মা দুর্গার প্রতিমা বানাতে বেশ্যালয়ের মাটি লাগে কেন?

তিনি দেবীদুর্গা। তিনি শান্তির প্রতীক। অথচ তিনিই মহিষাসুর বধ করেছেন। দুষ্টের দমন করতেই তাঁর আবির্ভাব। আবার তিনি সর্বভূতে বিরাজমান। তাই স্বাভাবিকভাবেই দুর্গা অন্যরকম। প্রতিমা নির্মান হোক কিংবা পূজা পদ্ধতি – তার নির্দিষ্ট বিশেষত্ব আছে।

মূর্তি তৈরির কথাই ধরা যাক। বলা হয়ে থাকে, দুর্গা প্রতিমা তৈরি করতে অপরিহার্য বেশ্যালয়ের মাটি। ঠিক। কিন্তু প্রশ্ন হল কেন? বেশ্যালয়ের মাটি ব্যবহারের যেসব কারণ পাওয়া যায় তার অধিকাংশই মনগড়া, বাকিটা ধর্মবিদ্বেষ থেকে ছড়ানো গুজব। তাই সেসবে কান না দেওয়াই মঙ্গলের।

কেউ কেউ আবার বলেন, মানুষের উৎকট লালসাকে নীলকণ্ঠের মত নিজে ধারণ করে যে বেশ্যারা সমাজকে নির্মল রাখল তাদের প্রতি সম্মান জানাতেই পতিতালয়ের মাটি ব্যবহার করা হয়। এ কোনও কবির উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা মাত্র। বাস্তবের সঙ্গে এর নুন্যতম যোগ নেই। তাই ‘ইচড়েপাকা’র পাঠকদের সত্য জানাতে পুরাণ ঘেঁটে তুলে আনা হল আসল কাহিনী।

দূর্গা মূলত শাক্তসম্প্রদায়ের আরাধ্য দেবী। এখানে ‘শক্তিবাদের’ আধারে পরম একমেবাদ্বিতীয়ম ঈশ্বরকেই ‘নারীশক্তি’ রূপে কল্পনা করা হয়েছে। সেই পরম ঈশ্বরের নারীশক্তি রূপই ‘মাদুর্গা’। শাক্ত সম্প্রদায়ের তন্ত্রশাস্ত্রের ‘গুপ্তসাধনা’ তন্ত্রের ১.১২-তে নবকন্যার বিবরণ পাওয়া যায়। নবকন্যা বলতে ভিন্ন ভিন্ন ৯ শ্রেণীর নারীকে বোঝায়। তাঁরা হলেন ১) নর্তকী/অভিনেত্রী, ২)কাপালিক, ৩)পতিতা, ৪) ধোপানী, ৫)নাপিতানী, ৬) ব্রাহ্মণী, ৭) শুদ্রাণী, ৮)গোয়ালিনী এবং ৯)মালিনী।

মা দূর্গার পূজা পদ্ধতি যেহেতু শাক্তদর্শন ও শাক্তসম্প্রদায়ের আধারে সৃষ্টি হয়েছে তাই শাক্তসম্প্রদায় কর্তৃক চিহ্নিত নবকন্যার প্রতীকস্বরূপ ওই ৯ শ্রেণীর নারীর দ্বারের মাটি নেওয়া হয় প্রতিমা গড়তে। এখানে শুধু পতিতার দ্বারের মাটি নয় বাকি আরও অষ্টকন্যার দ্বারের মাটিও সমান অপরিহার্য। এছাড়াও সাত নদী, ৫১শক্তীপিঠ এবং পঞ্চ প্রাণীর দেহবশেষও প্রতিমা গড়ার কাজে ব্যাবহৃত হয়।

মনে রাখতে হবে, হিন্দুদের কাছে মাটির প্রতিমার কোনো মূল্য নেই। যতক্ষণ না সেই প্রতিমার অন্তর থেকে দর্শন জ্ঞানের উন্মেষ হয়। যে এই শক্তি দর্শন অনুভব করবে তখনই তাঁর কাছে মাটির প্রতিমা হয়ে ওঠে চিন্ময়ী।

আরও পড়ুন : জানেন কী বাংলায় দুর্গাপূজা প্রচলনের পেছনে ইংরেজদের অবদান ছিল?

দুর্গা পুজোর মূল উদ্দেশ্য সমস্ত নারীজাতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। সেখানে পতিতাও একজন নারী তাই তাঁকেও সন্মান দেখানো আব্যশক হয়ে পড়ে। এই সম্মান শুধু একা পতিতার প্রাপ্য নয়, সমগ্র নারী জাতির প্রাপ্য। সেটাই উদ্দেশ্য এবং বিধেয়ও।

পুনঃশ্চ – শুধু নবকন্যার দ্বারের মটি নিয়ে প্রতিমা গড়লেই কাজ শেষ হয়না। তাঁদের কন্যাদেরও কুমারী রূপে পুজো করতে হয় এবং দান সামগ্রী দিতে হয়। তবেই পূর্ণ হবে প্রতিমা গড়ার কাজ।