মাস্কের উত্‍পত্তি কীভাবে হয়েছিল? জেনে নিন এক অজানা ইতিহাস

করোনাকালে মাস্ক পড়া এখন ‘নিউ নরমাল’। তবে এর আগেও মানুষ মাস্ক ব্যবহার করত। মাস্কের ইতিহাস বেশ পুরনো। মাস্ক ব্যাবহার প্রথম শুরু হয়েছিল কিন্তু দুর্গন্ধ ঢাকতে। ১৬০০ সালে যখন ইউরোপজুড়ে প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে, তখন  এই প্লেগ সংক্রমিত রোগীর শরীরের দুর্গন্ধ থেকে বাঁচতে ডাক্তাররা তখন মাস্ক ব্যবহার শুরু করেন।

সেই মাস্কের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হতো এক ধরনের সুগন্ধি। যেন শরীরের গন্ধ নাকে মুখে প্রবেশ না করে। কিন্ত যখন ১৮৭০ সালের দিকে বিজ্ঞানীরা যখন ব্যাক্টেরিয়া সম্পর্কে জানতে পারে তখন বিলুপ্তি ঘটে সুগন্ধি মাস্কের। তারপর সেই থেকে তারা মেডিসিনের মাধ্যমে দূর্গন্ধ দূর করে থাকে।

১৮৯৭ এক ফরাসি শল্য চিকিৎসক পল বার্গার প্রথম সার্জিকাল মাস্কের আবিষ্কার করেন। তখন মূলত চিকিৎসার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হতো এই মাস্ক। কারণ অপারেশন টেবিলে কথা বলার সময় ড্রপলেটের মাধ্যমে মুখ থেকে জীবাণু বের হতে পারে যা রোগীর কাটা অংশ দিয়ে দেহে প্রবেশ করে আরো অসুস্থ করে তুলতে পারে।

আর একজন ফরাসি প্যাথলজিস্ট কার্ল ফ্লাজে আবিষ্কার করেন যে, মানুষের লালায় জীবাণু থাকে এবং সেখান থেকেও জীবাণু ছড়াতে পারে। তিনি বুঝতে পারলেন যে, তার থেকে যাতে ইনফেকশন ছড়াতে না পারে কিংবা তিনি কোনো রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু দিয়ে আক্রান্ত না হন। এজন্য জীবাণু থেকে নাক ও মুখের নিরাপত্তা দিতে হবে। শুরু হয়ে গেল তার ভাবনা।

এরপর ১৮৯৭ সালের অক্টোবরে ডা. বার্জার বানিয়ে ফেললেন গজ দিয়ে ছয় স্তরের আয়তাকার একটি কাপড়ের টুকরো। এর চারদিকে ছিল কঠোরভাবে জীবাণুমুক্ত করা লিনেন কাপড়ের অংশ। এটাই ছিল দুনিয়ার প্রথম সার্জিক্যাল মাস্ক। তিনি খেয়াল করলেন যে, ইনফেকশন হওয়ার হার আগের চেয়ে বেশ কমেছে মাস্ক ব্যাবহারের ফলে।

১৮৯৯ সাল থেকে প্যারিসের সার্জিক্যাল সোসাইটি একদম কঠোর নিয়ম করে দেয়, প্রতি অপারেশনে এটিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার। এরপর আরও অনেক পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত হয়ে বর্তমান চেহারায় আসে এ মাস্ক।

আরও পড়ুন :- কীভাবে তৈরি হয়েছিল বিশ্বের প্রথম হ্যান্ড স্যানিটাইজার, জানুন সেই গল্প

প্রথমদিকে মেডিকেল মাস্ক বলতে গজ কাপড় নাকে-মুখে জড়িয়ে কাজ করা বোঝাত। বিজ্ঞানী হুবনারের মতে, গজ যত মোটা হবে ততই ভালো এবং একবার ব্যবহার করার পর তা পুনরায় ব্যবহার করা চলবে না। এরপর থেকেই অপারেশন টেবিলে মেডিকেল মাক্স ব্যবহারের প্রচলন শুরু হয়।

পৃথিবীতে যতবার মহামারীর উপদ্রব দেখা গেছে ততবার মাস্ক ব্যবহারের প্রচলন বেড়েছে। আগে মহামারী হলে ডাক্তারেরা পাখির ঠোঁটের মতো দেখতে একধরনের ‘চঞ্চু মাক্স’ ব্যবহার করতেন। তারা মনে করতেন, এই রোগ খারাপ বাতাসের জন্য ছড়িয়ে পড়ছে। তাই তারা তাদের মাস্কের ভিতরে সুগন্ধি ব্যবহার করতেন।

আরও পড়ুন :- কোন মাস্ক কতদিন পরবেন, কীভাবে মাস্ক পরিষ্কার করবেন

পরবর্তীকালে ১৮৯৯ সালের যক্ষ্মা মহামারীর সময় প্রথম বহুল সংখ্যায় মেডিক্যাল মাস্ক ব্যবহার করা হয়। ১৯০৫ সালে বিজ্ঞানী হ্যামিলটনের মতে, থুতু তথা ড্রপলেটের মাধ্যমে অদৃশ্য স্ট্রোপ্টোকক্কাস জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে। স্কারলেট ফিভারও এই ভাবেই ছড়ায়, তাই তখনকার সকল ডাক্তার ও নার্সদেরকে মাস্ক ব্যবহার করার পরামর্শ দেন তিনি।

১৯১৮ সালে চিকিৎসক ওয়েভারের মতে, ডিপথেরিয়া নিয়ন্ত্রণে মাস্ক ব্যবহার খুবই জরুরী। তাই মাস্ক ভিজে গেলে তা পাল্টে ফেলা দরকার। এর সঙ্গে মাস্ক ব্যবহার করার পর হাত না ধুয়ে মুখে-নাকে হাত দেওয়া চলবে না। তবে মাস্কের ব্যবহার বৃদ্ধি পায় স্প্যানিশ ফ্লুয়ের সময়।

আরও পড়ুন :- দীর্ঘক্ষন মাস্ক ব্যাবহারের ফলে হচ্ছে চর্মরোগ, জানুন প্রতিকারের উপায়

ফ্লু নিয়ন্ত্রণের জন্য মাস্কের কোনো বিকল্প নেই, সে কথা সবাই বুঝে গিয়েছিল। ২০১৩ সালে চিকিৎসকেরা জানান, ফ্লুয়ের রোগী এবং তাঁর সংস্পর্শে আসা সকলকে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। তাহলে সংক্রমণ ছড়ানোর ভয় ৬০-৮০ শতাংশ কমে যায়। এমনকি জ্বর-হাঁচি-কাশি হলেও না হলেও মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।