ষা নি এইসব সাধারণ মানুষদের অতি সাধারন জীবন সংগ্রাম থেকে।