একটিও গুলি না চালিয়ে কীভাবে ২০জন ভারতীয় সেনা শহীদ হলেন

5253

গত সোমবার রাতে লাদাখের গালওয়ান নদী উপত্যকায় চিনা সেনাবাহিনীর সঙ্গে ভারতীয় সেনাবহিনীর প্রাণঘাতী সংঘর্ষে শহীদ হন ২০ জন ভারতীয় সেনা। এই মহামারী পরিস্থিতিতে বিশ্বের দুই বৃহৎ জনসংখ্যা বহুল দেশের পর্বত সীমান্তে বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে বড় দ্বন্দ্ব চলছিল, আর সেই সংঘর্ষের ঘটনায় শহীদ হন ২০ জন ভারতীয় সেনা।

চিন দেশ ও ভারতের মধ্যকার সংঘর্ষ নতুন কিছু নয়, দীর্ঘ দিনের। তবে ৪৫ বছরে এই  প্রথম গালওয়ান নদী উপত্যকার কোনো সংঘর্ষে একসাথে এতজন সেনা শহীদ হলেন। যদিও প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছিল ভারত থেকে কেবল ৩ জন সেনা শহীদ হয়েছেন, যাদের মধ্যে একজন কর্নেল। পরে অবশ্য জানা যায় যে সেদিন রাতে ভারতীয় সেনাবাহিনী গুরুতর ভাবে আহত হয় এবং আরো ১৭ জন সেনা জওয়ান প্রবল ঠাণ্ডায় মারা যান।

ভারতীয় সেনাবাহিনী সূত্রে জানানো হয়েছে, সোমবারের সংঘর্ষে গুরুতর জখম ১৮ জন জওয়ানের এখনও চিকিৎসা চলছে। তবে তাঁদের সকলের অবস্থাই স্থিতিশীল। অন্তত ৫৮ জন এক সপ্তাহের মধ্যে কাজে যোগ দিতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।  এখনও অব্দি যদিও চিন থেকে চিনা সেনার মৃত্যুর কোনো খবর প্রকাশ করা হয় নি। তবে সূত্রের দাবি সংঘর্ষে চীনের একাধিক সৈন্যের মৃত্যু হয়েছে।

গলওয়ানে কেন হাতিয়ারবিহীন অবস্থায় জওয়ানদের বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, সেই প্রশ্ন তুলেছেন রাহুল গাঁধী। জবাবে বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেন, ‘‘গালওয়ানে যে দলটি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে, তাদের হাতে হাতিয়ার ছিল। সীমান্তরক্ষার দায়িত্বে থাকা সব জওয়ানের কাছেই হাতিয়ার থাকে। কিন্তু প্রোটোকল মেনেই তাঁরা তা ব্যবহার করেননি।’’

নিয়ন্ত্রণরেখা পাহারার প্রশ্নে ১৯৯৬ ও ২০০৫ সালের প্রোটোকল এবং ‘রুল অফ এনগেজমেন্ট’ অনুযায়ী পাহারার সময়ে হাতে অস্ত্র থাকলেও তা ব্যবহার না-করাই নিয়ম। যদি প্রাণের আশঙ্কা, ভূখণ্ড বা সিকিয়োরিটি পোস্ট আক্রান্ত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয় তা হলে কমান্ডার স্তরের অফিসার তার বাহিনীর হাতে থাকা সমস্ত ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করার নির্দেশ দিতে পারেন। এ ব্যাপারে কোনও প্রোটোকলেই কোনও বিধিনিষেধ নেই। সোমবার তা হলে সেই নির্দেশ দেওয়া হয়নি জওয়ানদের, সেটাই প্রশ্ন।

পূর্ব লাদাখের গালওয়ান নদী ঘেঁষে  উপত্যকাটি দুই দেশের মধ্যকার ডি-ফ্যাক্টো সীমান্ত। এটি প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা বা লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল বা এলএসি বলে পরিচিত। দুই দেশের মধ্যকার সীমান্তটি ৩,৪৪০ কিলোমিটার এলকাজুড়ে বিস্তৃত এবং সীমানা ও ভূখণ্ড নিয়ে বহু দিনের বিবাদ রয়েছে। সোমবার রাতে দুই পক্ষ থেকেই কোনোরকম গোলাগুলি করা হয়নি। পাথর ও রড নিয়ে হাতাহাতি যুদ্ধ শুরু করেছিল তারা। তাই  এখন প্রশ্ন উঠছে কেবল হাতাহাতিতে কি করে এতগুলো সৈনিক প্রাণ হারায়?

Source : BBC.COM

গালওয়ান নদী উপত্যকার আবহাওয়া অত্যন্ত বৈরি এবং এটি  সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক ওপরে অবস্থিত। অঞ্চলটি এলএসি’র পশ্চিম দিক প্রায় চিনের নিকটে অবস্থিত। যদিও চীন-শাসিত ওই এলাকার মালিকানা ভারতের। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী দুই দেশের সৈন্যরা যেই খাড়া শৈল-প্রবাহের ওপর হাতাহাতি করছিলেন সেখান থেকেই পা পছিলে অনেকে খরস্রোতা গালওয়ান নদীতে পড়ে যান।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ভারতীয় সেনাবাহিনী  নিশ্চিত ভাবে জানায়, যারা মারা গেছেন, তাদের মধ্যে ১৭ জনই গুরুতর আহত ছিলেন। ধরা হচ্ছে, এদের কেউ কেউ আঘাত নিয়ে হারকাপানো ঠান্ডায় টিকে না থাকতে পেরে মারা গেছেন। লাদাখ ভারতের সবচেয়ে উঁচু মালভূমি এবং শীতল প্রান্তর, যার শীতকালীন তাপমাত্রা মাইনাস ২০ ডিগ্রি। স্বাভাবিক ভাবেই এই ঠান্ডায় আহত অবস্থায় বেশিক্ষণ বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।

Source : Twitter

তাই স্বাভাবিক দৃষ্টিতে এই হাতাহাতিতে এত গুলো সৈনিকের মৃত্যুর প্রধান কারণ ফ্রস্টবাইট বা ঠাণ্ডায় জমে যাওয়া। যাকে বলা হয় হাই-অল্টিচ্যুড পালমোনারি ওডেমা। লাধাকের উচ্চতায় বাতাসে অক্সিজেন কম থাকে সঙ্গে অসম্ভব ঠান্ডা, যার কারণেই মূলত লোক মারা যায়। আরও একটি কারণ হলো হাই-অল্টিচ্যুড সেরেব্রাল ওডেমা, যা উঁচু এলাকায় থাকার দরুন শারীরিক প্রতিক্রিয়ার কারণে মস্তিষ্ক থেকে একধরণের জলীয় পদার্থ নিঃসরনের জন্য হয়ে থাকে। এইসকল কারণেই এতদিন ওই অঞ্চলটি শান্ত ছিল এমনই মনে করেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা।

এই সম্পর্কিত আরও পড়ুন :- 

ভারত চীন দুই দেশের ঝামেলার পেছনে রয়েছে এই ৫টি কারণ

ভারত-চীন সীমান্তে সেনাদের মধ্যে হাতাহাতি হলেও কখনো গোলাগুলি হয়না কেন?

চীন ভারত যুদ্ধ লাগলে কোন কোন দেশ কার কার পক্ষ নেবে?

ভারত চীন সংঘাতের মূল কারণ কি? বিশেষজ্ঞরা কি বলছেন?

১৯৬২-র যুদ্ধে চীনকে যেভাবে উচিত শিক্ষা দিয়েছিলেন মেজর শয়তান সিং

মে মাসের শুরুর দিক থেকেই লাদাখে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা শুরু হয়। দারবুক থেকে দৌলত বেগ ওল্ডি বিমানঘাঁটি পর্যন্ত, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার বরাবর ভারত একটি রাস্তা নির্মাণ করে, এই রাস্তা নির্মাণ নিয়েই চীনের আপত্তি। ১৬ হাজার ৬শ ১৪ ফুট দীর্ঘ এই রাস্তাটি ২০১৯ সালে বানানো হয়, এবং সেটিকে লাদাখের ওপর অবস্থিত একটি বিমান ঘাঁটির সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। এই রাস্তা নিয়েই মূলত দুপক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়।